ইসস! কী নির্লজ্জতা! - অধ্যায় ৮
লোপা তার চতুর চোখের দৃষ্টি পালোয়ানদের বলিষ্ঠ ও ঘর্মাক্ত অবয়বের ওপর বুলিয়ে নিল। তার কণ্ঠস্বরে গ্রামীণ এক মায়াবী সুর ফুটিয়ে সে অত্যন্ত ধীর লয়ে বলে উঠল, "তোমাদের যদি কোনো আপত্তি না থাকে, তবে আমরা দুজনেই এই বিপদে একটু সাহায্য করতে পারি!"কথাটা শোনার পর তানিমাও নিজের ঠোঁট কামড়ে এক অদ্ভুত, লজ্জিত অথচ রহস্যময় হাসি হাসল। পালোয়ানরা অত্যন্ত সাধারণ ও সরল মনের মানুষ হওয়ায় তাদের এই কথার পেছনের আসল গভীরতা বা দ্ব্যর্থবোধক ইঙ্গিতটি ধরতে পারল না।
তারা অত্যন্ত বিভ্রান্ত হয়ে একে অপরের মুখের দিকে চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল, যেন বুঝতে পারছিল না এই দুই সম্ভ্রান্ত ঘরের মা কীভাবে তাদের আখড়ার দুধের অভাব মেটাতে সাহায্য করতে পারেন।এদিকে, কোলের অবুঝ শিশু দুটি তখনো মায়ের বুকের ওমে নিশ্চিন্তে আশ্রয়ের খোঁজে হাতড়াচ্ছিল, কিন্তু তানিমা আর লোপার মনে তখন এক অন্যরকম ক্ষমতার খেলা ও আধিপত্যের নেশা চেপে বসেছে। তারা তাদের মাতৃত্বের এই চিরন্তন রূপটিকে এক অদৃশ্য অস্ত্রে পরিণত করে এই বলবান পুরুষদের মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণে আনার এক চূড়ান্ত চাল চালছিল। পার্কের বাতাস তখন এক তীব্র, অবাধ্য এবং সম্মোহনী নীরবতায় থমকে দাঁড়িয়েছে।
লোপা যখন বলল—"দুধ নিয়ে চিন্তা করিস না"—তখনই যেন বোমাটা ফাটল; আর তানিমা তার সেই প্রিয় বান্ধবীর দিকে চোখ তুলে তাকাল।
সেই মুহূর্তের পরিস্থিতিটি ছিল যেমন অদ্ভুত, তেমনই এক বুক-ফাটা হাহাকারে ভরা। দুই জনমদাত্রী মা তীব্র এক ব্যাকুলতা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন—যাদের ক্ষুধার্ত শিশুরা এক ফোঁটা স্নেহের আশায় অধীর হয়ে ছটফট করছিল। কিন্তু এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, তাদের সেই দুগ্ধভারাক্রান্ত স্তনযুগল তখন সন্তানের ক্ষুধা মেটানোর স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে, সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো এক জরুরি প্রয়োজনে স্পন্দিত হয়ে উঠছিল।
.................
এদিকে, রেখার রান্নাঘরের সেই উত্তপ্ত ও দমবন্ধ করা আবহাওয়া এতক্ষণে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নিয়েছে। কড়াইয়ের সুজির হালুয়াটা সম্পূর্ণ পুড়ে তলায় লেগে কালচে হয়ে গেছে। পোড়া ঘি আর চিনির এক তীব্র, ঝাঁঝালো কটু গন্ধ পুরো রান্নাঘরের বাতাসকে ভারী করে তুলেছে, রেখা যখন নিজের সেই আদিম আধিপত্যের অদ্ভুত ঘোর থেকে বাস্তবে ফিরে এল, তখন তার নিজেরও কেমন এক অস্বস্তি হচ্ছিল।
সে বিরক্ত হয়ে হালুয়ার হাতলটা ধরে কড়াইটা উনুন থেকে নামাল। তার মনে হচ্ছিল, এই পোড়া ছাইয়ের মতো জিনিসটা ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলে দিলেই হয়তো নিজের মনের ভেতরের এই অবাধ্য অন্ধকার চিন্তাগুলোকেও সে ঝেড়ে ফেলতে পারবে।কিন্তু সে কড়াইটা তোলার আগেই, রান্নাঘরের দরজায় এক চতুর পদধ্বনি শোনা গেল। রেখা ঝট করে ঘুরে তাকাতেই দেখল—তার পুত্রবধূ অপর্ণা দরজার ফ্রেম হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।অপর্ণার ঠোঁটের কোণে সেই চেনা, উদ্ধত এবং এক বাঁকা বিজয়ী হাসি ।
সে নাকের কাছে আঁচল ঠেকিয়ে পোড়া গন্ধের তীব্রতাটা অনুভব করল। তারপর সোজা কড়াইয়ের ভেতরের সেই কালচে পোড়া হালুয়ার দিকে তাকিয়ে এক নাটকীয় সুরে বলে উঠল, "ইশ... তোমার মনটা ঠিক কোথায় ছিল মা? তোমার সোনার ছেলে বাড়ি ফিরলে এই পোড়া জিনিস দেখে কী বলবে বল তো?"
অপর্ণার এই ধারালো কণ্ঠস্বর রেখার কানে পৌঁছানো মাত্রই তার একটু আগের সেই আদিবাসী রানির মতো অহংকার আবার এক ধাক্কায় ধুলোয় মিশে গেল। অপর্ণার চোখের সেই চতুর চাউনি যেন রেখাকে মনে করিয়ে দিচ্ছিল যে, এই ঘরের আসল নিয়ন্ত্রণ কার হাতে। নিজের ছেলের অকেজো পৌরুষের কথা তুলে যে পুত্রবধূ এই সংসারকে নিজের হাতের পুতুল বানিয়ে রেখেছে, তার এই আচমকা প্রশ্ন রেখার মনের ভেতরের সেই নিষিদ্ধ ক্ষোভ আর ক্ষমতার খেলাকে আবার নতুন করে উস্কে দিল!
"আমার মনে হয় মা, তোমার এই পোড়া খাবারটা একদমই ফেলে দেওয়া উচিত না!" অপর্ণা মুচকি হাসল, যা অপরাধবোধে ভোগা রেখাকে আরও বিভ্রান্ত করে তুলল, কারণ তার বুকটা অনবরত ওঠানামা করছিল আর ঠিক তখনই...
ডিং ডং!
ঘণ্টাটা বেজে উঠল।