ছায়ার আড়ালে আগুন-Erotic Thriller [Part-4: অন্তিম যুদ্ধ] - অধ্যায় ৮২
গল্প: "ছায়ার আড়ালে আগুন" (পার্ট-৪: অন্তিম যুদ্ধ)
দ্বাশীতি পরিচ্ছেদ: খবর
মিতালি সেন রাতে বাড়ি ফেরেননি।
প্রথমে কেউ খুব একটা চিন্তা করেননি। তিনি প্রায়ই দেরিতে ফিরতেন—পার্টির মিটিং, ওমেনস ক্লাব, কোনো জরুরি কাজ। রাত নয়টা পেরিয়ে গেলেও অংশুমান একবার ফোন করলেন। রিং হলো, কেউ ধরল না। তিনি ভাবলেন হয়তো ব্যস্ত। দশটায় আবার কল করলেন। আবার রিং, কেউ ধরছে না।
অজয়প্রসাদ সেন ড্রয়িং রুমের চেয়ারে বসে ছিলেন। টেলিভিশন চালু, কিন্তু তিনি তাকিয়ে নেই। খবরের কাগজ খোলা পড়ে আছে। অন্তরা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে হলের দরজার কাছে দাঁড়ালেন। তিনি একবার অংশুমানের দিকে তাকালেন, কিছু বললেন না।
রাত এগারোটা বাজল। অংশুমান আবার কল করলেন। এবার টানা কয়েকবার। প্রতিবারই মোবাইল রিং হয়, কিন্তু কেউ ধরে না। তিনি ফোনটা নামিয়ে রেখে উঠে হাঁটতে শুরু করলেন। ঘরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।
“কোনো খবর নেই?” অজয়প্রসাদ জিজ্ঞেস করলেন। গলা শুকনো।
“না,” অংশুমান বললেন। “ফোন ধরছে না।”
অন্তরা চুপচাপ চা এনে দিলেন। তিন কাপ। কেউ ছুঁলেন না। চা ঠান্ডা হয়ে গেল। রাত বাড়তে থাকল। অংশুমান বারবার কল করতে লাগলেন। বিশবার, পঁচিশবার। প্রতিবার একই আওয়াজ—রিং… রিং… তারপর কেউ নেই। একসময় ফোনটা বন্ধ হয়ে গেল। হয়তো ব্যাটারি শেষ। অথবা অন্য কিছু। কেউ জানে না।
অজয়প্রসাদ উঠে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। বাইরে অন্ধকার। তিনি কিছু বললেন না। শুধু দাঁড়িয়ে রইলেন। অন্তরা হলের এক কোণে চেয়ারে বসে রইলেন। কেউ বিছানায় যাননি। রাতভর তিনজনে জেগে রইলেন। শুধু অপেক্ষা আর নীরবতা।
সকাল হলো। আলোর রেখা জানালা দিয়ে ঢুকল।
টেলিভিশনে ব্রেকিং নিউজ এল। অ্যাঙ্করের গলায় জরুরি সুর।
“শহরের এক প্রান্তে, নদীর ধারে একটি কালো রঙের ল্যান্ড রোভার গাড়ির ভেতর থেকে এক পুরুষ ও এক মহিলার নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। দেহ দুটি নগ্ন অবস্থায় এবং আপত্তিকর অবস্থানে পাওয়া গেছে। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে। পরিচয় এখনো নিশ্চিত হয়নি। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গাড়িটি গতকাল সন্ধ্যা থেকেই সেখানে পার্ক করা ছিল…”
অংশুমান টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। স্ক্রিনে গাড়ির ছবি। কালো ল্যান্ড রোভার ডিফেন্ডার। তারপর কাটা-ছেঁড়া কিছু ফুটেজ—গাড়ির ভেতরের অবস্থা, পুলিশের কর্ডন, হলুদ টেপ। হঠাৎ একটা ক্লোজ-আপ। মহিলার মুখের অংশবিশেষ। চুলের আদল, কপাল, ঠোঁটের রেখা। যদিও মুখটা আংশিক ঢাকা, তবু চেনা যায়।
অংশুমানের শরীর যেন অবশ হয়ে গেল। তিনি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। চোখ স্ক্রিনে আটকে রইল। হাত কেঁপে উঠল।
সেটা তার মা। মিতালি সেন।
“মা…” কথাটা তার মুখ থেকে ক্ষীণভাবে বেরোল। প্রায় শোনা যায় না।
অজয়প্রসাদও ততক্ষণে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েছেন। তিনি বুঝতে পারলেন। তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তিনি চেয়ারে বসে পড়লেন। দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে কাঁদতে শুরু করলেন। কাঁদার শব্দ ঘরের ভেতর ভরে উঠল। কাঁধ কেঁপে উঠছে। তিনি কথা বলতে পারছেন না। শুধু কাঁদছেন।
অন্তরা দরজার কাছে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি কিছু বলতে পারলেন না। শুধু হাত মুঠো করে রাখলেন। চোখে জল এসে গেল, কিন্তু তিনি মুছে ফেললেন না। তিনি অংশুমানের দিকে তাকালেন। অংশুমান তখনো স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে। মুখ পাথরের মতো।
অংশুমান আর এক সেকেন্ড দাঁড়ালেন না। তিনি টেবিল থেকে চাবি তুলে নিলেন। জিপের চাবি। কোনো কথা না বলে তিনি বেরিয়ে গেলেন। দরজা জোরে বন্ধ হয়ে গেল। শব্দটা ঘরের ভেতর প্রতিধ্বনিত হল।
বাইরে সকালের আলো। অংশুমান জিপে উঠে ইঞ্জিন স্টার্ট দিলেন। চোখে জল নেই, শুধু একটা শূন্যতা। তিনি গাড়ি ছুটিয়ে দিলেন ঘটনাস্থলের দিকে। রাস্তায় গাড়ির হর্ন, লোকজনের কোলাহল—কিছুই তার কানে ঢুকছে না। শুধু মায়ের মুখটা চোখের সামনে ভাসছে।
পিছনে বাড়িতে অজয়প্রসাদ কাঁদছেন। অন্তরা দাঁড়িয়ে। টেলিভিশনে এখনো সেই খবর ঘুরছে—কালো ল্যান্ড রোভার, নগ্ন দুই দেহ, আপত্তিকর অবস্থা, পুলিশের তদন্ত শুরু।
অংশুমান রাস্তা ধরে এগিয়ে চললেন। তিনি জানেন, এবার সবকিছু বদলে যাবে।