চারুলতা (উপন্যাস) (সম্পূর্ণ) - অধ্যায় ৪৭
চারুলতা
লেখক - কামসম্রাট
পর্ব - ৪৫
ভোরের আলো সবে ফুটেছে মাত্র। জেঠু ও লাঠিয়ালদের সঙ্গে নিয়ে আমি আমাদের বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ালাম। লতা আমাদের আওয়াজ পেয়ে দরজা খুলে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে এসে আমার বুকে আছড়ে পড়লো আর আমি তাকে দুহাতে সরিয়ে তার গালে একটা চড় বসিয়ে দিলাম। সে টাল সামলাতে না পেরে মাটিতে আছড়ে পড়লো।
- দাদা!!!!!
- চুপ! আমার বোন লতা...মারা গেছে !
- কি বলছিস তুই!
- এখনও বলিনি....এবার বলা শুরু করছি।
লতা গালে হাত দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। ঘর থেকে নিশীথ বেরিয়ে এসে এই দৃশ্য দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল আমার দিকে।
- দাদা।
এই ডাক শুনে আমার মাথায় রক্ত উঠে গেল। সামনে গিয়ে তাকে ধরে শূন্যে তুলে মাটিতে আছড়ে ফেললাম।
- আহহহহহহ্...!!!!
পিঠের যন্ত্রনায় নিশীথ ছটফট করে কঁকিয়ে উঠলো। আমি এবার ওদের দুজনের দিকে তাকিয়ে একটা কাহিনী বলা শুরু করলাম, যে কাহিনী আমার ও চারুর অগোচরেই ঘটে চলেছিল এতদিন আর তার কিছুটা আভাস আমার বাবা শেষদিকে পেয়েছিল। বাবা বলেছিল চারুর বিপদের কথা, তাহলে বাবা এই বিপদের কথাই বলতে চেয়েছিল! নিশীথ উঠে দাঁড়ালো আর সঙ্গে সঙ্গেই লাঠিয়ালরা তাকে ও লতাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে পড়লো।
আর আমি শুরু করলাম একটা কাহিনী!
- লতা, আমি বলে বলে যাবো, তুই একটু মিলিয়ে নিস। যদি ভুল হয়, তবে ধরিয়ে দিস, কেমন?
লতা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কাঁদতে কাঁদতেই, আমি তার কথায় গুরুত্ব না দিয়ে আমার কাহিনী শুরু করলাম।
- নিশীথের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পর প্রথম প্রথম ভালো কাটলেও কিছুদিন পর থেকেই বুঝতে পারলি নিশীথ চরিত্রহীন। প্রথম প্রথম বাধা দিতে গিয়েছিলি, কিন্তু প্রেমে অন্ধ হয়ে ওর এই চরিত্র হওয়া সত্ত্বেও তুই সব মানিয়ে নিলি। ভালোই চলছিল। হঠাৎ এলো মালতী...! কি নিশীথ...ঠিক মতো এগোচ্ছি?
নিশীথ তেমনই 'দাদা' বলে এগিয়ে আসতে লাগলো করুণ মুখে। আমি গুরুত্ব না দিয়ে কাহিনী এগিয়ে নিয়ে চললাম।
- এই মালতী হলো প্রকৃত বেশ্যা। যে ঘরে ঢুকেছে, সেই ঘর-ই ভেঙেছে। যখন আমি তোর বাড়ি যাই সেদিন, তুই প্রথম মালতীর চরিত্র বুঝতে পারিস। তখনও তুই বেঁচে ছিলি। তাই তারপর থেকে মালতী যখন তোর ঘরে তোর চোখের সামনেই তোর স্বামীর সঙ্গে সঙ্গমে লিপ্ত হতে লাগলো, তখন তোর ভালো লাগেনি, রাগ হতো। কিন্তু মানুষ অভ্যাসের দাস! তাই ধীরে ধীরে তোর সবকিছুই অভ্যাস হয়ে গেল। আর এখানেই ঘটলো আমার বোনের মৃত্যু!
- দাদা...!!
- আরে বলছি, বলছি, পুরোটা বলতে দে। নিশীথ বিভিন্ন উপায়ে তোকে বোঝাতে লাগলো যাতে তুই তাদের দলে যোগ দিস আর তুইও রাজি হয়ে গেলি। এর আগে নিশীথের সঙ্গে অসংখ্য মেয়ের শারীরিক সম্পর্ক ছিল। আর নিশীথ হলো এমন এক কীট, সে একবার যে মেয়ের দিকে নজর দেয়, তাকে যেন-তেন প্রকারেণ ভোগ করেই ছাড়ে। সুতরাং দল ভারি হলে এই কাজে সুবিধা। সমাজে থেকেও সমাজের মধ্যে কিভাবে ঘুণ ধরানো যায়, তা নিশীথ বেশ ভালোভাবেই রপ্ত করে নিয়েছিল। এবার শুরু হলো ভোগের খেলা! বাড়িতে পরপুরুষ ডেকে তোর সঙ্গে মিলিত হতে সে সাহায্য করতে শুরু করলো বনদুলিতেই। তোর যে সত্তা ছিল তা মরে গিয়ে তুই হয়ে পড়লি এক বেশ্যা...ওই ঠিক মালতীর মতো!
- দাদা তুই এগুলো কি বলছিস? আমি যে কিছুই বুঝতে পারছি না!
- এবার শুরু হলো নিশীথের আসল চাল। তার নজর পড়লো আমার মায়ের দিকে। সে তোকে সবকিছু খুলে বললো, তুইও দেখলি বেশ তো, আমিও যেমন, মাকেও তেমনি বানিয়ে ছাড়বো। তখন তুই শুরু করলি তোদের খুব গোপন এক ষড়যন্ত্র, যা তখন আমি ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি। ৭ মাসের পোয়াতি অবস্থায় তুই নিশীথকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের বাড়ি এলি। সঙ্গে নিয়ে এলি মালতীকেও। আমি কতো বোকা ছিলাম দ্যাখ, ভেবেছিলাম নিশীথ মালতীকে নিয়ে এসেছে, তুই স্বামীর কথায় না বলিস নি! যাইহোক, তুই তোর কাজ গোপনে করে যাচ্ছিলি। আমি তো ভাবতাম তুই মায়ের আর আমার ব্যাপারে কিছুই জানিসনা, হায় রে, আমাদের বাড়ির আসার আগে তুই সব জেনেই এসেছিলি, আমি এটাও বুঝতে পারিনি।
- না....আমার প্রিয় দাদা....আমি তোর আর মায়ের সম্পর্কের কথা সেদিন পুকুরপাড়েই জানতে পেরেছিলাম, তার আগে নয়। বিশ্বাস কর্। আমি যে বেশ্যা বোন রে তোর! হি হি হি হি হি হি হি হি হি!!!
পাকা বেশ্যার মতো হেসে উঠলো লতা। এবার লতা আর নিশীথের আসল রূপ বেরিয়ে এলো। এতক্ষন ধরে নাটক করে তারা যেন হাঁপিয়ে উঠেছিল। আমি কাহিনী বলা চালিয়ে গেলাম।
- যাক্, তোর ওই মিথ্যা কান্নাটা আমি আর নিতে পারছিলাম না। যাইহোক, কোথায় ছিলাম, হ্যাঁ...তো তুই সেইদিন পুকুরপাড়ের সেই ঘটনা দেখেই আমাদের ব্যাপারে সব বুঝেছিলি। বেশ তাই মানলাম। কিন্তু আমি এতোই বোকা যে আমাদের কথা যাতে তোর কানে না যায়, সেজন্য শুধু শুধু কত চিন্তা করে গেছি। তো এবার শুরু হলো তোদের পরের চাল, মাকে তোদের মতো বানানো। তাই খুব সুষ্ঠুভাবে ছক বানিয়ে নিশীথ ও মালতীকে দিয়ে তুই পাশের বাড়ির বেশ্যা নীলার কাছে পাঠিয়ে দিলি নিজের মা কে! আমি ভেবেছিলাম ওটা নিশীথ আর মালতীর চাল, আর তুই হয়তো ওরা যা বলেছে তাই মেনে নিয়েছিলি সরল মনে। তোকে কত সরল ভাবতাম আমি মায়ের মতো!
- এখন কি ভাবছিস.....সরল নই? মা....য়ের ম.....তো?
- আজ্ঞে না, তুই আদতেই একটা বেশ্যা। তুই মায়ের নখের যোগ্যও নোস। তোরা বুঝতে পারলি যে প্রত্যেকবারই আমি এসে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছি। তোদের ঠিক সুবিধা হয়ে উঠছিল না মাকে তোদের মতো তৈরি করতে। তাই তোরা ঠিক করলি বাড়িটাকেই বেশ্যাখানা বানিয়ে দিবি, এতে মাকে যদি কিছুটা কাছে আনা যায়। তাতেও ব্যর্থ হলি। তারপরেও হাল ছাড়লি না। আমার আর মায়ের অনুপস্থিতিতে তোরা মালতীকে জঙ্গলের মধ্যে এক গোপন ডেরায় ঘাঁটি গেড়ে বসতে বললি যাতে কিছুদিনের মধ্যেই মাকে সেখানে পাঠিয়ে দিতে পারিস আর মালতী তাকে নিজের মতো করেই গড়ে নিতে পারে। হায় রে...নিজের পেটের মেয়ে হয়েও মাকে চিনতে পারলি না তুই! মা যে তোদের মতো নয় রে! ও যে নিস্পাপ একটা সত্তা!
- বাব্বা, প্রেম ধরছে না বুকে.....কি হয়ে গেছিস দাদা তুই!!!
- আর একইসঙ্গে ভাবলি গাঁয়ের সকলের কাছে আমাদের সম্পর্কের কথা জানিয়ে তুই আমাদের সম্পর্ক ভেঙে ফেলবি। এতে আমি আলাদা হয়ে যাবো আর তোরা মাকে পেয়ে যাবি। কিন্তু আমি আলাদা হওয়া দূর, মাকে সঙ্গে নিয়ে আমি এই গাঁ ছেড়েই চলে যাবো ঠিক করাতে তুই আর নিশীথ শেষ চালটা চাললি। পরশু আমাদের কাছে ভালো হয়ে যাওয়ার অভিনয় করলি। আর আমি এতোটাই বোকা যে তোদের এই হঠাৎ পরিবর্তন দেখেও তা বিশ্বাস করে নিলাম। এবার তোদের মোক্ষম ও সর্বশেষ অস্ত্র প্রয়োগ করলি আমাদের ওপর, মায়ের সাথে ঘুমোবি বলে রাতে আমার থেকে মাকে আলাদা করে দিলি।
- বাব্বা....দাদা....তুই তো অন্তর্যামী হয়ে গেছিস রে....!
- হ্যাঁ...বলতে পারিস। তুই বলেছিলি শেষ রাতে ওরা এসেছিল, কিন্তু ওরা শেষ রাতে নয়, আমাদের শুয়ে পড়ার কিছুক্ষণ পরেই এসেছিল। আর মা আমাকে যাওয়ার আগে জানাতে চেয়েছিল, কিন্তু তুই তার সরল মনের সুযোগ নিয়ে তাকে আটকে দিস। আর সেখানেই মা বিপদে পড়লো। আর আমি এটাও বুঝতে পারলাম যে তুই মাসির বাড়ির নাম কেন করলি, কারণ তোদের আরও কিছুটা সময় দরকার ছিল মাকে এখান থেকে সরিয়ে ফেলার। আর আমি যদি বনটুলিতে যাই, তবে যেতে আসতে আমার দুপুর গড়িয়ে যাবে আর তোরা কাল রাত থেকে আজ দুপুর পর্যন্ত যথেষ্ট সময় পেয়ে যাবি মাকে ঠিক জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার। কি তাইতো নিশীথ?
- আজ্ঞে। কিন্তু তুমি জানলে কি করে এতে আমরা জড়িত?
- হ্যাঁ দাদা, এটাও তোর বেশ্যা বোনের একটা আবদার, তুই কিভাবে জানলি আমরাই এটা করেছি? আমরা তো গোপনে খেলতে চেয়েছিলাম!
এইসময় মোড়ল জেঠু কথা শুরু করলো।
- এই যে নিশীথ, তোমাদের দুজনের ব্যবস্থা আমরা করবো, তার আড়ে সত্যিটা জেনেই নাও। কাল যখন চয়ন সব খুলে বললো আমায়, আমি লোক লাগিয়ে খবর পেলাম রাত ১১ টার দিকে ডমরু সহ আরও কিছুজনের সঙ্গে তারা তোমার শাশুড়িকে যেতে দেখেছে, বনটুলির দিকে নয়, জঙ্গলের দিকে। তারপর এক ব্যাটাকে ধরে জানতে পারলাম তোমার আর লতার নির্দেশেই সব ঘটেছে। কাল-ই আমি এই বাড়িতে এসে চয়নকে সব বলে দিয়েছিলাম তোমাদের কথা।
- বাব্বা, দাদা, তুইও বেশ অভিনয় পারিস তো? তার মানে কাল জেঠু এসে তোকে বাইরে কথা বলার জন্য এইজন্যই ডেকেছিল যাতে আমাদের মুখোশটা খুলে ফেলতে পারে?
- হ্যাঁ লতা, সেইজন্যেই তোর সামনে জেঠু আমায় কাল কিছু বলেনি।
- সে তো বুঝলাম দাদা, কিন্তু জেঠুর সঙ্গে কথা হওয়ার পর থেকে তোর মুখ দেখে তো আমি কিচ্ছু বুঝিনি যে তুই আমাদের ব্যাপারে সব জেনে গেছিস? কি অভিনয়টাই করলি রে তুই....! একটা হাততালি!
- হ্যাঁ, কারণ তোকে জানতে দিলে মায়ের বড়ো ক্ষতি হয়ে যেতো কালই! সেইজন্যেই তুই কাল বারে বারে জিগ্যেস করছিলি জেঠু কিছু জানতে পেরেছে কিনা মায়ের ব্যাপারে! বাহ্...!
- হ্যাঁ রে দাদা...! তবে একটা সত্যি বলবো, বাপটা মরেছে ভালোই হয়েছে, ও অনেক কিছু জেনে গিয়েছিল আমাদের ব্যাপারে! বেঁচে থাকলে আমাদের এগুলো হতোই না....কি নিশীথ?
ঠাস!!!!
আবার একটা চড় মারলাম লতাকে। লতা চড় খেয়েও বেশ্যার মতো খিলখিল করে হেসে উঠলো আমাদের দিকে চেয়ে।
- বাবা তোদের আসল রূপ চিনে গিয়েছিল, কিন্তু বলে যেতে পারেনি।
এবার জেঠু এগিয়ে এসে গম্ভীর গলায় বললো,
- তোমাদের সব রহস্য উন্মোচন হলো। এবার নিশীথ... চারুলতা কোথায় সেটা বলে দাও, তারপর তোমাদের ব্যবস্থা করবো!
লতা হেসে বললো,
- ও জেঠু....বলি ওই ঘরটাই একবার চলো না গো....কিছু কথা বলি তোমার সঙ্গে...একটু কাছাকাছি!
বলে লতা জেঠুর গায়ে স্পর্শ করলো, কিন্তু জেঠু তাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে গর্জে উঠলো,
- দূরে.....। নিশীথ বলো বলো, হাতে সময় নেই। তুমি এমনিতেই ফেঁসে গেছো। তোমাদের চারুর খোঁজ দিলেও বিপদ হবে, না দিলেও হবে। তাই দিয়েই ফেলো। শুধু শুধু আমার লাঠিয়ালদের তাদের লাঠিগুলোর রক্ত পরিস্কার করতে ভালো লাগে না! কি বলো তোমরা?
লাঠিয়ালগুলো সেই কথা শুনে এবার নিশীথকে ঘিরে দাঁড়িয়ে পড়লো। নিশীথ ভয় পেলো। আমি চারুর ওপর এত অত্যাচারের জন্য ভেতর থেকে হুঙ্কার ছাড়ছিলাম এতক্ষন, এবার তার বাহ্যিক প্রকাশ ঘটলো।
- অ্যাই তুই বলবি? নাকি.....!!!
কথা থামিয়ে নিশীথের কাছে গিয়ে লতার সামনেই তার অন্ডকোষ চেপে ধরলাম।
- তোর প্রিয় ঠ্যাঙাড়ে ডমরুর এগুলো ফাটিয়েছি, এবার তোর....! আমি আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করবো না! তোরা কি ভেবেছিলি...মাকে মালতীর কাছে গভীর জঙ্গলে পাঠিয়ে দিবি আর আমি হাল ছেড়ে দেবো। আর তারপর তোরা মায়ের সারল্যের সুযোগ নিয়ে তাকে ব্যবহার করবি? বল্.....কোথায় মা!!!
আমি তার অন্ডকোষ চেপে ধরতেই সে যন্ত্রনায় ছটফট করে উঠলো, আর তার মুখ দিয়ে গড়গড় করে সব কথা বের হয়ে পড়লো...!
- বলছি.....বলছি.....বলছি....বলছি..... ছেড়ে দাও..... উফফফফফফফফ্...!!!
তখন দুপুর। পরিস্কার আকাশে রোদ উঠেছে। গভীর জঙ্গলের মধ্যে একটা ছোট্ট কুটির। আমি ছুটে গেলাম তার কাছে।
- চারু....চারু.... কোথায় তুমি.....?????
আমার ডাক শুনে চারুলতা....আমার চারুলতা বেরিয়ে এলো কুটিরের ভেতর থেকে....আর আমায় দেখতে পেয়ে ছুটে আসতে লাগলো আমার দিকে! আমিও দৌড়ে গেলাম তার কাছে!
- চারু.....!!!!!
- বাবু......!!!!!!!!!
চারুকে জড়িয়ে ধরলাম বুকে।
- তোমায় বলেছিলাম আমাকে না জানিয়ে কোত্থাও যাবে না! কেন গিয়েছিলে চারু?
আমি কেঁদে ফেললাম, তবে আমার আগে কাঁদলো চারুলতা... আমার চারুলতা!
- আমি বলতে চেয়েছিলাম বিশ্বাস করো, কিন্তু লতা আমাকে মানা করেছিলো গো....! ওরা বললো আমাকে দিদির বাড়ি নিয়ে যাবে...দিদির নাকি খুব অসুখ! তারপর ওরা আমায় এখানে মালতীর কাছে রেখে দিয়ে গেল।
আমি তাকে দেখলাম ভালো করে। যে কাপড়ে তাকে পরশু রাতে শেষবার দেখেছিলাম শুতে যাওয়ার আগে, আজও সেই কাপড়েই তাকে দেখলাম। পাগলের মতো তার হাত, পা, মুখ সব দেখতে লাগলাম কোথাও কোনো ক্ষতচিহ্ন আছে কিনা।
- কিছু করেনি তো চারু ওরা তোমার সঙ্গে?
চারু ভেজা চোখে কাঁদতে কাঁদতেই বললো,
- না, শুধু মালতীই ছিল তো আমার সঙ্গে!
এবার দেখলাম মালতী কুটিরের বাইরে বেরিয়ে এলো। আমাদের দিকে তাকিয়ে ভয় পেয়ে গেল সে। আমি চারুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। আমার পেছনে মোড়ল জেঠু। আর লাঠিয়ালের দল নিশীথ ও লতাকে ধরে রেখেছে। রতনকে গাঁয়ে একজনের বাড়িতে রেখে আসা হয়েছে। মালতী কাছে এলো না, ওখানেই ভীত দৃষ্টিতে আমাদের দেখতে লাগলো। আমি আবেগে চারুর কপালে একটা চুমু খেলাম। জেঠু আমাদের কাছে এগিয়ে এসে হাসিমুখে বললো,
- চয়ন। বাবা একটা কথা বলবো?
আমি লজ্জায় মুখ নিচু করে তাকে সসম্মানে বললাম,
- বলুন জেঠু।
- তোমরা গোবাদা ছেড়ে যেওনা। তোমাদের প্রেম দেখে সত্যি বলতে আমরাও প্রেমের অর্থ বুঝতে পেরেছি। হয়তো মা-ছেলের প্রেম সমাজে নিষিদ্ধ, কিন্তু আমাদের গোবাদায় তোমরা থেকে যাও স্বচ্ছন্দে। আমি বনদুলিতে তোমার স্কু/লে কথা বলে চাকরিটা আবার করিয়ে দিচ্ছি। তোমরা চলে গেলে খুব কষ্ট পাবো বউমা!
চারু লজ্জায় মাথা নামিয়ে চুপ করে জেঠুর সব কথাগুলো শুনছিল। আমি হেসে বললাম,
- আমি আগে থেকেই ঋণী আপনার কাছে, আর ঋণ বাড়াবেন না জেঠু! আপনি যেটা করলেন, তা আমরা কোনোদিন ভুলবো না। কিন্তু জেঠু আমরা চলে যাবো এখান থেকে। আমি কথা দিয়েছিলাম আপনাকে। আমি কথার খেলাপ করি না। আর তাছাড়া আমি নিজেও এখান থেকে যাবার পরিকল্পনা করে নিয়েছিলাম আগেই। আমাদের অনুমতি দিন!
আমরা দুজন জেঠুর পা ছুঁয়ে প্রণাম করলাম। জেঠু আশীর্বাদ করলেন আমাদের দুজনকে।
- তোমরা সুখী হও। আর মাঝে মাঝে এসো গোবাদায়। বনছায়াপুরে একটা স্কু/ল আছে, আমি সেখানে কথা বলে তোমার ইতিহাস শিক্ষকের পদের জন্য ব্যবস্থা করে দেবো। তোমরা সুখে সংসার কোরো।
আমি জেঠুকে আর কি বলে ধন্যবাদ জানাবো! এমন মানুষ কি আর আছে এই দুনিয়ায়! জানি না!
- আচ্ছা চয়ন, এই ৩ জনকে নিয়ে কি করা যায় বলো তো?
- আপনি যা ভালো বোঝেন জেঠু.... আপনার ওপরেই ছাড়লাম।
- বেশ। এই....তোমরা ওই মালতীকেও ধরে নিয়ে এসো....এই ৩ টাকে ধরে গাছের তলায় বেঁধে গাঁয়ের লোকের সামনে চাবুক মেরে গায়ের চামড়া উঠিয়ে দেবো। তারপর গাধার পিঠে চড়িয়ে সারা গাঁ ঘোরাবো! ধরো সবকটাকে।
ঠিক এমনসময় আমি দূরের ওই ঝোপটায় কি যেন একটা দেখলাম, ঝোপটা যেন নড়ে উঠলো। লাঠিয়ালরা ৩ জনকে ধরে এক জায়গায় জড়ো করলো। ঠিক এমনসময় নিশীথ, লতা আর মালতী লাঠিয়ালদের ধাক্কা দিয়ে পালাতে গেল। আর যে ঝোপটা নড়ে উঠেছিল, তার কাছাকাছি যেতেই সেখান থেকে একটা বিরাট বড় বাঘ বেরিয়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়লো তাদের ওপরে। আর আমরা সবাই চেঁচিয়ে উঠলাম।
এটা বোধহয় সেই বাঘটাই! এরা মানুষের রক্তের স্বাদ একবার পেয়ে গেলে তখন মানুষ ছাড়া আর অন্য কিছু চায়না। নিশীথকে থাবা দিয়ে মাটিতে আছড়ে ফেললো। নিশীথ অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। পাশেই লতা আর মালতী মাটিতে পড়ে আছে। লতার জ্ঞান আছে, কিন্তু মালতী বোধহয় বাঘটার আক্রমনের সময় ধাক্কাধাক্কি ও ভয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। বাঘটা লতার দিকে এগিয়ে গেল। হঠাৎ এই দৃশ্য দেখে চারু নিজের মেয়েকে বাঁচাতে আমার হাত ছাড়িয়ে এগিয়ে গেলো আর বাঘটা চারুকে তার কাছে যেতে দেখে চারুর দিকে এগিয়ে এসে গর্জন করে উঠলো। বোঝালো তার শিকারে যেন বাধা না দেয় চারু। আমি একটা লাঠি নিয়ে চারুকে ধরে ফেলে তাকে আমার পেছনে রেখে বাঘটার সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়ালাম। বাঘটা আমার চোখে চোখ রেখে গর্জন করে উঠলো! সে কি বিকট আওয়াজ! স্বয়ং মৃত্যুকে যেন আমি সামনে থেকে দেখতে পেলাম আজ!
- হালুম!!!!!!!
নাহ্, বাঘটা আমাদের আক্রমণ করলো না। কিছুক্ষণ আমার দিকে চেয়ে থেকে পেছন ফিরে লতার কাছে গিয়ে তার গলায় দাঁত বসিয়ে দিলো। লতার গলা থেকে শেষ ডাক বেরিয়ে এলো,
- মা.....!!!!!!!!
চারু কেঁদে ফেলে তার দিকে এগিয়ে যেতে চাইলো।
- লতা.......!!!!!!!!!!!
বাঘটা মাত্র ৩০ হাত দূরেই লতার গলায় কামড় বসিয়ে ওর নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার অপেক্ষা করছে আর চারুর চিৎকার শুনে বসে বসে আমাদের দিকেই তাকিয়ে আছে, কিন্তু উঠে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো না। কারণ তার ইতিমধ্যেই ৩ টা শিকার হয়ে গেছে, আর কত চায়! এতেই কয়েকদিন কেটে যাবে ভালোভাবে!
পাপ বাপকেও ছাড়ে না! লতা, নিশীথ ও মালতী মারা গেল। বাঘটা আমাদের লাঠিয়ালদের দেখে ভয়ে আর এদিকে এলো না। সে ৩ টা মৃতদেহ মুখে করে টেনে নিয়ে ওদিকের ঝোপটায় ঢুকে গেল।
আর চারুলতার গলা থেকে সন্তান হারানোর বুকফাটা আর্তনাদ বেরিয়ে এসে এই বনভূমির বুকে হাহাকার করে উঠলো....!!!
- লতা................লতা.....রে.....!!!!!!!!
অদৃষ্ট বুঝি এভাবেই নেমে আসে!
(ক্রমশ.....)