The Barter System - অধ্যায় ৫

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-74260-post-6254513.html#pid6254513

🕰️ Posted on Fri Jul 3 2026 by ✍️ andygarfield (Profile)

🏷️ Tags:
📖 2512 words / 11 min read

চতুর্থ পরিচ্ছেদ: চুক্তির আড়ালে সমর্পণ ৪.১. দরজা বন্ধ হওয়ার সেই মুহূর্ত রূপান্তরটা ঘটল চোখের পলকে, একেবারে আকস্মিকভাবে। সারা সন্ধে ধরে—ডিনার টেবিল থেকে শুরু করে সুব্রতর বিদায় পর্যন্ত—ইন্দিরা যে নিখুঁত মুখোশটা পরেছিলেন, তা যেন মুহূর্তের মধ্যে গলে জল হয়ে গেল। সেই গম্ভীর অধ্যাপক, আনুষ্ঠানিক স্ত্রী আর মেপে চলা মায়ের রূপটা এক লহমায় মিলিয়ে গেল, ঠিক যেমন ভোরের কুয়াশা হঠাৎ সূর্যের আলোয় বাষ্প হয়ে যায়। এতক্ষণ যে কাঁধ দুটো এক কঠোর সামাজিক মর্যাদার আড়ষ্টতায় টানটান হয়ে ছিল, তা এক ধাক্কায় শিথিল হয়ে নিচে নেমে এল। তাঁর ঠোঁটের কঠিন রেখাটা গলে গিয়ে সেখানে এক পরম আন্তরিক ও উষ্ণ আস্তরণ দেখা দিল। এমনকি তাঁর চোখজোড়াও বদলে গেল; এতক্ষণের সেই মেপে চলা দৃষ্টির দেওয়াল ভেঙে সেখানে এমন এক নিবিড় মায়া জেগে উঠল যা দেখে রাহুলের বুকটা কেঁপে উঠল। তিনি এক পা এগিয়ে এলেন ছেলের দিকে। তাঁদের মাঝখানের দূরত্বটুকু মুছে দেওয়ার মধ্যে এমন এক ধীরতা ছিল যা দেখতে কোনো পবিত্র আচারের মতো ঠেকে। খোলা দরজা দিয়ে আসা বিকেলের ম্লান আলোটা ওঁর শাড়ির সোনালি পাড়ে লেগে এক মায়াবী দ্যুতির সৃষ্টি করছিল। যখন তিনি রাহুলের একদম সামনে এসে থামলেন, রাহুল ওঁর গায়ের সেই অতি পরিচিত গন্ধটা পেল—সকালের পুজোর চন্দনের সুবাস, চুলে মাখা জুঁই তেলের মৃদু গন্ধ, আর সেই সবকিছুর নিচে ওঁর নিজস্ব এক চেনা ঘ্রাণ, যা ওকে এক লহমায় আচ্ছন্ন করে ফেলে। "তা হলে," ওঁর গলার স্বরও ততক্ষণে বদলে গেছে; আনুষ্ঠানিকতার সেই ধারালো ভাবটা মুছে গিয়ে তা এখন অনেক বেশি নরম, অনেক বেশি নিবিড়। "আজ দেখছি কেউ একজন বড্ড ফাটাফাটি পারফর্ম করে ফেলেছে!" তাঁর ঠোঁটের কোণে একটা মৃদু হাসি ফুটে উঠল, যার মধ্যে সমপরিমাণে মিশে ছিল গর্ব, স্নেহ আর অন্য এক প্রশ্রয়—যা রাহুলের নাড়ির গতিকে এক ধাক্কায় বাড়িয়ে দিল। "ফুল মার্কস," তিনি হাত বাড়িয়ে রাহুলের কপালের ওপর থেকে অবাধ্য চুলের গোছাটা সরিয়ে দিতে দিতে বললেন, ওঁর আঙুলগুলো আলতো করে ছুঁয়ে রইল ওর ত্বক। "একশোর মধ্যে একশো। সত্যিই আনবিলিভেবল সোনা।" রাহুল নিজের গালে উষ্ণতার আভাস পেল। "আমি বড্ড নার্ভাস ছিলাম মা," সে প্রায় ফিসফিসিয়ে স্বীকার করল। "পরীক্ষা চলার সময় বারবার মনে হচ্ছিল এই হয়তো ভুল করে ফেললাম। কিন্তু তখনই আমার তোমার সকালের কথাটা মনে পড়ল—তুমি বলেছিলে আমি যা-ই পাই না কেন, তুমি আমাকে নিয়ে প্রাউড ফিল করবে। আর ঠিক তখনই... সবকিছু কেমন যেন সহজ হয়ে গেল। মনে হচ্ছিল তুমি আমার পাশেই বসে আছ।" ইন্দিরার চোখের চাউনি আরও নরম হয়ে এল, মুখের অবয়বে এক পরম মমতা আর এক অদ্ভুত অসহায়তা ফুটে উঠল। তিনি দু-হাত বাড়িয়ে রাহুলের মুখটা আলতো করে নিজের হাতের তালুতে নিলেন, বুড়ো আঙুল দুটো ওর চিবুক ছুঁয়ে রইল। "তোকে নিয়ে যে আমি সবসময় গর্বিত থাকি রে সোনা," তিনি বিড়বিড় করলেন। "সবসময়।" তিনি হাতটা নামিয়ে রাহুলের গালে পরম স্নেহে একবার হাত বুলিয়ে দিলেন। "তুই যে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে কী অমানুষিক খাটুনি খেটেছিস, তা আমি নিজের চোখে দেখেছি। তোর বাবাও আজ খুব ইমপ্রেসড। উনি তো সাধারণত চট করে কারও প্রশংসা করেন না, কিন্তু আজ তোকে নিয়ে কতটা গর্ববোধ করছিলেন, তা তো তুই ডাইনিং টেবিলেই দেখলি।" রাহুল মাথা নাড়ল। ওর চোখে তখন এক অদ্ভুত অস্থিরতা। ও যেন অন্য কিছুর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। "হ্যাঁ, বাবা খুশি হয়েছেন। কিন্তু মা..." "কিন্তু কী?" ইন্দিরা ইচ্ছে করেই কপট না-বোঝার ভান করলেন। "তোর পরীক্ষা তো শেষ। একটা দুর্দান্ত রেজাল্টও করেছিস। এবার তো পুরো উইকেন্ড শুধু রিল্যাক্স করবি। সিনেমা দেখবি, অঘোরে ঘুমোবি, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিবি।" রাহুলের মুখটা মুহূর্তে একটু চুপসে গেল। "সিনেমা? আড্ডা? মা, তুমি কি কিছু ভুলে যাচ্ছ?" "ভুলে যাচ্ছি?" ইন্দিরা কপালে ভাঁজ ফেলে এমন একটা ভান করলেন যেন তিনি খুব গভীরভাবে কিছু মনে করার চেষ্টা করছেন। "কী বল তো? ওহ হ্যাঁ, কাল সকালে তোকে বাজারটা করে আনতে হবে। ওটাই বলছিস তো?" "মা!" রাহুল এবার প্রায় আহত গলায় বলে উঠল। ওর চোখে একরাশ অভিমান জমতে শুরু করেছে। "তুমি ইচ্ছে করে এসব বলছ, তাই না? তুমি খুব ভালো করেই জানো আমি কীসের কথা বলছি।" ছেলের এই অভিমানী মুখটা দেখে ইন্দিরা আর নিজের হাসিটা চেপে রাখতে পারলেন না। ওঁর কপট গাম্ভীর্যের দেওয়ালটা পুরোপুরি ভেঙে পড়ল। চোখের সেই প্রাজ্ঞ, চেনা দৃষ্টির জায়গায় এক নিবিড় প্রশ্রয় আর চপলতা খেলা করে গেল। তিনি জানেন ছেলেটা সারাদিন ধরে, বলা ভালো সারা সপ্তাহ ধরে এই মুহূর্তটার জন্যই প্রহর গুনেছে। ওকে আর উত্ত্যক্ত করা ঠিক হবে না। তিনি একটু থামলেন, চোখ দুটো রাহুলের চোখের গভীরতা মেপে নেওয়ার চেষ্টা করল। "আজ রাতে তুই সত্যিই তোর প্রাইজটা জিতে নিয়েছিস, যার জন্য তুই এত চাতকের মতো বসেছিলি।" ‘প্রাইজ’ বা পুরস্কার শব্দটা তাঁদের মাঝখানের বাতাসে এক অমোঘ প্রতিশ্রুতির মতো ঝুলে রইল। রাহুলের চোখদুটো সামান্য বড় হয়ে গেল; আশা, ব্যাকুলতা আর এক তীব্র অবিশ্বাস যেন ওর মনের ভেতর একসাথে যুদ্ধ করতে লাগল। "তুমি এবারও বলবে না তো যে তোমার খাতা দেখার আছে?" ওর গলার স্বর সামান্য কাঁপছিল। "কিংবা ইউনিভার্সিটির অ্যাসাইনমেন্ট গ্রেড করতে হবে? তুমি সত্যিই... তুমি আমাকে..." সে নিজের কথা শেষ করতে পারল না, কিন্তু ইন্দিরা বুঝে গেলেন। তিনি তো সবসময়ই বোঝেন। "কোনো এক্সকিউজ নয়," তিনি নিশ্চিত করলেন, কণ্ঠে কোনো দ্বিধা ছিল না। "আজ রাতে অন্তত নয়। আমাদের চুক্তির প্রতিটা শর্ত তুই নিজের যোগ্যতায় জিতে নিয়েছিস।" তিনি সামান্য ঝুঁকে এলেন ওর দিকে, ওঁর উষ্ণ শ্বাস রাহুলের কপালে এসে লাগল এবং তিনি সেখানে ওঁর ওষ্ঠাধর ছোঁয়ালেন—এক পরম আশীর্বাদ, এক অমোঘ অঙ্গীকার। "আজ রাতে আমি শুধু তোর, সোনা। পুরো রাতটা তোর।" ৪.২. সিঁড়ি বেয়ে ওপরে কয়েক মুহূর্তের জন্য রাহুল শুধু ওঁর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, ঠিক যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না সে। তারপর, হঠাৎই এক তীব্র উল্লাসে সে ইন্দিরার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় পুরে নিল—যা দেখে ইন্দিরা নিজের হাসি চেপে রাখতে পারলেন না। "তা হলে চলো," রাহুল ইতিমধ্যেই ওকে সিঁড়ির দিকে আলতো করে টানতে শুরু করেছে। "আমার ঘরে। এক্ষুনি।" ইন্দিরা এক ঝটকায় পা দুটো মেঝেতে স্থির করে দাঁড়ালেন। "এক্ষুনি মানে? পাগল নাকি তুই?" তিনি রাহুলের টানের বিপরীতে সামান্য জোর খাটিয়ে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে বললেন। "সারাদিন পর ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরেছি। গায়ে একগাদা ঘাম আর ধুলো। আমাকে অন্তত একটু ফ্রেশ হতে দে। আর এই ভারী শাড়িটা ছেড়ে বাড়ির একটা হালকা কোনো শাড়ি পরে নিই। এভাবে কি কেউ রিল্যাক্স করতে পারে?" রাহুল একটুও দমল না। মায়ের একটা হাত তখনও ওর মুঠোয় শক্ত করে ধরা। "না মা, কিচ্ছু ছাড়তে হবে না। তুমি যেমন আছ তেমনই ঠিক আছ। ঘাম টাম কিচ্ছু হয়নি তোমার।" "উফফ, কী ঘ্যানঘ্যানানি!" ইন্দিরা কপট বিরক্তি দেখালেন। "দাঁড়া না বাবা, মোটে তো দশটা মিনিট লাগবে। আমি জাস্ট মুখটা ধুয়ে, শাড়িটা পালটে আসছি। তারপর সারারাত তো তোরই।" "সেই দশ মিনিটও আমি আর ওয়েট করতে পারব না," রাহুল প্রায় বাচ্চাদের মতো জেদ ধরে বসল। "এমনিতেই বাবা বেরোবে বলে কতক্ষণ ড্রয়িংরুমে মেপে মেপে কথা বলতে হলো! আমার এমনিই অনেক সময় নষ্ট হয়ে গেছে। আর এক মিনিটও ওয়েট করব না। আসো তো তুমি!" ইন্দিরা চোখ পাকিয়ে ওকে ভর্ৎসনা করার চেষ্টা করলেন। "তুই দিন দিন বড্ড অবাধ্য আর একগুঁয়ে হয়ে উঠছিস, সত্যি। একদম একটা বাঁদর।" "কী আর করবে বলো" রাহুল কাঁধের ওপর দিয়ে পিছন ফিরে ওঁর দিকে তাকিয়ে চওড়া হাসল। "এই বাঁদরটার পাশেই তোমায় আজ সারারাত শুতে হবে|" "ধ্যাৎ!" ইন্দিরা ফিক করে হাসলেন। "তুই না, একদম...." শেষমেশ ছেলের এই নাছোড়বান্দা জেদের কাছে হার মানতেই হলো তাঁকে। নিজেকে ওর টানে সঁপে দিয়ে তিনি সিঁড়ির দিকে এগোতে লাগলেন। তাঁরা একসাথে হাত ধরে বাড়ির ভেতরের করিডোর দিয়ে এগোতে লাগলেন। ইন্দিরার মনে হলো চারপাশের চিরচেনা দেওয়ালগুলো যেন আজ একটু অন্যরকম লাগছে। যে ঘর, যে বারান্দা দিয়ে তিনি হাজার বার হেঁটে গেছেন, আজ সেগুলো কেমন যেন এক নীরব প্রতীক্ষায় স্থির। ড্রয়িংরুমের সেই সাজানো আসবাবপত্র আর সাইড টেবিলে স্তূপ করে রাখা ওঁর বইগুলো যেন তাঁদের পার হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে অন্ধকারের গভীরে মিলিয়ে যাচ্ছিল। যে ডাইনিং টেবিলে মাত্র এক ঘণ্টা আগে তাঁরা সুব্রতর সাথে বসেছিলেন, তা এখন অন্য কোনো জন্মের এক ঝাপসা স্মৃতি বলে মনে হচ্ছিল। সিঁড়ির দিকের করিডোরটা এখন বেশ অন্ধকার, বিকেলের আলো নিভে গিয়ে সন্ধের মায়া চারপাশকে গ্রাস করেছে। মেঝের কার্পেটের কারণে তাঁদের পায়ের শব্দ আসছিল না, যা এই মুহূর্তটিকে আরও বেশি নিভৃত করে তুলছিল। ইন্দিরা নিজের সামান্য দ্রুত হয়ে আসা শ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলেন, আর শুনতে পাচ্ছিলেন রাহুলের পিছনে পিছনে সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় ওঁর শাড়ির মৃদু খসখস আওয়াজ। সিঁড়ির মাথায় পৌঁছে তাঁরা বাঁদিকের করিডোর দিয়ে রাহুলের ঘরের দিকে এগোলেন। দরজাটা সামান্য ভেজানো ছিল, ঘরের ভেতরের টেবিল ল্যাম্পের উষ্ণ হলুদ আলো একটা আয়তাকার রেখার মতো করিডোরে এসে পড়েছে। রাহুল দরজাটা পুরোপুরি ঠেলে খুলে পাশে সরে দাঁড়াল, ওঁর জন্য পথ ছেড়ে দেওয়ার মধ্যে এক অদ্ভুত রাজকীয় বিনম্রতা ছিল। ইন্দিরা দরজার চৌকাঠের ওপর এসে থমকে দাঁড়ালেন। সেটা ছিল মাত্র কয়েক মুহূর্তের বিরতি। কিন্তু এই সামান্য থমকে যাওয়ার মধ্যেই এক অদ্ভুত দ্বিধা তাঁকে গ্রাস করল। একজন মা হয়ে নিজের এত বড়, উনিশ বছরের ধেড়ে ছেলের সাথে পুরো রাত বিছানায় জড়িয়ে ধরে শুয়ে কাটাবেন? গল্প করবেন? ব্যাপারটা ওঁর কাছে একেবারেই অভাবনীয়। জীবনে কোনোদিন তিনি এমন কিছু করেননি। সুব্রতর সেই কড়া অনুশাসনের সংসারে এমনটা তো কখনো ভাবাই যায় না। কিন্তু পরক্ষণেই তিনি নিজেকে বোঝালেন। 'এতে এত অদ্ভুত লাগার কী আছে? ও তো আমারই ছেলে। অন্য কেউ তো নয়। নিজের ছেলের সাথে একটু সময় কাটানো, ওকে একটু আদর করা—এর মধ্যে তো কোনো দোষ নেই। আমি তো রোজ সারাদিন নিজের কাজে ব্যস্ত থাকি, ওর থেকে দূরে দূরেই থাকি। আজ না হয় মা আর ছেলে একসাথে শুয়ে একটু গল্পই করব। এতে এত অস্বস্তির কী আছে?' এই ভাবনাটা ওঁর মনের জড়তাটাকে অনেকটাই কাটিয়ে দিল। তিনি রাহুলের দিকে তাকালেন। দরজার হাতলে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ও, ওর চোখে এক তীব্র আশা, আকুলতা আর ভালোবাসা—এতটাই ভালোবাসা যে ওঁর বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত মমতায় ভরে উঠল। তিনি ভাবলেন: 'কীভাবে আমরা এইখানে এসে পৌঁছলাম? আমার সেই ছোট্ট ছেলেটা কখন এমন এক তরুণে পরিণত হলো, যে আজ আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন আমার কাছেই ওর জীবনের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে?' কিন্তু উত্তরটা তিনি নিজেই জানতেন। বছরের পর বছর ধরে তাঁদের এই নিবিড়তা গড়ে উঠেছে। রাত জেগে পড়াশোনা করার সেই সেশনগুলো কখন যেন জীবনের গভীরতম ভালো লাগা আর মন্দ লাগার গল্পে রূপ নিয়েছিল, তা তাঁরা নিজেরাও টের পাননি। রাহুলের যখনই মন খারাপ হতো, সে ওঁর কাছেই ছুটে আসত। আবার ইন্দিরাও যখন ইউনিভার্সিটি বা নিজের রিসার্চের চাপে হাঁপিয়ে উঠতেন, তখন রাহুলের এই নিষ্পাপ আবদারগুলোই তাঁকে স্বস্তি দিত। কেমিস্ট্রি আর হিস্ট্রি—দুটো সম্পূর্ণ আলাদা জগতের মানুষ হলেও, তাঁদের মাঝখানের আবেগের দেওয়ালগুলো এত সূক্ষ্মভাবে ক্ষয়ে গেছে যে পুরোপুরি ভেঙে যাওয়ার আগে পর্যন্ত তাঁরা তা টেরই পাননি। আর আজ তাঁরা এখানে দাঁড়িয়ে। ইন্দিরা একটা দীর্ঘশ্বাস নিলেন, নিজের কাঁধ সোজা করলেন এবং সমস্ত সাময়িক দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে ছেলের ঘরের চৌকাঠ পার হলেন। পিছনে দরজাটা একটা মৃদু শব্দে বন্ধ হয়ে গেল। ৪.৩. আনুষ্ঠানিক চুক্তি রাহুল ঘরের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল। এখন সত্যি সত্যি তাঁরা এখানে, এই নিভৃত ঘরে একা—এই সত্যটা অনুধাবন করতেই ওর নড়াচড়ার মধ্যে এক ধরনের স্নায়বিক আড়ষ্টতা দেখা দিল। সে ওঁর দিকে মুখ ফেরাল; ইন্দিরা দেখলেন ও এক ঢোক গিলে নিজের সমস্ত সাহস সঞ্চয় করার চেষ্টা করছে। "মা," ওর গলার স্বরে এক কৃত্রিম আনুষ্ঠানিকতা, যা এই মুহূর্তের নিবিড়তার সাথে ঠিক মানাচ্ছিল না। "আমরা... আমরা শুরু করার আগে, আমার মনে হয় আমাদের এটা খুব নিয়ম মেনে করা উচিত। একদম ফর্মালি।" ইন্দিরা কৌতুকে একটা ভ্রু তুললেন। "ফর্মালি?" "হ্যাঁ।" রাহুল নিজের পড়ার টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল, সেখান থেকে একটা কাগজ আর পেন নিয়ে কাগজের ওপর খস খস করে কিসব লিখতে শুরু করল। ইন্দিরা একটু ঝুঁকে দেখলেন, রাহুল সেই কাগজে পরীক্ষার বিষয়, তার নিজের নাম, রোল নম্বর, টোটাল নম্বর, আর তার প্রাপ্ত নম্বর লিখছে, ঠিক যেন একটা আনওফিশিয়াল মার্কশীট। "আমাদের এটা একটা বার্টার সিস্টেম, তাই না? একটা ট্রানজ্যাকশন। আর যেকোনো ট্রানজ্যাকশনের প্রপার ডকুমেন্টেশন থাকা দরকার।" ইন্দিরার ঠোঁটের কোণে একটা প্রশ্রয়ের হাসি ফুটে উঠল। এত বড় ছেলের সাথে সারা রাত বিছানায় শুয়ে গল্প করা আর ওকে জড়িয়ে ধরে থাকাটা ওঁর কাছে এখনও বেশ অভাবনীয় আর অস্বস্তিকর ঠেকছে ঠিকই, কিন্তু ওঁর এই প্রাজ্ঞ, নিয়মনিষ্ঠ ছেলেটা যে মাতৃস্নেহের এই সহজ আবদারটাকেও একটা আনুষ্ঠানিক চুক্তির মোড়কে বাঁধতে চাইছে, সেটা দেখে ওঁর ভারি মজা লাগল। এটা অবিকল রাহুলের স্বভাব—আর ওঁর নিজেরও বটে, মনে মনে তিনি তা স্বীকার করলেন—খুব সাধারণ, আবেগঘন একটা মুহূর্তকেও একটা সুশৃঙ্খল, কেতাদুরস্ত কাঠামোর মধ্যে বেঁধে ফেলার এই প্রয়াস। "খুব ভালো," তিনি বললেন এবং অত্যন্ত মার্জিত ভঙ্গিতে ওর বিছানার কিনারায় এসে বসলেন। "আপনার ডকুমেন্টস পেশ করুন, মিস্টার সেন।" রাহুল এক কৃত্রিম গম্ভীরতার সাথে ওঁর দিকে এগিয়ে এল, মার্কশিটটা ওঁর দিকে বাড়িয়ে দিল যেন কোনো পবিত্র উপহার। "এই যে আমার তরফের ট্রানজ্যাকশন ডকুমেন্ট," সে ঘোষণা করল। "একটি পরীক্ষা, যা শতভাগ নির্ভুলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। একশো নম্বরের মধ্যে প্রাপ্ত নম্বর একশো। আমাদের পূর্ববর্তী চুক্তি অনুযায়ী, নব্বইয়ের বেশি।" ইন্দিরা কাগজটা হাতে নিলেন, খুব মনোযোগ দিয়ে দেখার একটা ভান করলেন—যদিও ডিনার টেবিলে সুব্রতর মুখে শোনা মাত্রই ওঁর বুকের ভেতর গর্বের বন্যা বয়ে গিয়েছিল। কাগজটার ওপর, প্রাপ্ত নম্বরের জায়গাটায় বড় বড় করে লেখা সেই সংখ্যাটা যা ওকে আজকের এই রাতটা এনে দিয়েছে: ১০০/১০০। "হুম," তিনি বিড়বিড় করলেন, কাগজের ওপর আঙুল বোলাতে বোলাতে। "ফুল মার্কস।" তিনি মুখ তুলে ওর দিকে তাকালেন, চোখে তখন কৌতুক আর এক তীব্র উষ্ণতার ছোঁয়া। "ইউ হ্যাভ সাকসেসফুলি ফুলফিলড ইয়োর সাইড অফ দ্য বারগেন, মিস্টার সেন। সত্যিই প্রশংসনীয়।" তিনি মার্কশিটটা বেডসাইড টেবিলে রেখে দিলেন, তারপর নিজে টেবিলটার দিকে ঝুঁকে পেনটা আর আরেকটা সাদা কাগজ নিয়ে নিলেন। "আর এবার," তিনি রাহুলের দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বললেন, "আমার তরফের বার্টার।" রাহুল মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখতে লাগল ওঁর লিখে যাওয়া। ওঁর হাতের লেখা ছিল অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর; প্রতিটা অক্ষর ওঁর সেই দীর্ঘদিনের অভ্যাসের কথা বলছিল যা তিনি হাজার হাজার খাতা দেখার সময় ব্যবহার করেছেন। তিনি খুব ধীরে, সাবধানে লিখছিলেন, মাঝে মাঝে সঠিক শব্দ চয়নের জন্য একটু থামছিলেন, তারপর আবার লিখতে শুরু করছিলেন। লেখা শেষ হলে, তিনি পেনটা পাশে রেখে কাগজটা উঁচিয়ে ধরে উচ্চস্বরে পড়তে লাগলেন: "প্রাপক: রাহুল সেন। এমসিকিউ পরীক্ষায় ১০০-এর মধ্যে ১০০ নম্বর অর্জন করে রাহুল সেন তার তরফের চুক্তি সফলভাবে পূরণ করেছে। এর বিনিময়ে, ইন্দিরা সেন (রাহুল সেনের মাতা, বসবাসকারী..." তিনি একটু থামলেন তাঁদের পুরো ঠিকানাটা পড়ার জন্য, যা শুনে রাহুল না হেসে পারল না, "...এতদ্বারা নিম্নলিখিত বিষয়গুলি প্রদানে সম্মত হচ্ছেন: ১. এক সম্পূর্ণ রাত (রাত ১১টা থেকে সকাল ৮টা) কেবলই ওর পাশে শুয়ে থাকা, আদর করা এবং ওর সমস্ত গল্প শোনা। ২. কোনো প্রকার বাধা থাকবে না (বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ, খাতা দেখা বা অন্য কোনো দায়িত্ব এই সময়ের জন্য বাতিল)। এই চুক্তি চিরস্থায়ী—একবার শুরু হওয়ার পর এই চুক্তি কোনোভাবেই বাতিল বা প্রত্যাহার করা যাবে না। স্বাক্ষরকারী: ইন্দিরা সেন (মাতা, ইতিহাসবিদ এবং উক্ত পুরস্কারের একমাত্র প্রদানকারী)।" তিনি মুখ তুলে রাহুলের দিকে তাকালেন, মুখের অভিব্যক্তি তখন কৌতুক আর এক গভীর গাম্ভীর্যের মিশ্রণ। "এই টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনস কি আপনার অ্যাপ্রুভাল পেল, মিস্টার সেন?" রাহুলের চোখদুটো বড় বড় হয়ে গিয়েছিল, ঠোঁট দুটো সামান্য আলগা। "তুমি সত্যিই এটা লিখলে? একদম আসল কন্ট্রাক্টের মতো!" "তুই-ই তো ফর্মালি করতে বলেছিলি," ইন্দিরা মনে করিয়ে দিলেন। "আমি শুধু তোর ইচ্ছের মর্যাদা দিচ্ছি।" তিনি কাগজটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিলেন। "তবে আমার এখনও একটু কাজ বাকি আছে।" কাগজটা ওর হাতে দেওয়ার আগে, তিনি কলমটা নিয়ে নিচে আরও তিনটি পুনশ্চ (P.S.) যোগ করলেন খুব ছোট হাতের লেখায়: "পুনশ্চ ১: সারা রাত ধরে একগুঁয়ে বাঁদরের মতো ঘ্যানঘ্যান করা চলবে না, মায়ের কথার সামান্য অবাধ্য হলে চুক্তি তৎক্ষণাৎ বাতিল। পুনশ্চ ২: আগামীকাল সকাল ৮টার পর মিস্টার রাহুল সেনকে আবার একজন বাধ্য ছাত্র এবং সুবোধ সন্তান হিসেবে আচরণ করতে হবে—যেমনটা সে সাধারণত করে থাকে। পুনশ্চ ৩: এই কাগজের কথা যদি অন্য কোনো জীবিত বা মৃত ব্যক্তি জানতে পারে, তবে ইতিহাস বিভাগের প্রধান ডক্টর ইন্দিরা সেন তাঁর সমস্ত ডিপ্লোমেটিক পাওয়ার ব্যবহার করে এই চুক্তির অস্তিত্ব সম্পূর্ণ অস্বীকার করবেন।" রাহুল চুক্তিপত্রটা ওঁর হাত থেকে নিল, ওঁর হাতের লেখার ওপর আঙুল বোলাতে বোলাতে ওর মুখে এক চওড়া হাসি ফুটে উঠল। ওটা পড়তে পড়তে বুকটা এক অদ্ভুত আনন্দে ভরে উঠছিল ওর। "তা হলে," সে ওঁর দিকে ফিরে তাকাল, চোখে তখন একই সাথে স্নায়বিক উত্তেজনা আর তীব্র উচ্ছ্বাস। "আমাদের কন্ট্রাক্ট এখন অফিশিয়াল?" "একদম অফিশিয়াল," ইন্দিরা ঘড়ির দিকে চোখ বুলিয়ে নিশ্চিত করলেন। "যদিও আমাদের চুক্তির অফিশিয়াল সময় অর্থাৎ রাত এগারোটা বাজতে এখনও বেশ কয়েক ঘণ্টা বাকি আছে।" "তা হলে... এখন তো আর কোনো বাধা নেই," রাহুল একটু ইতস্তত করে, বড্ড আদুরে গলায় বলল। "এবার কি আমি তোমার কাছে আসতে পারি?" ইন্দিরা কপট বিরক্তি আর স্নেহের মিশেলে হাসলেন। "আর বাবুকে কে আটকে রেখেছে? আয়, মায়ের কাছে আয়। তুই তো আমাকে ঘাম মুছে একটু ফ্রেশটুকুও হতে দিলি না। এবার এই ভারী শাড়ি আর সাজগোজ করা অবস্থাতেই আমাকে তোর ওই 'জড়িয়ে ধরার' প্রজেক্ট শুরু করতে হবে। আয়, শুয়ে পড় দিকি।" (rest of the chapter continued in the next post)