ছায়ার আড়ালে আগুন-Erotic Thriller [Part-4: অন্তিম যুদ্ধ] - অধ্যায় ৭৭
গল্প: "ছায়ার আড়ালে আগুন" (পার্ট-৪: অন্তিম যুদ্ধ)
সপ্তসপ্ততিতম পরিচ্ছেদ: রুবিনা মৃত্যুর তদন্ত রহস্য
রুবিনা বেগমের দুর্ঘটনার ফাইলটা অংশুমানের টেবিলে কয়েকদিন ধরে পড়েছিল। প্রথমে তিনিও ভেবেছিলেন এটা সাধারণ অ্যাক্সিডেন্ট। রাস্তা ভিজে ছিল, গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে, চাকা খুলে গেছে। পুলিশের প্রাথমিক রিপোর্টেও তাই লেখা। কিন্তু যতবার তিনি ফাইলটা খুলেছেন, ততবার মনে হয়েছে— কিছু একটা মিলছে না। রুবিনার ড্রাইভার সাবধানে গাড়ি চালাত। আর চাকা এভাবে হঠাৎ খুলে যাওয়া সহজ কথা নয়।
সেদিন বিকেলে তিনি আবার ফাইল খুললেন। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট, গাড়ির ক্ষতির ছবি, চাকার অবস্থা। চাকাটা পুরোপুরি খুলে গিয়েছিল। নাট-বোল্ট উধাও। কয়েকটা নাট ভাঙা অবস্থায় রাস্তায় পড়েছিল। সাধারণ দুর্ঘটনায় এমনটা হয় না। তিনি মেকানিকদের ডেকে পাঠালেন। যারা গাড়িটা মেরামতের জন্য দেখেছিল, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করলেন।
একজন পুরনো মেকানিক লম্বা সময় চাকার ছবি দেখল। তারপর মাথা নাড়ল। “স্যার, চাকা এভাবে হঠাৎ খুলে যায় না। নাট যদি ঠিকমতো মোচড়ানো না থাকে, তাহলে চলতে চলতে আলগা হয়ে যেতে পারে। কিন্তু এতগুলো নাট একসঙ্গে উধাও হওয়া… এটা স্বাভাবিক নয়। কেউ যদি ইচ্ছা করে নাটগুলো আলগা করে রাখে, তাহলে কিছুক্ষণ চলার পর চাকা খুলে যেতে পারে। আর সেটাই এখানে হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।”
অংশুমান সেই কথাটা মাথায় নিয়ে গাড়ির সার্ভিসিং রেকর্ড খুঁজতে বসলেন। রুবিনার গাড়ির সার্ভিস বুক উদ্ধার করা হল। নিয়মিত সার্ভিসিং হত শহরের একটা পরিচিত ওয়ার্কশপে। প্রতিটা এন্ট্রি পরিষ্কার। কিন্তু দুর্ঘটনার ঠিক পাঁচ দিন আগের একটা এন্ট্রি তাকে থমকে দিল। সেখানে লেখা— গাড়িটা অন্য একটা গ্যারেজে সার্ভিসিং হয়েছে। নামটা অপরিচিত। ঠিকানাও পরিষ্কার নয়। শুধু একটা এলাকার নাম আর একটা মোবাইল নম্বর।
তিনি সেই গ্যারেজের খোঁজ করতে লাগলেন। শহরের একপ্রান্তে, পুরনো গুদাম এলাকায় একটা ছোট ওয়ার্কশপ। সাইনবোর্ড মলিন, রং উঠে গেছে। ভেতরে দু-একজন মেকানিক কাজ করছিল। তেল আর মরিচার গন্ধ। অংশুমান নিজে গেলেন। মালিককে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন,
“এই গাড়িটা কি আপনাদের এখানে সার্ভিসিং হয়েছিল? এই নম্বরের গাড়ি।”
মালিক প্রথমে এড়িয়ে যেতে চাইল। চোখ চারদিকে ঘুরছিল। পরে বলল, “হ্যাঁ স্যার, হয়েছিল। একজন লোক এনেছিল। বলল মেমসাহেবের গাড়ি। চাকা চেক করতে বলেছিল। আমরা চেক করেছি। নাট-বোল্ট টাইট করে দিয়েছি। আর কোনো সমস্যা ছিল না।”
“কে এনেছিল গাড়ি?” অংশুমান জিজ্ঞেস করলেন। “নাম, চেহারা, কিছু মনে আছে?”
মালিক মাথা চুলকোল। “নাম মনে নেই স্যার। চেহারাও ভালো করে মনে নেই। একটা সাধারণ লোক। টাকা দিয়ে গাড়ি নিয়ে গেছে। আর কোনো কথা হয়নি। আমরা তো প্রতিদিন অনেক গাড়ি দেখি।”
অংশুমান গ্যারেজের রেজিস্টার চাইলেন। রেজিস্টারে শুধু গাড়ির নম্বর আর একটা মোবাইল নম্বর লেখা। নম্বরটা এখন বন্ধ। কোনো নাম নেই। কোনো ঠিকানা নেই। কোনো সিসিটিভি নেই। কোনো রসিদের কপি নেই। মেকানিকরাও কিছু বলতে পারল না। তারা শুধু জানে— গাড়ি এসেছিল, চাকা চেক করা হয়েছিল, টাকা নিয়ে গাড়ি চলে গেছে।
ফিরে এসে অংশুমান ফাইলটা আবার খুললেন। চাকার ছবিগুলো দেখতে লাগলেন। নাটগুলো যেন ইচ্ছা করেই খুলে রাখা হয়েছে। তিনি নিশ্চিত হলেন— এটা নিছক দুর্ঘটনা নয়। এটা পরিকল্পিত। কেউ ইচ্ছা করে চাকা আলগা করে দিয়েছে। রুবিনাকে মারার জন্য। গ্যারেজে সার্ভিসিংয়ের নাম করে কেউ নাটগুলো আলগা করে রেখেছিল। তারপর রুবিনা যখন গাড়ি চালিয়েছে, চাকা খুলে গেছে।
কিন্তু কে?
গ্যারেজের লোকজন কিছু জানে না। যে গাড়ি এনেছিল, তার কোনো হদিস নেই। মোবাইল নম্বর বন্ধ। কোনো সাক্ষী নেই। কোনো প্রমাণ নেই যে কে এই কাজটা করিয়েছে। কে নির্দেশ দিয়েছিল, কে গাড়ি নিয়ে গিয়েছিল, কে টাকা দিয়েছিল— কিছুই জানা যাচ্ছে না।
অংশুমান চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন। জানালার বাইরে সন্ধ্যার আলো মিলিয়ে আসছিল। তিনি বুঝতে পারছিলেন— রুবিনার মৃত্যু হত্যাকাণ্ড। কেউ খুব সাবধানে পরিকল্পনা করেছে। কিন্তু হত্যাকারীর মুখ এখনো অন্ধকারে। তদন্ত যত এগোচ্ছে, রহস্য তত ঘন হচ্ছে।
প্রমাণের অভাবে তিনি আর এগোতে পারছিলেন না। শুধু একটা জিনিস নিশ্চিত— এটা দুর্ঘটনা নয়। এটা খুন। আর সেই খুনি এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।