একলা চলো রে..LOVE, SEX AUR DHOKA - অধ্যায় ২১
একুশ পর্ব
পরের দিন সকালের সোনালী রোদ এসে পড়েছিল গুলশানের সেই সুউচ্চ আলিশান ফ্ল্যাটের বিশাল কাঁচের জানলা ভেদ করে। শিল্পপতি সৈয়দ আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর ব্যক্তিগত ও দুর্ভেদ্য দুর্গ। যে ফ্ল্যাটের প্রতিটি কোণায় জড়িয়ে রয়েছে কোটি কোটি টাকার আভিজাত্য, মার্বেল পাথরের ফ্লোর, ইটালিয়ান ঝাড়বাতি আর দামি সোফা-সেট।
সেই বিশাল ড্রয়িংরুমের মাঝে দাঁড়িয়ে ইতি তখন নিজের চোখ দুটো বড় বড় করে পুরো ফ্ল্যাটটা ঘুরে ঘুরে দেখছিল। তার পরনে সেই পরিচিত হালকা হলুদ রঙের সুতির শাড়ি আর খোলামেলা ব্লাউজ, গলায় ঝুলছে সেই ৭৫ হাজার টাকার লকেট। গতকাল রাতে অ্যাডভোকেট রফিকুজ্জামানের চেম্বারে সই করা সেই ঐতিহাসিক উইলটি এখন আলতাফ সাহেবের লকারে সুরক্ষিত, যার বলে এই ফ্ল্যাটের এবং পুরো ‘সিরাজ এন্টারপ্রাইজ’-এর ভবিষ্যৎ মালিক এখন এই সাধারণ ঘরের মেয়ে ইতি।
ইতি বসার ঘর থেকে হেঁটে ড্রয়িংরুম পেরিয়ে বেডরুম, ডাইনিং রুম আর তারপর সোজা গিয়ে দাঁড়াল বিশাল কাঁচঘেরা বেলকনিতে । বেলকনির দরজা ঠেলে সে যখন বাইরে এসে দাঁড়াল, তখন তার পায়ের নিচে যেন আস্ত একটা শহর লুটিয়ে পড়েছে। গুলশানের সুউচ্চ এপার্টমেন্টের সেই বারান্দা থেকে পুরো ঢাকা শহরের গুলশান লেক, বড় বড় বহুতল ভবন, আর ব্যস্ত রাজপথের প্যানোরামিক ভিউ দেখা যাচ্ছে। সকালের মিষ্টি বাতাসে তার চুলগুলো একটু উড়ছিল, আর তার ফর্সা মুখে ফুটে উঠেছিল এক পরম তৃপ্তি ও বিজয়ের হাসি। সে মনে মনে ভাবল—*‘যে পুরান ঢাকার ছোট্ট স্যাঁতসেঁতে ফ্ল্যাটে আমার দিন কাটত, আজ আমি সেই পুরো শহরের মালকিন হয়ে গেলাম!’*
ঠিক সেই মুহূর্তেই—পেছন থেকে নিঃশব্দ পায়ে হেঁটে এসে আলতাফ সিরাজ চৌধুরী নিজের দুই শক্তিশালী হাত দিয়ে ইতিকে একেবারে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলেন। তাঁর গায়ে তখন ঘরে পড়ার আরামদায়ক সাদা শার্ট ও প্যান্ট। তাঁর মুখাবয়বে বয়সের ছাপ থাকলেও গত রাতের ওই উইলের পর থেকে তাঁর ভেতরের চাঞ্চল্য ও আনন্দ যুবকদের মতো হয়ে উঠেছে।
ইতি একটু চমকে ওঠার ভান করে ঘাড় ঘুরিয়ে আলতাফ সাহেবের দিকে তাকাল। সে খিলখিল করে হেসে উঠে অত্যন্ত আদুরে ও কৌতুকভরা গলায় বলল, "ওমা! আপনি এভাবে লুকিয়ে পেছনে এসে ধরলেন কেন, স্যার? আমার তো হার্টফেল হওয়ার উপক্রম হয়েছিল!"
আলতাফ সাহেব ইতির কাঁধে নিজের মুখটা গুঁজে দিয়ে গভীর তৃপ্তির নিশ্বাস ফেললেন। তিনি ফিসফিস করে বললেন, "তোমার এই চমক দিতে আমার খুব ভালো লাগে, ইতি। বল তো, আমার এই বাসাটা তোমার কেমন লাগছে? কাল রাতে তো শুধু অন্ধকারের মধ্যে এসেছ, আজ দিনের আলোয় পুরোটা ভালো করে দেখে নাও। এই পুরো সাম্রাজ্য আজ থেকে তোমার!"
ইতি আলতাফ সাহেবের হাতের আঙুলের ওপর নিজের হাত রেখে মুচকি হেসে বলল, "খুব সুন্দর, স্যার! এত বড় বাড়ি আমি জীবনে কখনো টিভিতেও দেখিনি।আপনার কি এখনো ঠিকমতো ঘুম ভাঙেনি নাকি?!"
আলতাফ সাহেব একটু হেসে ইতির চিবুকটা ধরে নিজের দিকে ফিরিয়ে বললেন, "ঘুম আমার অনেক আগেই ভেঙে গেছে, ইতি। তবে তোমাকে বউয়ের সাজে দেখার যে নেশা আমার মাথায় চেপে বসেছে, তাতে আমার চোখের পাতা আর এক ফোঁটাও এক হচ্ছে না। এখন আর সময় নষ্ট করার সময় নেই।"
-----
আলতাফ সিরাজ চৌধুরী ইতির কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর চোখের ভেতর তখন এক ধরনের তাড়া ও উদ্দাম উত্তেজনা কাজ করছে।
তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ইতির হাত দুটো ধরে বললেন, "শোনো, ইতি! আমি বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট করতে চাই না। আজ সকালেই আমাদের কাজী অফিসে যাওয়ার সমস্ত ব্যবস্থা পাকা করা আছে। আমার বিশ্বস্ত লোক সব রেডি করে রেখেছে। তুমি জলদি করে ঘরে যাও, গিয়ে ওই সাধারণ শাড়ি পাল্টে ফেলো। আমার ড্রয়িংরুমের ভেতরের আলমারিতে দেখবে, আমি তোমার জন্য অনেক দামি দামি বেনারসি শাড়ি, সোনার গহনা আর পারফিউম এনে রেখেছি। তুমি জলদি করে বউয়ের সাজে একেবারে রানি হয়ে সেজে প্রস্তুত হয়ে নাও। আমরা আধা ঘণ্টার মধ্যে বের হব।"
ইতির চোখ দুটো তখন আলমারির ওই দামি শাড়ি আর গহনার কথা শুনে আরও চকচক করে উঠল। সে বুঝল, এই বুড়ো মানুষটি তাকে সত্যিই আস্ত একটা রানি বানিয়ে ছাড়বে।
তার মনের ভেতর তখন এক পৈশাচিক আনন্দ কাজ করছিল। সে আলতাফ সাহেবের আরও একটু কাছে এগিয়ে এল। তারপর একটু দুষ্টুমিভرا হাসি দিয়ে আলতাফ সাহেবের ডান গালের ঠিক মাংসল অংশে নিজের দাঁত দিয়ে একটু জোরে, কিন্তু অত্যন্ত আদরমাখা ও কামোদ্দীপক ভঙ্গিতে একটা ছোট কামড় বসিয়ে দিল!
*পিক!*—আলতাফ সাহেব একটু ব্যথার ভান করে মৃদু একটা শব্দ করে উঠলেন, "উফ! ইতি! এটা কী করলে?"
ইতি খিলখিল করে হেসে আলতাফ সাহেবের সেই কামড় দেওয়া জায়গায় নিজের নরম আঙুল বুলিয়ে দিয়ে অত্যন্ত মিষ্টি ও বাধ্যগত গলায় বলল, "এটা হলো আপনার সেই হুকুমের অগ্রিম সালাম, স্যার! আপনি আমাকে রানি সাজিয়ে কাজী অফিসে নিয়ে যাবেন, আর আপনার সেই হুকুম কি আমি অমান্য করতে পারি? আপনার যেকোনো হুকুম আমার কাছে চিরকাল সর্বেসর্বা ও পালনীয়। আপনি একটু অপেক্ষা করুন, আমি দশ মিনিটের মধ্যে বউয়ের সাজে একেবারে পরিপাটি হয়ে আপনার সামনে এসে দাঁড়াচ্ছি।"
বলেই ইতি আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। সে এক লাফে ড্রেসিংরুমের দিকে ছুটে গেল, আর আলতাফ সাহেব নিজের গালের সেই কামড়ের দাগটায় হাত বুলাতে বুলাতে এক অদ্ভুত মোহাচ্ছন্ন হাসিতে ফেটে পড়লেন।
------
আর অন্যদিকে—গুলশানের এই বিলাসবহুল প্রাসাদের ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা গেল পুরান ঢাকার সেই ছোট্ট, জীর্ণ ফ্ল্যাটে।
রাত তখন পোহাতে পোহাতে সকাল হয়ে গেছে। গতকাল রাত থেকে আবদুল মালেক ডিউটি শেষ করে যখন বাসায় ফিরেছিল, তখন সে দেখল ফ্ল্যাটের দরজা বাইরে থেকে সামান্য ভেজানো, কিন্তু ভেতরে চাবি দিয়ে আটকানো। সে ভেবেছিল ইতি হয়তো ঘুমাচ্ছে কিংবা আশেপাশের কোনো দোকানে গেছে। কিন্তু রাত গড়িয়ে যখন ভোর হয়ে গেল, আর ইতি ঘরে ফিরে এল না—তখন মালেকের বুকের ভেতরকার রক্ত ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো!
সে ঘরের কোণায় কোণায়, রান্নাঘরে, বাথরুমে—সব জায়গায় পাগলের মতো ইতির নাম ধরে ডাকল, কিন্তু কোথাও ইতি নেই। তার জামাকাপড়, শাড়ি—সবকিছু ঠিক আছে, কেবল পরনের ওই হলুদ সুতির শাড়িটা আর গলার লকেটটা ছাড়া আর কোনো জিনিস সে নিয়ে যায়নি।
সকাল হতে না হতেই মালেক তার সিকিউরিটি গার্ডের ইউনিফর্মটা কোনোমতে গায়ে গলিয়ে পাগলের মতো রাস্তায় বেরিয়ে এল। সে পুরান ঢাকার অলিগলি, মুদির দোকান, রিকশার গ্যারেজ, বাসস্ট্যান্ড—সব জায়গায় হালের গরুর মতো ছুটতে লাগল। সে যাকে পেল তাকেই জিজ্ঞেস করতে লাগল, "আপনারা কি ইতিকে দেখেছেন? আমার বউটাকে কোথাও দেখতে পাচ্ছেন?"
লোকে তাকে পাগল ভাবল। কেউ কোনো সঠিক খবর দিতে পারল না।
মালেক তখন আর কোনো উপায় না পেয়ে সোজা দৌড়ে গিয়ে উপস্থিত হলো স্থানীয় লালবাগ থানায়। থানার বড় দারোগার সামনে গিয়ে সে কেঁদে ফেলে হাত জোড় করে বলল, "স্যার! দয়া করে আমার বউটাকে একটু খুঁজে দিন! আমার বউ ইতি—কাল রাত থেকে হঠাৎ করে বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়ে গেছে! সে কোথায় গেল আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না! কেউ কি তাকে অপহরণ করেছে?"
থানার দারোগা তখন টেবিলে পা তুলে একটা চুরুট টানছিলেন। তিনি মালেকের কথা শুনে এক পলক তার দিকে তাকালেন, তারপর অত্যন্ত উদাসীন ও তাচ্ছিল্যের সুরে হাত নেড়ে বললেন, "যাও যাও! এখানে নাটক করতে এসো না। নতুন বউ রাগ করে বাপের বাড়ি গেছে কিংবা কোনো প্রেমিকের সাথে ভেগে গেছে—এতে পুলিশের কী করার আছে? যাও, নিজের কাজে মন দাও!"
মালেক আর্তনাদ করে বলল, "না স্যার! সে বাপের বাড়ি যায়নি! আমি খোঁজ নিয়েছি! আমার বউ এমনি যাওয়ার মেয়ে নয়! দয়া করে একটা জিডি বা কমপ্লেন নিন!"
দারোগা তখন একটু রেগে গিয়ে টেবিল চাপড়ে বললেন, "বলছি তো কমপ্লেন নেওয়া যাবে না! যাও এখান থেকে মাথা খারাপ কোরো না!"
মালেক জানত না যে এই পুলিশ অফিসারদের মুখ আগেই আলতাফ সিরাজ চৌধুরী মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে বন্ধ করে রেখেছেন। ওপর মহলের হুকুম ছিল—সিকিউরিটি গার্ড মালেকের বউ সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ থানায় এলেও যেন তা গায়ে হাওয়া দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয়। পুলিশ যে তাকে পাত্তাই দেবে না, তা মালেক কল্পনাও করতে পারেনি। সে থানা থেকে বের হয়ে এল সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া অবস্থায়। তার মাথা কাজ করছিল না, সে আস্ত একটা দিশেহারা মানুষে পরিণত হয়েছিল।
-----
রাস্তার ধুলোবালিতে দাঁড়িয়ে মালেক যখন বুঝতে পারল যে পুলিশও তাকে সাহায্য করবে না, তখন তার চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এল। সে কাঁদতে কাঁদতে রাস্তার পাশে একটা ইটের ওপর বসে পড়ল।
তার মনের মধ্যে বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিল গত কয়েক দিনের ঘটনাগুলো—গাড়ির মোড়ে চেয়ারম্যান সাহেবের সাথে ইতির সেই অন্তরঙ্গ দৃশ্য, রান্নাঘরে ওষুধের শিশি না খোলার রহস্য, আর বারবার চেয়ারম্যান সাহেবের সেই তাকে আটকে রাখার অদ্ভুত চেষ্টা ও বেশি বেতন দেওয়ার লোভ।
মালেকের সরল ও অন্ধ বিশ্বাসের ভেতরে হঠাৎ করেই একটা বিদ্যুৎ চমকে উঠল। সে মনে মনে ভাবল—*‘সবকিছুর পেছনে কি তবে... ওই চেয়ারম্যান সাহেবের হাত আছে? ইতি কি তবে চেয়ারম্যান সাহেবের সাথেই...?’*
এই ভংকর চিন্তাটা মাথায় আসতেই মালেকের শরীর কেঁপে উঠল। সে প্রথমে এই কথা বিশ্বাস করতে চায়নি, কারণ সে তো আলতাফ সাহেবকে দেবতার মতো ভক্তি করত। কিন্তু এখন আর কোনো পথ খোলা নেই। তার বউ নিখোঁজ, পুলিশ সাহায্য করছে না, আর একমাত্র ওই কোম্পানির চেয়ারম্যান সাহেবই হলেন সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি যিনি চাইলে সব খবর রাখতে পারেন।
মালেক তখন একটা চূড়ান্ত ও মরিয়া সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। সে আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে সোজা রিকশা ধরে সরাসরি মতিঝিলের ‘সিরাজ এন্টারপ্রাইজ’ ভবনের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। সে ঠিক করেছে, সে সোজা গিয়ে চেয়ারম্যান সাহেবের পায়ে ধরে সাহায্য চাইবে—সে জানবে যে চেয়ারম্যান সাহেব এত বড় একজন মানুষ, তিনি নিশ্চয়ই তার এই গরিব কর্মচারীর বউকে খুঁজে বের করার জন্য পুলিশ বা প্রশাসনকে লাগিয়ে দেবেন!
মালেক তো ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেনি যে সে যার কাছে সাহায্য চাইতে যাচ্ছে, সেই মানুষটিই তার সর্বনাশের মূল হোতা এবং সে এই মুহূর্তে গুলশানের সেই আলিশান প্রাসাদে ইতিকে চিরকালের মতো নিজের করে নেওয়ার শেষ প্রস্তুতি নিচ্ছে।
মতিঝিলের গেইটের দিকে দ্রুত পায়ে হেঁটে চলা মালেকের সেই অন্ধ বিশ্বাসের অবসান ঘটার সময় তখন ঘনিয়ে আসছিল, আর পুরান ঢাকার সেই ছোট্ট ফ্ল্যাটের শূন্যতা তখন এক মহা প্রলয়ের অপেক্ষা করছিল। (চলবে}