প্রতিমার জীবন সংগ্রামের ইতিকথা - অধ্যায় ২৯
অষ্টাবিংশ পর্ব :-
শিলিগুড়ির আকাশটা আজ মেঘলা। জানালার বাইরে দূরে কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়াগুলো সাদা কুয়াশায় ঢাকা, যেন কেউ মোটা তুলোর কম্বল মুড়িয়ে দিয়েছে পাহাড়ের গায়ে। সৌম্য তার স্টেশনারি দোকানের কাউন্টারে বসে ছিল। চারপাশে সাজানো রঙিন খাতা, জ্যামিতি বক্স, আর নতুন পেন্সিলের তীক্ষ্ণ গন্ধ। দোকানের ভেতরে একটা অদ্ভুত নিস্তব্ধতা রাজত্ব করে। মাঝে মাঝে কোনো কলেজছাত্র এসে খাতা চায়, বা কেউ রঙের পেন্সিল খোঁজে। সৌম্য হাসিমুখে তাদের কথা বলে, হিসাব মেলায়, কিন্তু তার চোখের মণিগুলো স্থির হয়ে থাকে জানালার বাইরের ধূসর আকাশের দিকে।
প্রতিটা মুহূর্তের ভেতরে একটা শূন্যতা। সেই শূন্যতাটা কোনো ভিড় দিয়ে পূর্ণ হয় না। দোকানের কাজ, মালামালের হিসাব, খাতার পাতার খসখস শব্দ—সবই চলে, কিন্তু বুকের গভীরে একটা নাম প্রতিধ্বনিত হয়। প্রতিমা।
কলকাতা ছাড়ার আগে সে একটা ছোট কাগজের টুকরোয় নিজের নম্বর লিখে প্রতিমার হাতে দিয়েছিল। সেই কাগজটা প্রতিমা কীভাবে রেখেছিল, তা সৌম্য জানে। শাড়ির আঁচলে মুড়িয়ে, ঠিক বুকের কাছে, যেখানে হৃদপিণ্ডের স্পন্দন শোনা যায়। প্রথম কয়েকটা দিন কারোরই সাহস হয়নি ফোনের সেই নীরবতা ভাঙার। ফোনের স্ক্রিনে আঙুল রাখলেও হাতটা কেঁপে উঠত।
তারপর একদিন বৃষ্টি নামল। শিলিগুড়ির বৃষ্টিতে এক ধরণের আদিম গন্ধ থাকে, ভিজে মাটির সাথে মিশে থাকে পাহাড়ের ঠান্ডা বাতাস। দোকানের টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ ড্রামের মতো বাজছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে সৌম্যের ফোনটা কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে অপরিচিত নম্বর, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সৌম্য জানত এটা কে।
সে ফোনটা তুলল। ওপাশ থেকে আসা নিঃশ্বাসের শব্দটা সে চিনতে পারে। এই কণ্ঠস্বর তাকে পাঁচ বছরের জেলখানার চার দেয়ালের ভেতরেও ঘুমাতে দেয়নি। অন্ধকারের রাতে যখন সে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকত, এই কণ্ঠটাই তার কানে ভেসে আসত।
"সৌম্য?"
সৌম্যর গলাটা শুকিয়ে এল। সে নিঃশ্বাস নিল।
"মা?"
ওপাশের কণ্ঠস্বরটা কেঁপে উঠল। যেন অনেক বছর পর কেউ তার নাম ধরে ডেকেছে।
"তুই কেমন আছিস? তোর দোকান কেমন চলছে?"
সৌম্য কাউন্টারের ওপর রাখা একটা পেন্সিল নিয়ে খেলতে লাগল।
"ঠিক আছি। দোকানটাও ভালো চলছে। সবাই এখন রঙিন খাতা আর দামী পেন খোঁজে।"
"মাঝে মাঝে কলকাতায় আসিস না কেন? তোর ইচ্ছে হয় না আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য?"
সৌম্য চুপ করে রইল। বৃষ্টির শব্দটা যেন আরও তীব্র হয়ে উঠল। সত্যিটা বলা সহজ, কিন্তু সেই সত্যিটা বড্ড জটিল। সম্পর্কের জটিলতা যখন রক্তের সাথে শরীর মিশে যায়, তখন শব্দরা হারিয়ে যায়। তবুও প্রতিমার কণ্ঠ শুনলে তার বুকের ভেতরের অশান্ত সমুদ্রটা শান্ত হয়ে আসে।
"আসলে..."
"আসবি তো, তাই না? তোর কথা খুব মনে পড়ে," প্রতিমার কণ্ঠে এক ধরণের আকুলতা।
সৌম্যর ঠোঁটে একটা ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল। সে জানত প্রতিমা তাকে কতটা চায়। সেই চাওয়াটা শুধু মায়ের নয়, তার ভেতরে লুকিয়ে আছে অন্য এক তৃষ্ণা।
"মা, তুমি কেমন আছ? অনিরুদ্ধবাবু কেমন আছেন?"
"ও ভালো আছে। অনিরুদ্ধ ওর ক্লিনিকে এখন খুব ব্যস্ত থাকে। তবে আমি তোর কথা সবসময় ভাবি। অর্নব এখন খুব ভালো পড়াশোনা করছে। তুই জানিস তো, ছেলেটা একদম তোর মতো হয়েছে। কথা বলে, চলাফেরা করে—ঠিক যেন তোরই প্রতিচ্ছবি।"
সৌম্যর বুকটা ধক করে উঠল। অর্নব। তার নিজের রক্ত। তার নিজের বীজ থেকে জন্ম নেওয়া এক শরীর, যে জানেই না তার আসল পরিচয় কী।
সৌম্য দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
"ঋতুপর্ণার কী খবর?"
"আরে, ঋতুপর্ণা নাচের ক্লাসে ভর্তি হয়েছে, ও তো এখন পুরো বাড়িতে নেচে বেড়ায়। অনিরুদ্ধ ওকে নাচের জন্য নতুন একটা ঘুঙুর কিনে দিয়েছে। আর অনন্যা... উফ, সেই ছোট মেয়েটা এখন পুরো বাড়ি মাথায় তোলে। ওর দুষ্টুমি দেখলে তোর হাসি পাবে।"
প্রতিমা যেন প্রতিটা মুহূর্তকে ধরে রাখছিল। কথাগুলোর ভেতরে মিশে ছিল এক ধরণের জীবনানন্দ, যা সে সৌম্যর কানে তুলে দিচ্ছিল। সৌম্য শুধু শুনছিল। সে শুনতে চাইছিল তার সেই দুনিয়াটা, যেখানে সে এখন একজন আগন্তুক। মাঝে মাঝে সে ছোট ছোট কথা বলত, যেন দুজনে মিলে একটা অদৃশ্য সুতো বুনে নিচ্ছে—যেটা কোনোদিন ছিঁড়বে না।
সপ্তাহ পার হলো। ফোন আসত প্রায় প্রতিদিন। কখনো দুপুরের রোদে, কখনো মাঝরাতের নিস্তব্ধতায়। প্রতিবারই কথাগুলো ঘুরত সন্তানদের ঘিরে, সংসারের ছোটখাটো খুঁটিনাটি নিয়ে। কিন্তু কথা শেষ হওয়ার আগে একটা দীর্ঘশ্বাস থেকে যেত।
একদিন সন্ধ্যায় ফোনটা অন্য রকম ছিল। বাইরে তখন আকাশ অন্ধকার, দূরে পাহাড়ের গায়ে বিদ্যুতের চমক দেখা যাচ্ছিল। ফোন ধরতেই প্রতিমার কণ্ঠটা অদ্ভুতভাবে জড়ানো মনে হলো। যেন সে কাঁদছে, অথবা খুব গভীরে কোনো দীর্ঘশ্বাস চেপে রেখেছে।
"সৌম্য..."
"কী হয়েছে মা? তোমার গলা কেমন লাগছে?"
"সৌম্য, তুই কলকাতায় চলে আয় না। থাকবি এখানে। একটা ছোট্ট ঘর ভাড়া করে নে, আমাদের কাছাকাছি কোথাও। আমি দেখা করব তোর সঙ্গে... মাঝেমধ্যে, যখন সুযোগ হবে।"
সৌম্যের হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। সে চোখ বন্ধ করল। প্রতিমার সেই ভেজা চোখ, করুণ চাহনি—সবই তার কল্পনায় ভেসে উঠল। শরীরের ভেতরে একটা টানটান উত্তাপ জেগে উঠল। সেই পুরোনো স্মৃতিগুলো, যেগুলোকে সে শিলিগুড়ির ঠান্ডা বাতাসে জমিয়ে রেখেছিল, সেগুলো হঠাৎ করে আগ্নেয়গিরির মতো বিস্ফোরিত হতে শুরু করল।
"মা, আমি কলকাতায় গিয়ে থাকলে সমস্যা হবে।"
প্রতিমার কণ্ঠে এবার অভিমান ফুটে উঠল।
"কী সমস্যা? তুই কি আমার সঙ্গে দেখা করতে ভয় পাস? নাকি এখন তুই অনেক বড় মানুষ হয়ে গেছিস?"
"বিষয়টা ভয় বা অহংকারের নয়, মা। তুমি জানো আমি কথা বলছি কার সম্পর্কে। তোমার বর্তমান স্বামী জানে না যে আমি তোমার ছেলে। উনি এখনও আমার কথা জানেন না। আর অর্নবের ব্যাপারটা..."
সৌম্যর গলাটা ভারী হয়ে এল। সে একবার দোকানের জানালার বাইরে তাকাল। অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে।
"যদি কেউ কোনোদিন জানতে পারে, মা, তবে শুধু তোমার জীবন নষ্ট হবে না। অর্নবের জীবন আর ভবিষ্যৎ সব ধুলোয় মিশে যাবে। যখন অর্নব জানবে যে তার বাবা স্বয়ং তার বড় দাদা সৌম্য... সেই সত্যিটা সে নিতে পারবে? সে কি পারবে সমাজের সামনে মাথা তুলে হাঁটতে? ঋতুপর্ণা, অনন্যা—ওদেরকেও সমাজের ঘৃণা শুনতে হবে। এই লজ্জার কালো ছায়া ওদের সারা জীবন তাড়া করবে।"
ফোনের ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা। শুধু বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ শোনা যাচ্ছিল। তারপর প্রতিমার কণ্ঠ—খুব নিচু, প্রায় ফিসফিস করে।
"আমি জানি রে। আমি সব জানি। কিন্তু তুই যে এত দূরে থাকিস... এই দূরত্বটা আমার সহ্য হয় না।"
"মা," সৌম্যের গলা ভেঙে এল। "তোমাকে দেখলে আমার মনে পড়ে—সেই দিনগুলো। ওই রাতগুলো। আমাদের দুজনের মধ্যে যে সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, সেটা কোনো ছেলে আর মায়ের মধ্যে হওয়া উচিত ছিল না। আমি যদি কলকাতায় থাকি, তবে আমি নিজেকে সামলাতে পারব না। আবার সব মনে পড়বে। সেই ছয়-সাত বছর আগের কথা।"
প্রতিমা চুপ হয়ে গেল। সৌম্যর নিঃশ্বাস দ্রুত হতে লাগল। স্মৃতিগুলো এখন জীবন্ত হয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে।
"যখন আমি আমাদের বাড়ির রান্নাঘরে, শোবার ঘরে তোমাকে চেপে ধরেছিলাম... যখন আমি তোমাকে চুদেছিলাম, তখন তুমি আমার চোখে চোখ রেখেছিলে। সেই চাহনি আমি ভুলতে পারব না। সেই শরীর, সেই উষ্ণতা... আমি যদি আবার ফিরে যাই, তবে আমি তোমাকে ছাড়তে পারব না। আর সেটা হবে আমাদের সবার জন্য ধ্বংসের পথ।"
ওপাশ থেকে প্রতিমার একটা চাপা আর্তনাদ শোনা গেল। সে কিছু বলল না, শুধু দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। সৌম্যর বুকের ভেতরটা কাঁপছিল। সে জানে প্রতিমাও সেই উত্তাপ অনুভব করছে। এই নিষিদ্ধ সম্পর্কের টান তাদের দুজনকে দুজনের দিকেই ঠেলে দেয়, আবার ভয় দেখিয়ে দূরে সরিয়ে দেয়।
সৌম্য একটা গভীর শ্বাস নিল। সে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল।
"তাই, মা, আমি কলকাতায় স্থায়ীভাবে থাকব না। আমি মাঝে মাঝে কলকাতায় যাব। দোকানের কেনাকাটার জন্য, মালামাল সংগ্রহের জন্য কলকাতায় যাব। কোনো হোটেলে থাকব। সেখানে থেকে তোমাকে ফোন করব, তুমি এসে আমার সঙ্গে দেখা করবে। কিছুক্ষণ কথা বলব, তোমার সুন্দর মুখটা দেখব, তোমার শরীরটা অনুভব করব... আর তারপর আবার শিলিগুড়িতে ফিরে আসব। তার বেশি এগোলে, আমার আর ফেরা হবে না। আমি তোমাকে হারাতে চাই না, আর নিজের জীবনকেও ধ্বংস করতে চাই না।"
ফোনের ওপাশ থেকে অনেকক্ষণ পর একটা দীর্ঘ এবং ভারী নিঃশ্বাস ভেসে এল। প্রতিমার কণ্ঠস্বর এখন শান্ত, কিন্তু তাতে এক ধরণের আত্মসমর্পণ।
"ঠিক আছে, বাবা। তোর ইচ্ছেই হোক।"
ফোন রাখার ঠিক আগে প্রতিমা আরেকটা কথা বলল। তার কণ্ঠস্বর খুব হালকা, কিন্তু প্রতিটি শব্দ যেন পাথরের মতো ভারী।
"তুই কিন্তু আসবি, সৌম্য। এক মাস অন্তর আসবি। তুই যদি কলকাতায় না আসিস, তবে আমি আর ধৈর্য ধরতে পারব না। আমি বাসে চড়ে শিলিগুড়ি চলে যাব। তোর দোকানের সামনে এসে দাঁড়াব।"
সৌম্যর ঠোঁটে এক অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল। কয়েক বছরে এই প্রথম তার মুখে এমন এক শান্ত আর তৃপ্তির হাসি ফুটেছে। সে অনুভব করল, প্রতিমার এই অধিকারবোধটাই তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
"আসবো, মা। নিশ্চয়ই আসবো।"
ফোনটা রাখার পর সৌম্য ধীরে ধীরে দোকানের শাটার নামাল। লোহার শাটার নামার কর্কশ শব্দটা রাতের নিস্তব্ধতাকে চিরে দিল। সে বাইরের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকাল। দূরে নক্ষত্রগুলো প্রদীপের মতো জ্বলছে। রাতের বাতাস এখন আরও ঠান্ডা।
সৌম্যর মনে হলো, জীবনটা এক অদ্ভুত খেলা। সে একদিকে ছেলের পরিচয় নিয়ে লড়াই করছে, অন্যদিকে বাবার ভূমিকা পালন করার আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু সবকিছুর ঊর্ধ্বে সে কেবল প্রতিমার। শুধু প্রতিমার।
সে আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, "আমি আসবো, মা। খুব শীঘ্রই আসবো।"
শিলিগুড়ির রাস্তাগুলো এখন শুনশান। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় রাস্তার ধুলোবালিগুলো উড়ছে। সৌম্য বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল, কিন্তু তার মনে তখন কলকাতার সেই হোটেল রুমের কথা, যেখানে প্রতিমা আসবে। সেই মুহূর্তের কল্পনা তাকে এক অদ্ভুত উন্মাদনার ভেতরে ডুবিয়ে দিল। সে হাঁটছিল, কিন্তু তার মন তখন বহুদূরে, এক নিষিদ্ধ প্রেমের শহরে।