মা ও ছেলের গল্প - অধ্যায় ২৭
( 33 - পর্ব )
রাবেয়া বেগম একটু হেসেই আসিফের দিকে তাকিয়ে বললেন,
রাবেয়া বেগম: "থাক থাক, এই বুড়িটাকে নিয়ে আর ভাবতে হবে না। তার চেয়ে তুই বরং তাড়াতাড়ি পানিতে নাম, রোদে গা পুড়ে যাচ্ছে।"
মায়ের কথা শুনে আসিফ একটু হেসে চটুল সুরে বলল,
আসিফ: "তুমি বুড়ি হতে যাবে কেন মা! তুমি তো এখনও ডবকা মালই আছো।"
ছেলের মুখে এমন সস্তা ও চপল শব্দ শুনে রাবেয়া বেগম বেশ অপ্রস্তুত হলেন। তিনি চোখ বড় বড় করে আসিফের দিকে তাকিয়ে কিছুটা ধমকের সুরে বললেন,
রাবেয়া বেগম : "ধুর পাগল! মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে কেউ এমন ভাষা ব্যবহার করে কথা বলে? দিন দিন তোর মুখের লাগাম একদম ছুটে যাচ্ছে।
আসিফ মায়ের বকুনি শুনে একটু থতমতো খেল, তবে নিজের কথার পক্ষে যুক্তি দিয়ে আমতা-আমতা করে বলল,
আসিফ: "মা, আমি কোথায় মুখের ভাষা খারাপ করলাম? আমি তো ঠিকই বলেছি। তুমি আসলেই এখনও অনেক ডবকা আছো।
রাবেয়া বেগম আসিফের কথার পিঠে হাত নেড়ে একটু হেসেই বললেন,
রাবেয়া বেগম: "হয়েছে হয়েছে, মাকে নিয়ে আর আদিখ্যেতা করতে হবে না। তোর কথা আমি খুব ভালো করেই বুঝি।"
আসিফ মায়ের কথা শুনে মুচকি হাসল। সে মায়ের মান ভাঙাতে এবং পরিবেশটা আরও সহজ করতে নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
আসিফ: "আচ্ছা মা, আর আদিখ্যেতা করব না। চলো, আমরা দুজনে মিলে হাতে হাত ধরে একসাথেই পুকুরে নামি।"
ছেলের এই আবদার দেখে রাবেয়া বেগমের মনটা স্নেহে গলে গেল। তিনি আর না করতে পারলেন না। আসিফের হাতটা শক্ত করে ধরে হেসে বললেন,
রাবেয়া বেগম : "চল, আর দেরি করে কাজ নেই।"
রাবেয়া বেগম আসিফের হাত শক্ত করে ধরে ধীরপায়ে পুকুরঘাটের সিঁড়ি বেয়ে নামতে শুরু করলেন। ঠিক তখনই পানির ছোঁয়া লাগা নিচের সিঁড়িগুলোর দিকে তাকাতেই তাঁর চোখ আটকে গেল ঘন সবুজ, পিচ্ছিল শেওলার আস্তরণের ওপর।
পানির ঠিক নিচের সিঁড়িগুলো দীর্ঘদিন ধরে নিমজ্জিত থাকায় গাঢ় সবুজ রঙের মখমলের মতো শেওলায় ঢেকে ছিল, যা দুপুরের রোদের আলোয় পিচ্ছিল হয়ে চকচক করছে। শেওলার সেই রূপ দেখামাত্রই রাবেয়া বেগমের পা দুটো যেন থমকে গেল। ভীতি জড়ানো দৃষ্টিতে সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে তিনি যেখানে পা বাড়াচ্ছিলেন, সেখান থেকে আলতো করে পা-টা গুটিয়ে নিয়ে সিঁড়ির ওপর ঠায় দাঁড়িয়ে পড়লেন। তাঁর কপালে ভয়ের হালকা ভাঁজ ফুটে উঠল।
তারপর তিনি আসিফের হাতের ওপর নিজের হাতের মুঠোটা আরও একটু শক্ত করে চেপে ধরে কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন,
রাবেয়া বেগম: "বাবু, আমি তো এক পা-ও নড়তে পারছি না রে। সিঁড়িটা বড্ড পিছল, আমার খুব ভয় করছে।"
আসিফ মায়ের হাতের কাঁপুনি টের পেয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে আশ্বস্ত করার মতো করে মিষ্টি একটা হাসি দিল। সে মায়ের ভয় দূর করতে অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও স্নেহের সুরে বলল,
আসিফ: "মা, তুমি একদম ভয় পেয়ো না। এই পিছল সিঁড়ি দিয়ে তোমাকে হেঁটে নামতে হবে না, আমি তোমাকে পাজাকোলা করে কোলে তুলে পুকুরে নামাবো।"
আসিফ এক মুহূর্তও দেরি না করে মায়ের দিকে এগিয়ে গেল এবং পরম যত্নে রাবেয়া বেগমকে পাজাকোলা করে নিজের শক্ত দুই বাহুর ওপর তুলে নিল।
আসিফ যখন এক হাত রাবেয়া বেগমের পিঠের নিচে এবং অন্য হাত তাঁর হাঁটুর নিচে দিয়ে আলতো করে কোলে তুলে নিল, তখন রাবেয়া বেগম অবলীলায় নিজের দুই হাত ছেলের কাঁধের ওপর জড়িয়ে ধরলেন। ছেলের বুকে ভর রেখে তাঁর মনের সমস্ত ভয় আর জড়তা এক নিমেষেই উধাও হয়ে গেল। মাকে কোলে নিয়ে আসিফ অত্যন্ত সাবধানে, নিজের পুরো শরীরের ভারসাম্য বজায় রেখে একটি একটি করে পিছল সিঁড়ি ভাঙতে লাগল। তার দৃষ্টি ছিল নিচের শেওলাযুক্ত ধাপগুলোর দিকে, যাতে কোনোভাবেই পা পিছলে না যায়। তার প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল অত্যন্ত দৃঢ় এবং দায়িত্বশীলতায় ভরা।
সিঁড়ির শেষ ধাপটি পার হয়ে আসিফ যখন পুকুরের শান্ত ও শীতল পানিতে পা রাখল, তখন পানির প্রথম ছলাৎ শব্দে রাবেয়া বেগমের সারা শরীরে এক চিলতে স্বস্তির শিহরণ খেলে গেল। পুকুরের বুক সমান পানিতে এসে আসিফ পরম মমতায় মাকে নিজের কোল থেকে আলতো করে পানিতে নামিয়ে দিল।
পানির আরামদায়ক ছোঁয়ায় গা ভিজিয়ে রাবেয়া বেগম এক বুক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। তিনি আসিফের দিকে তাকিয়ে স্নেহমাখা হাসিতে বললেন,
রাবেয়া বেগম : "তোর মতো ছেলে পাশে না থাকলে আজ এই বুড়ি নির্ঘাত আছাড় খেয়ে কোমর ভাঙত রে বাবু!"
মায়ের এই কথা শুনে আসিফ একটু রেগে যাওয়ার ভান করল। সে মায়ের দিকে তাকিয়ে চোখ দুটো কিছুটা বড় বড় করে অভিমানের সুরে বলল,
আসিফ: "মা! তুমি নিজেকে একদম বুড়ি বলবে না। তুমি বুড়ি হতে যাবে কেন? তুমি হলে আমার ডবকা মা!"
তিনি আসিফের মুখের দিকে তাকিয়ে কৃত্রিম ধমকের সুরে বললেন,
রাবেয়া বেগম : "ধুর পাগল ছেলে! বড় হয়েছিস কিন্তু মায়ের সাথে কীভাবে কথা বলতে হয় তা এখনো শিখলি না। নিজের মাকে কেউ ওসব কথা বলে?"
তারপর কি হলো জানতে হলে লাইক ও রেপুটেশন দিয়ে দিন।