একলা চলো রে..LOVE, SEX AUR DHOKA - অধ্যায় ৭
সপ্তম পর্ব:
পরের দিন সকালে ঢাকা শহরের আকাশজুড়ে ছিল মেঘের ঘনঘটা। মতিঝিলের ব্যস্ত রাস্তায় গাড়ির হর্ন আর মানুষের ছুটোছুটির আওয়াজ ছাপিয়ে ‘সিরাজ এন্টারপ্রাইজ’-এর সতেরো তলার এক্সিকিউটিভ কেবিনের ভেতর তখন বইছিল এক চরম থমথমে ও বরফশীতল আবহাওয়া। এসি-র তাপমাত্রা সবসময়কার মতো ১৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সেট করা থাকলেও রুমের ভেতরের উত্তাপ যেন অন্য কোনো কারণে বহু গুণে বেড়ে গিয়েছিল।
চেয়ারম্যান আলতাফ সিরাজ চৌধুরী নিজের বিশাল মেহগনি কাঠের টেবিলের পেছনে সোজা হয়ে বসে আছেন। তাঁর চোখের চশমাটা টেবিলের ওপর উল্টো করে রাখা। তাঁর কপালে গভীর ভাঁজ, কুঁচকানো ভ্রু আর চোয়ালের শক্ত পেশিগুলো দেখলেই বোঝা যায় তিনি চরম মাত্রায় বিরক্ত ও ক্ষিপ্ত। গতকাল বিকেলে পুরান ঢাকার সেই ছোট্ট ফ্ল্যাটে ইতির সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো তাঁর মস্তিষ্কে বারবার ঘুরেফিরে আসছে। সেই মোহগ্রস্ততা, সেই প্রলোভন আর ইতির ব্লাউজের ভাঁজে টাকা গুঁজে দেওয়ার দৃশ্যটি তাঁর ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। তিনি সারারাত এক ফোঁটাও ঘুমাতে পারেননি।
তাঁর মনে এক প্রবল জ্বালা তৈরি হয়েছিল—যে নারী বা যে শরীর নিয়ে তিনি এমন মজে আছেন, সেই নারীর স্বামী হলো তাঁর অফিসেরই এক সাধারণ সিকিউরিটি গার্ড, যে প্রতিদিন তাঁর কেবিনের সামনে ডিউটি করে। এই চিন্তাটাই আলতাফ সাহেবের অহমিকায় মারাত্মকভাবে আঘাত হানছিল। তিনি সহ্য করতে পারছিলেন না যে তাঁর অধীনস্থ একজন সামান্য কর্মচারী এমন এক অমূল্য রত্নকে নিজের স্ত্রী হিসেবে ঘরে রাখবে।
আলতাফ সাহেব টেবিলের ওপর রাখা ইন্টারকমের স্পিকারের বাটনটা সজোরে টিপে ধরলেন।
তাঁর গম্ভীর, ভারী ও কর্কশ কণ্ঠস্বর করিডোরের স্পিকার দিয়ে প্রতিধ্বনিত হলো, "সিকিউরিটি গার্ড আবদুল মালেক! বলছি, অবিলম্বে আমার কেবিনে এসে হাজির হও। এক মিনিটের বেশি যেন সময় না লাগে!"
ইন্টারকমের এই আকস্মিক ও হুকুমের সুরে নিচের গেটে বা করিডোরে দায়িত্বরত মালেকের বুকটা কেঁপে উঠল। মালেক তখন সবেমাত্র তার ডিউটি শুরু করেছে। চেয়ারম্যান সাহেবের এমন রাগী গলা শুনে তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত যেন বরফ জমে গেল। সে দ্রুত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে বা লিফটে চড়ে সতেরো তলায় ছুটে এল।
-----
মালেক যখন কাঁপতে কাঁপতে আলতাফ সাহেবের বিশাল কেবিনের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল, তখন তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। সে ঘরের ভেতরে পা রেখেই দুই হাত জোড় করে অত্যন্ত ভয়ে ভয়ে বলল, "আসসালামু আলাইকুম স্যার... আপনি ডেকেছেন? কোনো ভুল হয়েছে কি স্যার?"
আলতাফ সাহেব চেয়ার থেকে এক ইঞ্চিও উঠলেন না। তিনি বরফের মতো ঠান্ডা ও অনুকম্পাহীন দৃষ্টিতে মালেকের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর টেবিলের ওপর রাখা একটা সাধারণ ফাইলের কাগজ দেখিয়ে অত্যন্ত রূঢ় গলায় বলে উঠলেন, "ভুল? তোমার মতো একটা অযোগ্য গাধাকে এই কোম্পানিতে রেখে আমি নিজেই সবচেয়ে বড় ভুল করেছি, মালেক!"
মালেক চমকে গিয়ে আমতা আমতা করে বলল, "স্যার? আমি কী করলাম স্যার? আজ তো আমি কোনো ভুল করিনি..."
"চুপ!" আলতাফ সাহেব হাত উঁচিয়ে তাকে থামিয়ে দিলেন। তাঁর গলার স্বর আরও উঁচুতে উঠল। " মুখে আবার কথা বলে! আজ কয়টায় এসেছ?"
গার্ড মাথানিচু করে বলল, "স্যার, আজ দশ মিনিট লেট হয়ে গেছে!"
আলতাফ সাহেব রেগে বললেন, "তোমার এই সামান্য অবহেলা একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির কত বড় ক্ষতি করতে পারে, তার কোনো ধারণা আছে তোমার ঘিলুতে?"
আসলে প্রায়ই সবাই লেট করে; এটা ছিল মালেককে অপমান করার একটা নিখাদ বাহানা মাত্র। আলতাফ সাহেবের ভেতরের জমে থাকা ক্ষোভ আর হিংসা এখন এই সাধারণ মানুষটার ওপর গিয়ে পড়ছে।
মালেক ভয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে মেঝেতে প্রায় মাথা ঠেকানোর উপক্রম করে বলল, "স্যার, আমাকে ক্ষমা করে দিন স্যার! আমার ভুল হয়ে গেছে স্যার। ভবিষ্যতে আর কখনো এমন ভুল হবে না স্যার। দয়া করে আমাকে মাফ করে দিন!"
আলতাফ সাহেব চেয়ারে পেছনে হেলান দিয়ে বাঁকা হেসে অত্যন্ত কটূ ভাষায় বললেন, "মাফ? তোমাকে মাফ করার জন্য তো আমি এখানে বসিনি! তিন মাস আগে যখন পেটে ভাত ছিল না, আমার পায়ে লুটিয়ে পড়েছিলে—সেকথা কি ভুলে গেছ? আমার দয়ায় তোমার চাকরি হয়েছে, আমার টাকায় তোমার সংসার চলছে, পেটে ভাত জুটেছে। আর আজ তুমি কাজের চেয়ে অন্য ধান্দায় বেশি মন দিচ্ছ!"
-----
মালেক কান্নাকরা গলায় হাত জোড় করে বলল, "না স্যার! আল্লাহর কসম, আমি কোনো ফাঁকি দিই না স্যার। আমি সবসময় সততার সাথে ডিউটি করি।"
আলতাফ সাহেব তাঁর ঠান্ডা চোখ দুটো আরও তীক্ষ্ণ করে মালেকের দিকে তাকালেন। তিনি এমন এক নিষ্ঠুর আঘাত হানলেন, যা মালেক কোনোদিন কল্পনাও করতে পারেনি।
"মিথ্যা কথা বলো না, মালেক!" আলতাফ সাহেব দাঁতে দাঁত চেপে বললেন। "তোমার ভাবভঙ্গি আমি ভালো করেই বুঝতে পারছি। বাড়িতে অমন যুবতী আর সেক্সি বউ থাকলে কারোরই কি আর ডিউটিতে মন টেকে? তোমার বউকে ত দেখেছি! গ্রামের মেয়ে বলো! ঠিকই ত নিজের বিশাল স্তনযুগল আমাকে দেখিয়ে বেড়ালো! সেক্সি বউয়ের মোহে পড়ে থেকে তুমি অফিসের কাজে ফাঁকি দিচ্ছ। তোমার এই ঢিলেঢালা ভাব আমি আর বরদাস্ত করব না।"
মালেক এই কথা শুনে লজ্জায় ও অপমানে একেবারে মাটিতে মিশে যাওয়ার উপক্রম হলো। একজন স্বামীর সামনে তার স্ত্রীকে নিয়ে এমন মন্তব্য করাটা কত বড় অপমান, তা বলে বোঝানো যাবে না। কিন্তু সে প্রতিবাদ করার বিন্দুমাত্র সাহস দেখাতে পারল না।
আলতাফ সাহেব নিজের হুকুম জারি করে ঠান্ডা গলায় বললেন, "শোনো মালেক, আজ থেকে তোমার ডিউটির সময় বাড়িয়ে দেওয়া হলো। সকাল ঠিক ৯টা থেকে তোমার ডিউটি শুরু হবে, আর রাতে অফিস বন্ধ হওয়া পর্যন্ত—মানে রাত ১০টা পর্যন্ত তোমাকে একটানা গেটে দাঁড়িয়ে ডিউটি করতে হবে। কোনো ছুটি নেই, কোনো বাহানা চলবে না। যাও, এখন আমার চোখের সামনে থেকে বের হয়ে যাও!"
মালেক আর একটিও কথা বলার সাহস পেল না। তার চোখ দিয়ে জলের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। সে অত্যন্ত অপমানিত ও ভেঙে পড়া মনে মাথা নিচু করে কেবিন থেকে বেরিয়ে এল।
-----
সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা বেজে গেছে। টানা তেরো ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ডিউটি করার পর মালেক যখন ক্লান্ত শরীর আর বিধ্বস্ত মন নিয়ে পুরান ঢাকার সেই ছোট্ট ফ্ল্যাটে এসে পৌঁছাল, তখন তার চেহারা দেখে চেনার উপায় ছিল না। তার কাঁধে ঝুলে থাকা সিকিউরিটি গার্ডের পোশাকটা ঘামে ভেজা, মুখটা সম্পূর্ণ মলিন ও বিবর্ণ।
সে দরজা খুলে ঘরে ঢোকার সাথে সাথেই ইতি এগিয়ে এল। ইতি তখনো রাতের রান্নার পাট চুকিয়ে তার স্বামীর জন্য অপেক্ষা করছিল। মালেকের এই বিধ্বস্ত ও কান্নাকরা মুখাবয়ব দেখে ইতি সাথে সাথে বুঝতে পারল যে অফিসে কিছু একটা মারাত্মক খারাপ ঘটনা ঘটেছে।
ইতি দ্রুত কাছে এসে মালেকের কাঁধে হাত রেখে উদ্বিগ্ন গলায় বলল, "কী হয়েছে তোমার, মালেক? তোমার মুখটা এমন শুকনো কেন? আজ এত দেরি হলো কেন ফিরতে? অফিসে কি কোনো বড় সমস্যা হয়েছে?"
মালেক আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে ঘরের একটা চেয়ারে বসে পড়ে দুই হাতে মুখ ঢেকে নিঃশব্দ কান্নায় ভেঙে পড়ল। সে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, "ইতি... আজ চেয়ারম্যান সাহেব আমাকে যা-তা ভাষায় গালিগালাজ করেছেন। সামান্য একটা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে আমাকে সবার সামনে অপমান করেছেন।"
ইতি অবাক হয়ে বলল, "সে কী! সিরাজ সাহেব তো খুব ভালো মানুষ ছিলেন, তিনি তো সেদিন আমাদের বাসায় এসে এত সুন্দর ব্যবহার করলেন! হঠাৎ তোমার ওপর এমন রেগে গেলেন কেন?"
মালেক মাথা তুলে অত্যন্ত ক্ষোভ ও অপমানের সুরে বলল, "তিনি শুধু গালিগালাজ করেই ক্ষান্ত হননি, ইতি... তিনি আমার দিকে তাকিয়ে এমন সব নোংরা ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেছেন, যা একজন স্বামীর পক্ষে শোনা অসম্ভব! তিনি বলেছেন, ঘরে নাকি সেক্সি বউ থাকলে কারোরই ডিউটিতে মন টেকে না! তিনি আমার ডিউটি বাড়িয়ে সকাল ৯টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত করে দিয়েছেন। আমার জীবনটা আজ তিনি নরক বানিয়ে দিয়েছেন, ইতি!"
ইতি স্বামীর মাথার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে অত্যন্ত ধৈর্য ও প্রজ্ঞার সাথে তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল। যদিও তার নিজের মনের ভেতরেও আলতাফ সাহেবের সেই অদ্ভুত কথাগুলোর একটা অন্যরকম প্রতিধ্বনি হচ্ছিল, তবুও সে পরিস্থিতি সামলানোর জন্য খুব শান্ত গলায় বলল, "মালেক, তুমি শান্ত হও। প্লিজ এভাবে ভেঙে পড়ো না।"
ইতি আরও বোঝানোর সুরে বলল, "বড় বড় কোম্পানির বড় কর্তারা তো এমনই হন। মাথার ওপর কাজের কত চাপ থাকে, হয়তো আজ কোনো কারণে স্যারের মেজাজ খুব খারাপ ছিল, তাই তোমার ওপর রাগ ঝেড়েছেন। এর পেছনে অন্য কোনো খারাপ উদ্দেশ্য নেই। তুমি অমন খারাপ ভেব না তো!"
মালেক চোখের জল মুছে বলল, "কিন্তু উনি আমার ডিউটি এত বাড়িয়ে দিলেন কেন? আমি সারাদিন খাটব কী করে?"
ইতি অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে স্বামীর হাত চেপে ধরে বলল, "উনি যেভাবে বলেছেন, তুমি ঠিক সেভাবেই কাজ করো। স্যারের কথার ওপর কথা বলতে যেও না। উনি আমাদের অন্নদাতা, উনি আমাদের বাঁচিয়েছেন। আজ হয়তো উনার মন খারাপ তাই এমন করেছেন, কাল ঠিকই সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি একদম মন খারাপ কোরো না, চলো হাত-মুখ ধুয়ে একটু খেয়ে নাও।"
মালেকের মন কিছুটা শান্ত হলো ইতির কথায়। কিন্তু পর্দার আড়ালে আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর এই নিষ্ঠুর আদেশের পেছনে যে এক গভীর ও ভয়ংকর চক্রান্ত লুকিয়ে ছিল, তা তখনো মালেকের কল্পনার বাইরে ছিল।(চলবে)