The Barter System - অধ্যায় ৩০

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-74260-post-6297480.html#pid6297480

🕰️ Posted on Thu Aug 27 2026 by ✍️ andygarfield (Profile)

🏷️ Tags:
📖 4098 words / 18 min read

(rest of the chapter...) পরদিন। ৪ঠা সেপ্টেম্বর, শুক্রবার। বিকেল ৫:৪৫ মিনিট। এলিয়ট পার্কের পরিবেশটা তখন এক মায়াবী গোধূলির আলোয় সেজে উঠেছে। সারাদিনের চড়া রোদের তেজ মরে গিয়ে এখন একটা নরম, সোনালি আভা ছড়িয়ে পড়েছে পার্কের সবুজ ঘাসের গালিচায় আর বড় বড় মেহগনি গাছের পাতায়। বিকেলের শান্ত, ফুরফুরে হাওয়ায় মিশে আছে হালকা ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ আর দূর থেকে ভেসে আসা রোস্টেড চিনাবাদামের সুবাস। চৌরঙ্গীর ব্যস্ত, কোলাহলমুখর ট্রাফিকের শব্দটা এখানে এসে একটা মৃদু, একটানা গুঞ্জনে পরিণত হয়েছে। রাহুল আর ইন্দিরা পাশাপাশি হাঁটছিলেন পার্কের বাঁধানো ওয়াকওয়ে ধরে। রাহুলের পরনে একটা ক্যাজুয়াল, ফিটিং সাদা টি-শার্ট আর ব্লু জিনস। ওর চওড়া কাঁধ আর দৃঢ় পদক্ষেপে এক স্বতঃস্ফূর্ত যৌবনের ছাপ স্পষ্ট। আর ওর ঠিক পাশেই, প্রায় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাঁটছেন ইন্দিরা। আজ তাঁর পরনে কোনো জমকালো শাড়ি নেই। তিনি অত্যন্ত সচেতনভাবেই বেছে নিয়েছেন একটা খুব সাদামাটা, আকাশি রঙের সুতির শাড়ি, আর তার সাথে একটা একরঙা, সলিড আকাশি ব্লাউজ। ইন্দিরা একজন অত্যন্ত আত্মসচেতন নারী; তিনি খুব ভালো করেই জানেন যে তাঁর প্রখর, তীক্ষ্ণ ব্যক্তিত্ব আর ওই প্রাজ্ঞ, আভিজাত্যপূর্ণ সৌন্দর্য যেকোনো ভিড়ের মধ্যেও মানুষের নজর কাড়তে বাধ্য। তাই তিনি আজ চেয়েছিলেন এই উন্মুক্ত পরিবেশে যতটা সম্ভব সাধারণ, প্রায় অদৃশ্য হয়ে থাকতে—যাতে বাইরের পৃথিবীর কেউ তাঁকে সেভাবে লক্ষ না করে, কিন্তু তাঁর পাশের এই ছেলেটার চোখে তিনি থাকেন সম্পূর্ণ দৃশ্যমান, সম্পূর্ণ আপন। হাঁটতে হাঁটতে তাঁরা সহজ, ঘরোয়া গল্প করছিলেন। রাহুলের আজকের ক্লাস কেমন হলো, ইন্দিরার ইউনিভার্সিটির দিনটা কেমন কাটল—নেহাতই আর পাঁচটা সাধারণ মা ও ছেলের কথোপকথন। কিন্তু ওই সাধারণ শব্দগুলোর আড়ালেও তাদের দুজনের শরীরের মাঝখানের ওই কয়েক ইঞ্চির শূন্যস্থানটায় এক অদ্ভুত, চৌম্বকীয় টান কাজ করছিল। হঠাৎ হাঁটতে হাঁটতে রাহুল একটু ঘাড় নিচু করে, অত্যন্ত নরম, ফিসফিস করা গলায় বলল, "মা... তোমার হাতটা একটু ধরতে পারি? মানে... হাত ধরে হাঁটবে?" ছেলের এই অপ্রত্যাশিত, প্রেমিকের মতো আবদারে ইন্দিরা প্রথমে একটু থমকে গেলেন। তাঁর চোখদুটো এক সেকেন্ডের জন্য চারপাশের ভিড়ের দিকে ঘুরে এল। তারপর তিনি খিলখিল করে, এক মনখোলা, চপল হাসিতে ভেঙে পড়লেন। এই উন্মুক্ত পরিবেশে তাঁর সেই হাসিটা যেন এক অদ্ভুত মুক্তির সুর নিয়ে বাজল। "ওমা! দ্যাখো কাণ্ড! এ তো ভূতের মুখে রামনাম!" ইন্দিরা হাসতে হাসতেই রাহুলের দিকে তাকিয়ে এক চরম কৌতুকী, অথচ স্নেহে মাখানো তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন। "এই তো সেদিনের কথা, তুই না ওই পাশের বাড়ির বরুণের মায়ের মুণ্ডুপাত করছিলিস? যে ওরা নাকি রাস্তায়-ঘাটে লোকদেখানো আদিখ্যেতা করে, উনি নাকি ছেলের হাত ধরে হাঁটেন... আর আজ তুই নিজেই সেই একই আবদার করছিস?" রাহুল একটুও লজ্জা না পেয়ে, বরং এক চরম নির্লজ্জ, অথচ মিষ্টি হাসি হেসে বলল, "ওহ্... আমি বলেছিলাম নাকি ওরকম কিছু?" ইন্দিরা ওর গালে একটা হালকা, কপট চড় কষানোর ভঙ্গি করে বললেন, "ন্যাকামো করিস না সোনা... মায়ের সব মনে আছে। তুই নিজেই তো ওই গসিপটা নিয়ে এসেছিলিস, যে বরুণের মা নাকি সবার সামনে ওকে ন্যাতাক্যাতা করে জড়িয়ে ধরে, ফ্লাইং কিস ছোঁড়ে, হাত ধরে হাঁটে... ব্লা ব্লা ব্লা... আর এখন নিজের বেলায়? মা একটু হাত ধরে..." ইন্দিরার ঠোঁটের কোণে হাসিটা তখনও লেগে আছে, তাঁর কথাগুলো একটা মিষ্টি, প্রশ্রয়ের তরঙ্গে ভাসছে। কিন্তু তাঁর সেই বাক্যটা আর শেষ হলো না। হঠাৎ করেই ইন্দিরার হাসিমাখা মুখটা যেন জমে পাথর হয়ে গেল। তাঁর চোখের দৃষ্টিটা রাহুলের মুখের ওপর থেকে সরে গিয়ে, সোজা সামনের দিকে, পার্কের ওই ছোট ফোয়ারাটার পাশের ভিড়টার ওপর গিয়ে স্থির হলো। রাহুল মায়ের মুখের এই আকস্মিক পরিবর্তনটা দেখে ভ্রু কুঁচকে সেদিকে তাকাল। ভিড় ঠেলে, ঠিক উল্টোদিক থেকে, সরাসরি তাদের দিকেই হেঁটে আসছেন একজন ভদ্রমহিলা। তাঁর পরনে একটা গাঢ় খয়েরি আর প্লাম রঙের মিশেলে জমকালো শাড়ি, যার সমগ্র অংশ জুড়ে বেজ রঙের পাতা আর ফুলের ভারী নকশা। শাড়ির সাথে মানানসই একটা স্লিভলেস, মেটালিক ব্লাউজ তাঁর হাতদুটিকে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে রেখেছে। ভদ্রমহিলা প্রথমে তাদের দুজনকে খেয়াল করেননি, কিন্তু কাছাকাছি আসতেই তাঁর দৃষ্টি আটকে গেল, আর তারপর মুখে এক চওড়া, উদ্ভাসিত হাসি ফুটিয়ে সোজা তাদের দিকেই এগিয়ে আসতে লাগলেন। তিনি আর কেউ নন... তিনি হলেন দেবলীনা গোস্বামী। বরুণের মা। ১৪.৩. অবদমিত অতলান্ত দেবলীনাকে দেখামাত্রই ইন্দিরার ভেতরটা যেন একটা দমবন্ধ করা অস্বস্তিতে আচ্ছন্ন হয়ে গেল। তাঁর হাতের তালু সামান্য ঘেমে উঠল। এই বিকেলটা ছিল সম্পূর্ণভাবে তাদের দুজনের—মা আর ছেলের। শুধু সুব্রতর চোখ এড়িয়ে নয়, সমাজের সমস্ত 'পরিচিত' মুখের আড়ালে এক নিভৃত, নিজস্ব অবসর কাটানোর জন্য এই পার্কটাকে বেছে নিয়েছিল রাহুল। কিন্তু দেবলীনা যেন সেই পরিকল্পনার সাজানো বাগানে এক বালতি কাদা-জল ঢেলে দিলেন। ইন্দিরার মনে হতে লাগল, তিনি যেন কোনো মারাত্মক অপরাধ করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়ে গেছেন। কিন্তু পরক্ষণেই তাঁর যুক্তি কাজ করল—কীসের অপরাধ? একজন মা তার নিজের গর্ভজাত সাবালক ছেলের সাথে পার্কে হাওয়া খেতে এসেছে, হাঁটতে এসেছে, এর মধ্যে অপরাধের কী আছে? এটা তো পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক, সবচেয়ে নিষ্পাপ একটা দৃশ্য! যে কেউ দেখলে এটাই ভাববে। কিন্তু মুশকিল হলো বাইরের লোক কী ভাববে তা নিয়ে নয়; মুশকিলটা হলো ইন্দিরা নিজে কী ভাবছেন তা নিয়ে। ইন্দিরা খুব ভালো করেই জানেন, একজন মায়ের তার সাবালক ছেলের সাথে পার্কে হাঁটার মধ্যে বিন্দুমাত্র দোষের কিছু নেই। এটা পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক একটা দৃশ্য। কিন্তু আর পাঁচজন সাধারণ মায়ের ক্ষেত্রে যা খাটে, 'ডক্টর ইন্দিরা সেন'-এর ক্ষেত্রে তা খাটে না। সমাজের সামনে তাঁর যে রাশভারী, পরিশীলিত এবং আবেগহীন অধ্যাপিকার মুখোশটা রয়েছে, তার সাথে এই বিকেলের স্নিগ্ধ হাওয়ায় ছেলের সাথে পার্কে হাওয়া খেতে আসার কোনো মিল নেই। সেই ডাকসাঁইটে প্রফেসর সেন কখনোই নিজের কুড়ি বছরের ধেড়ে ছেলেকে নিয়ে এ ধরনের আবেগপ্রবণ, সাধারণ মাতৃসুলভ সময় কাটান না; এটা তাঁর চেনা, কঠোর ইমেজের সাথে একেবারেই বেমানান। আর ঠিক এই বৈপরীত্যের কারণেই, নেহাতই একটা স্বাভাবিক পরিস্থিতি তাঁর নিজের কাছে এক অদ্ভুত কেলেঙ্কারির মতো মনে হতে শুরু করল। যে ধরনের মাতৃস্নেহ ও তার প্রদর্শনকে তিনি চিরকাল সমাজের সামনে আড়াল করে এসেছেন, আজ একটি চেনা মুখের সামনে সেই আড়াল সরে যাওয়ার উপক্রম হওয়াটা তাঁকে এক নিদারুণ অস্বস্তিতে ফেলে দিল। দেবলীনা কী ভাববে এখন? সে কি মনে মনে বাঁকা হাসবে আর ভাববে, 'ওহ্, এত কড়াকড়ি আর গাম্ভীর্যের আড়ালে প্রফেসর সেনও তাহলে আর পাঁচটা সাধারণ, সেন্টিমেন্টাল মায়ের মতোই?' এই কাল্পনিক বিচারটা ইন্দিরাকে নিজের সেই নিখুঁত খোলসের ভেতর আড়ষ্ট করে তুলল। আর তার ওপর, যে মানুষটা তাঁদের ওই অবস্থায় আবিষ্কার করলেন, সে হলো দেবলীনা গোস্বামী। এই মহিলার প্রতি ইন্দিরার এক সহজাত, মজ্জাগত বিতৃষ্ণা রয়েছে। যদিও একজন দায়িত্বশীল মা হিসেবে তিনি রাহুলকে বারবার দেবলীনা আর বরুণের ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে আলোচনা বা সমালোচনা করতে বারণ করেছেন, কিন্তু নিজের মনের গভীরে তিনি দেবলীনাকে আক্ষরিক অর্থেই অপছন্দ করেন, আর সেই অপছন্দের কথা মুখ ফসকে তিনি রাহুলকে আগে একদিন বলেও ফেলেছিলেন। দেবলীনা তাঁর সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর একজন মানুষ। ইন্দিরা যেখানে পরিমিত, সংযত, রুচিশীল এবং আভিজাত্যে মোড়া, দেবলীনা সেখানে বড্ড বেশি উচ্চকিত, লোকদেখানো, এবং স্বভাবের দিক থেকে যাকে বলে 'গায়ে-পড়া'। একটা বেসরকারি ব্যাঙ্কের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার হিসেবে কাজ করলেও, মহিলার আচার-আচরণে একধরনের অহেতুক নাটুকেপনা আছে, যা ইন্দিরার মতো একজন বুদ্ধিজীবী প্রফেসরের রুচিতে বরাবরই আঘাত করে। "আরে! ইন্দিরা যে! কী খবর তোমার? কতদিন পর দেখা!" দেবলীনা প্রায় চেঁচিয়ে, একটা মাত্রাতিরিক্ত উচ্ছ্বসিত গলায় কথা বলতে বলতে একদম সামনে এসে দাঁড়ালেন। ইন্দিরা এক লহমায় নিজের মুখের ওই কাঠিন্যটাকে মুছে ফেলে একটা নিখুঁত, মেপে-তৈরি-করা ভদ্রতার হাসি ফুটিয়ে তুললেন। তিনি দেবলীনার চেয়ে বয়সে সামান্য ছোট হলেও, সম্মানে এবং শিক্ষায় অনেক এগিয়ে, তবু সৌজন্য বজায় রাখলেন। "এই তো দেবলীনা-দি, আছি একরকম। আপনার কী খবর? কেমন চলছে ব্যাঙ্কের কাজ?" "আর বোলো না ভাই! ইয়ার-এন্ডের টার্গেট মিট করতে করতে জান কয়লা হয়ে যাচ্ছে। তার ওপর গৌতমের (দেবলীনার স্বামী) আজকাল প্রায়ই ট্যুর পড়ছে। সব একা হাতে সামলাতে হয়। তা সুব্রতবাবু কেমন আছেন? ওঁর বিজনেস কেমন চলছে?" দেবলীনার কথার তোড় যেন থামতেই চায় না। "উনি ভালোই আছেন। হ্যাঁ, কাজের চাপ তো থাকেই সবার," ইন্দিরা অত্যন্ত সংক্ষিপ্তভাবে উত্তর দিলেন। তিনি চাইছিলেন এই কথোপকথনটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শেষ হোক। কিন্তু সামাজিকতার দায়ে বাধ্য হয়ে তাঁকে পাল্টা প্রশ্ন করতে হলো, "বরুণ কেমন আছে? ওর পড়াশোনা কেমন চলছে?" বরুণের নাম শুনতেই দেবলীনার মুখের এক্সপ্রেশনটা এমন একটা নাটকীয় ভঙ্গি নিল, যেন তিনি কোনো ট্র্যাজেডি নাটকের নায়িকা। "উফ্! ওর কথা আর জিজ্ঞেস কোরো না ইন্দিরা! ছেলেটা আমাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খেল একদম। সারাদিন শুধু ভিডিও গেম আর বন্ধুদের সাথে আড্ডা। একটু যে বই নিয়ে বসবে, তার কোনো নামগন্ধ নেই। আমি তো রোজ বলি, দ্যাখ তোর বন্ধু রাহুলকে দ্যাখ! কেমন বাধ্য ছেলে, সব পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়, ক্লাসের একদম পোস্টার বয় হয়ে বসে আছে। আর তুই? পড়াশোনার নামগন্ধ নেই, খালি দুষ্টুমি আর দুষ্টুমি!" কথাগুলো বলতে বলতেই দেবলীনার দৃষ্টি এবার ইন্দিরার পাশ থেকে ঘুরে গিয়ে রাহুলের ওপর পড়ল। "কেমন আছিস রে রাহুল?" দেবলীনার এক অদ্ভুত, ন্যাকামি-মাখানো স্বরে বলে উঠলেন। রাহুল অত্যন্ত ভদ্রভাবে মাথা নেড়ে বলল, "আমি ভালো আছি, আন্টি। আপনি ভালো আছেন?" "আমি তো ভালোই আছি, কিন্তু তোমরা দুজনে এখানে কী করছ? মানে, মা আর ছেলে হঠাৎ এলিয়ট পার্কে?" দেবলীনার চোখে এক প্রচ্ছন্ন, তীক্ষ্ণ কৌতূহল। রাহুল কিছু একটা বলার আগেই, ইন্দিরার সেই প্রখর, তীক্ষ্ণ এবং উপস্থিত বুদ্ধিসম্পন্ন মগজটা এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশে একটা নিখুঁত গল্প ফেঁদে ফেলল। একজন দক্ষ শিক্ষিকা হিসেবে পরিস্থিতি সামাল দিতে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। "আর বলবেন না দেবলীনা-দি," ইন্দিরা একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলে, অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য এক মাতৃসুলভ উদ্বেগের সুরে বললেন, "ওর তো নতুন সেমিস্টার শুরু হয়েছে, আর শুরু থেকেই সাংঘাতিক প্রেশার যাচ্ছে ক্লাসে। দিনরাত এক করে পড়াশোনা করছে, আর ফাঁক পেলেই ওই সব বাচ্চারাই আজকাল যেমন মোবাইলের স্ক্রিনে মুখ গুঁজে থাকে, ও-ও তাই করছে। আমি ভাবলাম, সারাক্ষণ ওই ল্যাপটপ আর ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে তো চোখের বারোটা বেজে যাবে! তাই আজ আমি ইউনিভার্সিটি থেকে ফেরার পথে ওকে বললাম, তুই রেডি হয়ে থাক, আমি আসছি, দুজনে একটু পার্কের এই সবুজ গাছপালার মধ্যে হেঁটে আসব। চোখটাও একটু আরাম পাবে, আর একটানা পড়ার পর ছেলেটার মাথাটাও একটু ফ্রেশ হবে।" ইন্দিরার এই অনায়াস, নিশ্ছিদ্র মিথ্যাটা শুনে রাহুলের নিজেরই চমকে ওঠার জোগাড়। কিন্তু ও মুখটা একদম শান্ত, বাধ্য ছেলের মতোই রাখল। দেবলীনাও এই ব্যাখ্যাটা শুনে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হলেন। "ওহ, তা তো বটেই! একদম ঠিক কাজ করেছ। বরুণকে আমি কত বলি, চল আমার সাথে একটু মর্নিং ওয়াকে, তা সে নবাবপুত্তুরের ঘুমই ভাঙে না!" আরও দু-এক মিনিট কিছু অবান্তর ছোটখাটো কথার পর, দেবলীনার পুরো মনোযোগটা এবার গিয়ে পড়ল রাহুলের ওপর। তিনি রাহুলের দিকে এক পা এগিয়ে এলেন। "তা বাবা রাহুল, কতদিন পর দেখলাম তোকে! তুই তো দেখছি আগের চেয়ে আরও লম্বা হয়ে গেছিস!" দেবলীনা কথা বলতে বলতেই হঠাৎ করে নিজের ডান হাতটা বাড়িয়ে রাহুলের একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিলেন। রাহুল এই আকস্মিক স্পর্শে একটু হকচকিয়ে গেলেও, সৌজন্য বজায় রেখে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিতে পারল না। "হ্যাঁ আন্টি... এই আর কী..." https://iili.io/CbA3q8X.png কিন্তু দেবলীনা সেখানেই থামলেন না। তিনি নিজের বাঁ হাতটা তুলে রাহুলের ওই সাদা টি-শার্টের হাতা ভেদ করে ফুটে ওঠা বাইসেপসের ওপর রাখলেন। তারপর সেই পেশিটাকে অত্যন্ত পরিচিতের মতো একটু চেপে ধরে, চোখদুটো বড় বড় করে, প্রায় একটা সস্তা গ্ল্যামারের সুরে বলে উঠলেন: "মাই গুডনেস! তুই কি জিম-টিম জয়েন করেছিস নাকি রে? কী শক্ত হয়ে গেছে হাতগুলো! একদম পুরুষ মানুষের মতো পেটানো চেহারা বানাচ্ছিস তুই! আর ওদিকে আমার বরুণটা দিন দিন খেয়ে খেয়ে মোটা আর ঢ্যাবঢ্যাবে হয়ে যাচ্ছে। তোকে তো এখন একদম স্টাড লাগছে রে রাহুল! আমি তো বরুণকে বলব এবার থেকে তোর টিপস ফলো করতে!" রাহুল ভীষণ অস্বস্তির মধ্যে পড়ে একটা বোকা বোকা হাসি হেসে বলল, "থ্যাঙ্ক ইউ আন্টি... না, জিম টিম কিছু না, ওই এমনিই..." কিন্তু রাহুলের এই অস্বস্তির চেয়েও কয়েক হাজার গুণ বেশি তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছিল ইন্দিরার শরীরের ভেতর। দেবলীনার ওই ফর্সা, নখ-রঙানো আঙুলগুলো যখন রাহুলের হাতের পেশিটাকে টিপে ধরল, তখন ইন্দিরার বুকের ভেতরটা যেন এক ঝলক ফুটন্ত তেলে পুড়ে গেল। তাঁর নিজের অজান্তেই তাঁর চোয়ালদুটো শক্ত হয়ে এল, আর হাতের মুঠি দুটো শাড়ির আঁচলের নিচে এমনভাবে কুঁচকে গেল যে নখগুলো হাতের তালুতে বসে যাচ্ছিল। তাঁর মগজের ভেতর একটা হিংস্রতা ফুঁসতে শুরু করল। কীসের এই অনুভূতি? কেন তাঁর এত রাগ হচ্ছে? মহিলা তো খারাপ কিছু বলছেন না। তিনি তো রাহুলের প্রশংসাই করছেন। একজন সাধারণ মায়ের তো এতে গর্ববোধ করার কথা যে অন্য কেউ তার ছেলের চেহারার বা স্বাস্থ্যের প্রশংসা করছে। কিন্তু ইন্দিরার কাছে এই স্পর্শটা, এই প্রশংসাটা যেন এক চরম আগ্রাসন বলে মনে হচ্ছিল। ওই বাইসেপসের পেশি, ওই চওড়া কাঁধ, ওই শক্ত হাত—ওগুলো তো তাঁর নিজের! ওই পেশিগুলোর খাঁজে খাঁজে, ওই ঘর্মাক্ত ত্বকে তো কেবল তাঁর নিজের অধিকার! গতকালও তো ওই কাঁধের ওপর তিনি নিজের সর্বগ্রাসী চুম্বনের দাগ বসিয়েছেন। আর আজ এই সস্তা, মেকি মহিলাটি কোন সাহসে তাঁর ছেলের শরীরে হাত দিচ্ছে? ইন্দিরার মনে হতে লাগল, দেবলীনার ওই ছুঁয়ে থাকাটা এক চরম নোংরামি। নিজের রাজ্যের সীমানায় অন্য কোনো থাবা পড়লে এক বাঘিনী যেমন ফুঁসে ওঠে, ইন্দিরার বুকের ভেতরের অবস্থাটাও ঠিক তেমনটাই হচ্ছিল। তিনি চোখদুটোকে বরফের মতো ঠান্ডা করে রাহুলের মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। রাহুল যে এই প্রশংসা শুনে হাসছে, মাথা নাড়ছে, এটাও তাঁর কাছে এক অসহনীয় বিশ্বাসঘাতকতা বলে মনে হচ্ছিল। "তা রাহুল, তুই তো আমাদের বাড়িতে কোনোদিন আসিসই না!" দেবলীনা রাহুলের হাতটা তখনও ধরে রেখেই এক অদ্ভুত, আহ্লাদী সুরে বললেন। "আমাদের বাড়ি তো তোদের বাড়ি থেকে ওই ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে। আসবি একদিন?" রাহুল মায়ের ওই স্থির, হিমশীতল দৃষ্টির দিকে একবার আড়চোখে তাকাল। ও খুব ভালো করেই বুঝতে পারছিল যে মায়ের ভেতরে একটা আগ্নেয়গিরি ফাটতে চলেছে। ও কোনোমতে ঢোক গিলে বলল, "ওকে আন্টি... আমি চেষ্টা করব একদিন যাওয়ার..." কিন্তু দেবলীনা যেন নাছোড়বান্দা। "আরে চেষ্টা কীসের! আসবি মানে আসবিই। বরুণ তো তোকে দেখে খুব খুশি হবেই, তবে ওর তো কোনো ঠিকঠিকানা নেই, কখন বাড়িতে থাকে না থাকে। ও না থাকলেও তুই আসবি। তোর আন্টির সাথে গল্প করবি। আসবি তো?" রাহুল এবার আক্ষরিক অর্থেই ঘামতে শুরু করল। ও কী বলবে বুঝতে না পেরে শুধু ঘাড় নেড়ে একটা অস্ফুট 'হ্যাঁ' বলল। দেবলীনা একগাল হেসে নিজের দামি স্মার্টফোনটা আনলক করলেন। "দে তো বাবা, তোর নম্বরটা দে আমাকে। আমি নিজের ফোনে সেভ করে রাখি।" রাহুল বাধ্য হয়ে, অত্যন্ত মিনমিন করা গলায় নিজের ফোন নম্বরটা বলে দিল। দেবলীনা সেটা টাইপ করে সেভ করে নিলেন। "গ্রেট! আমি কিন্তু তোকে কোনো একদিন ফোন করব, কেমন রাহুল? আর প্লিজ, একদিন সময় করে আমাদের বাড়িতে আয়। আমার বড্ড ভালো লাগবে।" কথাটা বলেই দেবলীনা এক সেকেন্ডের জন্য থামলেন। তারপর এমন একটা বাক্য উচ্চারণ করলেন, যা ইন্দিরার ক্ষতবিক্ষত, ঈর্ষাকাতর হৃদয়ে এক বালতি অ্যাসিড ঢেলে দিল। "আর তাছাড়া... আমিও তো তোর মায়েরই মতো, তাই না?" শব্দগুলো ইন্দিরার কানের পর্দা ফুটো করে মগজের একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে গিয়ে আঘাত করল। 'আমিও তো তোর মায়েরই মতো!' কী স্পর্ধা এই মহিলার! কী অসীম ঔদ্ধত্য! তাঁর রাহুলের, তাঁর নিজের নাড়ি-ছেঁড়া ধনের আরেকজন 'মা' হতে চাইছে এই মহিলা? ইন্দিরার মনে হলো তিনি এক্ষুনি এগিয়ে গিয়ে মহিলার ওই মেকি, হাসিমুখটায় একটা সজোরে চড় কষিয়ে দেন। তাঁর শরীরের প্রতিটি রোমকূপ রাগে, ঘৃণায় আর এক অবর্ণনীয় অধিকারবোধে থরথর করে কাঁপতে লাগল। "চলিরে ইন্দিরা! আবার দেখা হবে," দেবলীনা একটা ক্যাজুয়াল হাত নেড়ে ভিড়ের মধ্যে আবার হারিয়ে গেলেন। দেবলীনা চলে যাওয়ার পরেও বেশ কয়েক মুহূর্ত সেখানে এক শ্মশানের মতো নিস্তব্ধতা বিরাজ করল। গোধূলির ওই নরম আলোটা যেন ইন্দিরার ভেতরের ওই অন্ধকারের কাছে হার মেনে ফিকে হয়ে এসেছে। রাহুল খুব সাবধানে, ভয়ে ভয়ে মায়ের দিকে তাকাল। ও ভেবেছিল এবার হয়তো মা ওকে বকবে, বা ওই মহিলার সমালোচনা করবে। বা হয়তো মা বলবে, 'চল, এবার আমরা ওই বেঞ্চটায় গিয়ে বসি।' কিন্তু না। ইন্দিরার মুখটা তখন একটা জমাট বাঁধা পাথরের মূর্তির মতো কঠিন। তাঁর চোখের দৃষ্টিতে কোনো উষ্ণতা নেই, কোনো স্নেহ নেই। আছে কেবল এক দুর্বোধ্য, তীক্ষ্ণ শীতলতা। "রাহুল," ইন্দিরার গলার স্বরটা এতটাই যান্ত্রিক আর কাঠখোট্টা শোনাল যে রাহুলের বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। "চল, এবার ফেরা যাক। সন্ধে হয়ে আসছে।" রাহুল চমকে উঠল। "ফেরা যাক? কিন্তু মা... আমরা তো জাস্ট..." "না এবার ফিরতে হবে," ইন্দিরা ওর কথার মাঝপথেই ওকে থামিয়ে দিলেন। তাঁর গলায় কোনো তর্কের অবকাশ ছিল না। "তুমি বরং সোজা বাড়ির দিকেই হাঁটা লাগাও। আমি এই উল্টোদিকের রাস্তাটা দিয়ে গিয়ে ওই বইয়ের দোকানটা থেকে একটা বই কালেক্ট করে তারপর ফিরব। একসাথে ফেরার দরকার নেই, তাতে তোমার বাবার মনে অহেতুক সন্দেহের সৃষ্টি হবে না।" রাহুল মায়ের এই হঠাৎ করে 'তুই' থেকে 'তুমি'-তে নেমে আসা আর এই চরম অবজ্ঞার সুর শুনে একদম স্তব্ধ হয়ে গেল। ও বুঝতে পারল, ওই মহিলার কথাগুলো, আর তার চেয়েও বেশি ওর নিজের ওই মহিলাকে প্রশ্রয় দেওয়াটা মাকে কতটা গভীরভাবে আহত করেছে। মায়ের এই অভিমান, এই রাগ ভাঙানোর কোনো উপায় এই পাবলিক স্পেসে দাঁড়িয়ে ওর কাছে নেই। ও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, অত্যন্ত করুণ, নিচু স্বরে বলল, "ঠিক আছে মা... ডিনারের সময় কথা হবে..." রাহুল ভারী পায়ে পার্কের গেটের দিকে হাঁটতে শুরু করল। আর ইন্দিরা, একবারও ওর যাওয়ার পথের দিকে ফিরে না তাকিয়ে, সোজা উলটোদিকের রাস্তায় বইয়ের দোকানের দিকে পা বাড়ালেন। তাঁর বুকের ভেতরে তখন জ্বলছে এক দাউদাউ করা দাবানল। --- সেই রাত। সেন বাড়ির সর্বত্র তখন এক গভীর, নিশ্ছিদ্র নৈঃশব্দ্য। বাইরের কলকাতার কোলাহল অনেকক্ষণ আগেই থেমে গেছে। রাত প্রায় আড়াইটে বাজে। ইন্দিরার শোবার ঘরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত, বদ্ধ বাতাসে কেবল সুব্রতর একটা একটানা, হালকা নাক ডাকার শব্দ ভাসছে। কিন্তু ইন্দিরার ঘুমন্ত শরীরটা আজ শান্ত নেই। তিনি বিছানার ওপর ক্রমাগত এপাশ-ওপাশ করছেন। তাঁর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠেছে। তাঁর মুখের পেশিগুলো এক চরম আতঙ্কে আর যন্ত্রণায় কুঁচকে আছে। তাঁর শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত, ভারী আর এলোমেলো। তিনি একটা স্বপ্ন দেখছেন... না, স্বপ্ন নয়, এক ভয়াবহ, বীভৎস দুঃস্বপ্ন। স্বপ্নের ফ্রেমগুলো বড্ড এলোমেলো, ভাঙা ভাঙা। চারপাশটা কেমন যেন ধোঁয়াটে, আবছা। একটা ঘর... হ্যাঁ, একটা শোবার ঘর... কিন্তু এটা তো তাঁর নিজের শোবার ঘর নয়! দেওয়ালের রঙটা আলাদা, ফার্নিচারগুলো অচেনা... বিছানার ওপর কেউ একজন বসে আছে... সাদা টি-শার্ট... নীল জিনস... চওড়া কাঁধ... কে ওটা?... ওহ্ ঈশ্বর... ওটা তো রাহুল! রাহুল ওখানে কী করছে? এটা তো ওদের বাড়ি নয়! হঠাৎ ঘরের দরজাটা খুলে গেল... কেউ একজন ভেতরে ঢুকল... কে?... মেটালিক ব্লাউজ... খয়েরি শাড়ি... মুখে সেই সস্তা, চওড়া হাসি... দেবলীনা! ইন্দিরার স্বপ্নের ভেতরের সত্তাটা যেন চিৎকার করে উঠতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বেরোল না। ওরা কথা বলছে... রাহুলের গলা শোনা যাচ্ছে... "আপনার বিছানাটা তো বড্ড নরম, বড্ড আরামদায়ক আন্টি..." রাহুলের গলার স্বরটা কেমন যেন নেশাতুর। দেবলীনা খিলখিল করে হাসল... "বরুণও ঠিক এই কথাটাই বলে রে..." "বরুণ কি এই ঘরেই শোয় নাকি?" রাহুলের প্রশ্ন। "আরে না না, ওর তো নিজের আলাদা ঘর আছে। কিন্তু জানিসই তো... ও বড্ড প্যাম্পার-খাওয়া ছেলে, বড্ড দুষ্টু... প্রায় রোজ রাতেই ও আমার কাছে এই ঘরে চলে আসে..." দেবলীনা বিছানার ওপর রাহুলের আরও একটু কাছে ঘেঁষে বসল। "ওহ্... কেন আন্টি?" "আর বলিস না... ওর যে রোজ রাতে ওর মা-কে লাগে..." দেবলীনার গলাটা এবার এক চরম, নোংরা ফিসফিসানিতে নেমে এল। "আমি তো ওর বাবাকে বলেই রেখেছি, তুমি বসার ঘরে বসে যা করার করবে, আমাদের হয়ে গেলে আমি তোমাকে ফোন করে ডেকে নেব।" ইন্দিরার ঘুমের ঘোরে শরীরটা ধনুকের মতো বেঁকে গেল। তাঁর হাতদুটো অবচেতনভাবেই বিছানার চাদরটাকে খামচে ধরল। স্বপ্নের ভেতরে দেবলীনা আরও কাছে সরে গেল রাহুলের... "ওই সময় বরুণ যেমন বলে আমি ঠিক তেমনটাই সাজি... যদিও..." "যদিও কী, আন্টি?" রাহুলের গলাটা কাঁপছে। "যদিও তারপর তো সবটাই খুলে দেয় ও..." দেবলীনার হাতটা রাহুলের বাইসেপসের ওপর এসে পড়ল। ইন্দিরার ভেতরের সত্তাটা চিৎকার করে উঠল। স্বপ্নের ভেতর রাহুল ফিসফিস করে বলে উঠল, "সব খুলে দেয় আন্টি?" "হ্যাঁ রে... আসলে... জামাকাপড় পরে কি আর ভালো করে আদর হয়?" ইন্দিরার কপাল থেকে ঘাম চুইয়ে পড়তে লাগল। তাঁর শরীরটা এবার প্রবলভাবে কাঁপতে শুরু করেছে। তিনি ডানদিক থেকে বাঁ-দিকে পাশ ফিরলেন। সাইড বালিশটাকে দুই হাত দিয়ে সজোরে বুকের সাথে চেপে ধরলেন। দুঃস্বপ্নটা এবার তার দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশ করল। ফ্রেমগুলো আরও অস্পষ্ট, আরও অন্ধকার, কিন্তু শব্দগুলো অনেক বেশি তীক্ষ্ণ, অনেক বেশি বন্য। মেঝে... মেঝের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে কাপড়... সাদা টি-শার্ট... নীল জিনস... মেটালিক ব্লাউজ... খয়েরি শাড়ি... সব মেঝের ওপর লুটিয়ে আছে! বিছানাটা... বিছানাটা কাঁপছে... একটা একটানা, ছন্দোবদ্ধ 'ক্যাঁচ... ক্যাঁচ' শব্দ... দুটো শরীর... না, দুটো অনাবৃত, নগ্ন শরীর... দুটো শরীরের মাঝে এক সুতোরও ব্যবধান নেই... তারা একে অপরের সাথে একাকার হয়ে গেছে... একটা বন্য, আদিম ছন্দে... https://iili.io/CbA2yua.png শব্দ... কিছু ভিজে, স্যাঁতসেঁতে, অস্পষ্ট শব্দ... "আআহ্... আন্টি... ওহ্ আন্টি..." রাহুলের গলা! রাহুলের রুদ্ধশ্বাস, তৃপ্তির গোঙানি! ইন্দিরা ঘুমের মধ্যেই মাথাটা এপাশ-ওপাশ করতে লাগলেন। তাঁর চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। "না... না..." তিনি অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করছেন। "আআহ্... হ্যাঁ রাহুল... আরও... আরও জোরে..." দেবলীনার সেই জঘন্য, নোংরা গলাটা এবার এক চরম তৃপ্তির গোঙানিতে ফেটে পড়ছে। "আমি তোকে আগেই বলেছিলাম আমার বাড়িতে আসতে... আমি তোকে কত কিছু দিতে পারি রাহুল... কত কিছু..." "হ্যাঁ আন্টি... তুমি... তুমি সত্যিই বেস্ট..." রাহুলের গলার ওই স্বরটা, ওই নেশাগ্রস্ত আর্তিটা তো শুধু ইন্দিরার জন্য ছিল! শুধু তাঁর জন্য! "না... আমাকে আর আন্টি বলিস না রাহুল..." দেবলীনার গলাটা এবার এক চূড়ান্ত, পৈশাচিক অধিকারবোধে মেতে উঠল। "...একবার... জাস্ট একবার... আমাকে একটু 'মা' বলে ডাক..." "ওহ্... আহ্... হ্যাঁ... ওহ্... 'মা'..." "নাআআআআআআআআ!!!" ইন্দিরা এক তীব্র, গগনভেদী চিৎকারে বিছানার ওপর আছড়ে উঠে বসলেন। তাঁর পুরো শরীরটা যেন একটা জেনারেটরের মতো থরথর করে কাঁপছে। বুকের ভেতরটা হাতুড়ির মতো আছড়ে পড়ছে পাঁজরে। তাঁর কপাল, ঘাড়, গলা—সবকিছু ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে গেছে। তিনি পাগলের মতো হাঁপাচ্ছেন, চোখের তারা দুটো অন্ধকারের মধ্যে স্থির, বিস্ফারিত। তাঁর এই হঠাৎ আর্তনাদে পাশে শুয়ে থাকা সুব্রতর ঘুম এক লহমায় ছুটে গেল। "কী হলো ইন্দিরা? কী হয়েছে? হোয়াটস্ রং?" সুব্রত অত্যন্ত উদ্বিগ্ন গলায় চেঁচিয়ে উঠে ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসলেন। তিনি দ্রুত হাত বাড়িয়ে বেডসাইড ল্যাম্পের সুইচটা অন করে দিলেন। ঘরের ওই নরম আলোয় ইন্দিরার বিধ্বস্ত, ঘর্মাক্ত মুখটা দেখে সুব্রত নিজেও ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি জগ থেকে গ্লাসে জল ঢেলে দ্রুত ইন্দিরার ঠোঁটের কাছে ধরলেন। "জলটা খাও। একটু জল খেয়ে নাও আগে।" ইন্দিরা কাঁপাকাঁপা হাতে গ্লাসটা ধরে ঢকঢক করে কয়েক ঢোঁক জল গিলে নিলেন। গলার ওই শুষ্ক, কাঠ হয়ে থাকা ভাবটা একটু কমল। তিনি একটা দীর্ঘ, কাঁপানো শ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলেন। "ইট ওয়াজ আ ব্যাড ড্রিম, সুব্রত... একটা বড্ড খারাপ স্বপ্ন দেখলাম..." ইন্দিরার গলার স্বরটা এখনও কাঁপছে। "খারাপ? এটাকে শুধু খারাপ বলে না ইন্দিরা! দিস মাস্ট হ্যাভ বিন আ টেরিবল নাইটমেয়ার!" সুব্রত গ্লাসটা টেবিলের ওপর নামিয়ে রেখে, অত্যন্ত চিন্তিত মুখে বললেন। "আমি তোমাকে জীবনে কোনোদিন এভাবে কাঁপতে দেখিনি। কী এমন স্বপ্ন দেখছিলে তুমি?" ইন্দিরা ঢোক গিললেন। তাঁর মগজটা এখনও ওই নোংরা, বীভৎস দৃশ্যগুলোর ঘোর থেকে পুরোপুরি বেরোতে পারেনি। তিনি অত্যন্ত সতর্কভাবে, শব্দের জাল বুনে কথাটা বললেন: "আসলে... ওটা রাহুলকে নিয়ে ছিল... খুব খারাপ কিছু একটা... ওর সাথে ঘটছিল... মানে, কেউ একজন... কেউ একজন ওর খুব বড় কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা করছিল..." সুব্রত এই কথাটা শুনে একটা গভীর শ্বাস ফেললেন। তিনি তাঁর স্বভাববিরুদ্ধভাবে, অত্যন্ত নরম এবং সহানুভূতির সাথে নিজের একটা হাত ইন্দিরার ঘর্মাক্ত কাঁধের ওপর রাখলেন। "ওহ্ ইন্দিরা... তুমি ছেলেটাকে নিয়ে বড্ড বেশি ওভারথিঙ্ক করো, জানো? সারাক্ষণ শুধু ওর পড়াশোনা, ওর কেরিয়ার, ওর ফিউচার নিয়ে টেনশন করো তুমি। আর জানোই তো, সাইকোলজি কী বলে? অতিরিক্ত চিন্তা থেকেই মনের ভেতরে নেগেটিভ থটস্ জন্ম নেয়। আর সেই নেগেটিভ চিন্তাগুলোই অবচেতন মনে এই ধরনের নাইটমেয়ার হয়ে ফিরে আসে।" সুব্রত একটু থেমে, অত্যন্ত ভরসার সুরে বললেন, "তুমি এত চিন্তা কোরো না, ইন্দিরা। রাহুল একদম ঠিক আছে। কেউ ওর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। তুমি আছ তো, তাই না? যতদিন তুমি ওর পাশে আছ, ওকে গাইড করার জন্য, ওকে প্রটেক্ট করার জন্য... পৃথিবীর কার সাধ্য আছে ওর গায়ে একটা আঁচড় কাটে?" সুব্রতর এই অত্যন্ত সাধারণ, স্বামীসুলভ ভরসার কথাগুলো ইন্দিরার কানের ভেতর দিয়ে গিয়ে তাঁর বিবেকে এক অদ্ভুত, তীক্ষ্ণ খোঁচা মারল। তিনি সুব্রতর দিকে তাকিয়ে, একটা শূন্য, ফাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন: "তোমার... তোমার সত্যিই তাই মনে হয়?" "অফকোর্স, আমি সিওর।" সুব্রত অত্যন্ত কনফিডেন্ট গলায় বললেন। "এবার এসব ফালতু চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো। রাত আড়াইটে বাজে। শুয়ে পড়ো এবার, কাল আবার সকালে উঠতে হবে।" সুব্রত ল্যাম্পের সুইচটা অফ করে দিলেন। ঘরটা আবার সেই নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ডুবে গেল। তিনি পাশ ফিরে শুয়ে, নিজের গায়ের ওপর চাদরটা টেনে নিয়ে আবার ঘুমের প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন। ইন্দিরাও নিজের বালিশের ওপর মাথা রেখে শুয়ে পড়লেন। কিন্তু তাঁর চোখের পাতা অত সহজে এক হলো না। অন্ধকার ছাদের দিকে তাকিয়ে তাঁর মগজটা এবার এক গভীর, অতলস্পর্শী বিশ্লেষণে ডুব দিল। কেন? কেন তিনি এমন একটা জঘন্য, বিকৃত স্বপ্ন দেখলেন? তাঁর মতো একজন যুক্তিবাদী, মার্জিত এবং উচ্চশিক্ষিতা নারী তাঁর পুরো জীবনেও তো কোনোদিন এমন নিচ, এমন নোংরা স্তরের স্বপ্ন দেখেননি। সুব্রত যে বলল তিনি রাহুলকে নিয়ে ওভারথিঙ্ক করেন... না, সুব্রত কিছুই জানে না। এটা কোনো সাধারণ মায়ের ওভারথিঙ্কিং নয়। এটা তার চেয়েও অনেক, অনেক বেশি কিছু। এটা এক চরম, আদিম ঈর্ষা। একটা বন্য, সর্বগ্রাসী পজেসিভনেস। কিন্তু কেন? তিনি কার প্রতি ঈর্ষাকাতর? দেবলীনার প্রতি? কিন্তু দেবলীনা এমন কী করেছে? হ্যাঁ, মহিলা হয়তো একটু বেশি গায়ে-পড়া, একটু বেশি লাউড, কিন্তু তাই বলে তিনি তো আর কোনো অপরাধ করেননি। তিনি তো শুধু রাহুলের চেহারার প্রশংসা করেছিলেন, ওর হাত ধরেছিলেন, আর ওকে নিজের বাড়িতে ইনভাইট করেছিলেন। একজন সাধারণ মায়ের তো এতে খুশি হওয়ার কথা যে অন্য একজন মানুষ তার ছেলেকে এতটা আপন করে নিচ্ছে। কিন্তু ইন্দিরা খুশি হননি। তিনি খুশি হওয়ার বদলে, ওই সামান্য একটা ইনভিটেশনকে নিজের অবচেতন মনে এমন একটা বিকৃত, অসম্ভব আর বীভৎস রূপ দিয়েছেন যে, তিনি স্বপ্নে দেখেছেন ওই মহিলা তাঁর ছেলেকে... ইন্দিরা অন্ধকারের মধ্যেই নিজের দুটো হাত দিয়ে নিজের মুখটা শক্ত করে ঢেকে ফেললেন। তাঁর নিজের ওপরই নিজের তীব্র ঘৃণা আর লজ্জা হতে লাগল। তিনি কী করে ভাবতে পারলেন যে দেবলীনা ওরকম কিছু করতে পারে? তাঁর অবচেতন মন এতটা নোংরা, এতটা কলুষিত হয়ে গেছে? তাঁর নিজেরই এখন ডুকরে কেঁদে উঠতে ইচ্ছে করছিল। তিনি কেন এমনটা ভাবলেন? তাঁর শিরদাঁড়া দিয়ে হঠাৎ এক হিমশীতল, বরফের মতো ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। কারণটা দেবলীনা নয়। দেবলীনার সাথে এর কোনো সম্পর্কই নেই। দেবলীনা তো শুধু তাঁর নিজের অবচেতন মনের একটা ক্যানভাস মাত্র, একটা প্রজেকশন। আসল কারণটা হলো ইন্দিরা নিজে। তাঁর নিজের ভেতরের অনুভূতি। গত বেশ কিছুদিন ধরে রাহুলকে নিজের মতো করে কাছে না পাওয়ার ওই যে দমবন্ধ করা ফ্রাস্ট্রেশন, বুকের ভেতরের ওই যে খামচে ধরা শূন্যতা আর হাহাকার—সেগুলোই তো তাঁকে তিলে তিলে পাগল করে দিচ্ছে। তিনি যে তাঁর ছেলেটাকে একটু শান্তিতে ছুঁতে পারছেন না, একটু আদর করতে পারছেন না... সেই না-পাওয়ার আগুনটাই তো আজ এই জঘন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে ফেটে পড়েছে। ওই স্বপ্নটা... ওই স্বপ্নটা দেবলীনার কোনো বিকৃত কামনার প্রতিফলন ছিল না। ওটা ছিল ইন্দিরার নিজেরই এক গোপন, অবদমিত কামনার প্রতিফলন। ওটা ছিল তিনি নিজে কী চান, তারই এক উলঙ্গ, বীভৎস প্রকাশ। তিনি ঠিক কী চান? তিনি কি তাঁর ছেলেটাকে নিজের কাছে পেতে চান?... হ্যাঁ, সে তো বটেই, প্রচণ্ডভাবে চান। তাঁর পাশে, একদম গা ঘেঁষে রাখতে চান?... হ্যাঁ, সেটাও তো চান, বিন্দুমাত্র দ্বিধা ছাড়া। তাঁর গায়ের ওপর লেপ্টে শুয়ে থাকা অবস্থায় চান?... হুমম... হ্যাঁ, সেটাও... কিন্তু আরও... স্কিন-টু-স্কিন হয়ে জড়িয়ে ধরে আদর করতে চান?... হুমম... কিন্তু... আরও... মুখে মুখ লাগিয়ে চুমু খেতে চান?... হুমম... কিন্তু... আরও... আরও কিছু... নিজের বুকে মুখ দিয়ে ছেলেকে খাওয়াতে চান?... হুমম... কিন্তু... আরও... আরও... আরও... আরও... স্বপ্নের সেই শেষ দৃশ্যটা—মেঝের ওপর লুটিয়ে থাকা কাপড়, বিছানার সেই বন্য, ছন্দোবদ্ধ কম্পন, আর সেই রুদ্ধশ্বাস, স্যাঁতসেঁতে গোঙানি—সবকিছু ক্ষণিকের জন্য ইন্দিরার চোখের সামনে আবার একটা জ্বলন্ত ফ্ল্যাশের মতো ফুটে উঠল। তাঁর শ্বাসটা বুকের ভেতর জট পাকিয়ে গেল। হৃৎপিণ্ডের গতিটা হঠাৎ করেই স্তব্ধ হয়ে গেল বলে মনে হলো। তবে কি... তিনি... তাঁর নিজের ছেলেকে... তাঁর ভিতরে চান?