ছায়ার আড়ালে আগুন-Erotic Thriller [Part-4: অন্তিম যুদ্ধ] - অধ্যায় ৫২
গল্প: "ছায়ার আড়ালে আগুন" (পার্ট-৪: অন্তিম যুদ্ধ)
দ্বিপঞ্চাশ পরিচ্ছেদ: মিতালি-ক্ষমতার নতুন হিসাব
রুবিনা বেগমের মৃত্যুর খবর পার্টির ভেতরে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। আবগারী দফতরের মন্ত্রী হয়ে তিনি মাত্র কয়েক মাস আগেই দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তার হঠাৎ চলে যাওয়ায় দলের ভেতরে একটা বড় ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়েছিল। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে শুরু করে জেলা পর্যায়ের কর্মীরা পর্যন্ত সবাই ফিসফিস করছিল— এখন কে এই জায়গা নেবে? রুবিনার সমর্থকরা হতভম্ব। বিরোধীরা সুযোগ খুঁজছিল। আর যারা ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকতে চায়, তারা ইতিমধ্যে হিসাব কষতে শুরু করেছিল।
মিতালি সেন সেই ফাঁকা জায়গাটা সবচেয়ে ভালো করে দেখতে পাচ্ছিলেন।
রুবিনার মৃত্যুর তিন দিন পর মিতালি তার এনজিও অফিসের বড় হলঘরে একটি জরুরি বৈঠক ডেকেছিলেন। পার্টির মহিলা উইং-এর প্রায় সকল গুরুত্বপূর্ণ নেত্রী উপস্থিত ছিলেন। কেউ কেউ শোকের অভিনয় করছিল, কেউবা চুপচাপ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিল। মিতালি মাঝখানের চেয়ারে বসেছিলেন। পরনে গাঢ় বেগুনি রঙের সিল্কের শাড়ি, চুল স্টেপ কাট করা ও আঁচড়ানো, ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপস্টিক, আঙুলে লাল নেলপলিশ। পায়ে কালো হাইহিল। তার ধবধবে ফর্সা মুখে কোনো শোকের ছাপ ছিল না। শুধু একটা শান্ত, হিসেবি হাসি যেন বলছিল— সবকিছু তার নিয়ন্ত্রণে।
“রুবিনা বেগম চলে গেছেন,” মিতালি আস্তে করে, পরিষ্কার গলায় বললেন। “এটা দুঃখের বিষয়। উনি দলের জন্য অনেক কাজ করেছেন। কিন্তু দল থেমে থাকতে পারে না। আবগারী দফতর আর মহিলা উইং— দুটো জায়গাতেই এখন শক্ত ও অভিজ্ঞ নেতৃত্ব দরকার। শূন্যতা বেশিদিন রাখা যায় না।”
সবাই চুপচাপ শুনছিল। মিতালি একটা একটা করে চোখ বুলিয়ে নিলেন। কারো মুখে আপত্তির ছাপ দেখতে পেলেন না। তিনি আবার বললেন,
“আমি পার্টি সভাপতি সোমদেববাবুর সাথে ইতিমধ্যে কথা বলেছি। তিনি রাজি। মহিলা উইং-এর পুরো দায়িত্ব আপাতত আমার হাতেই থাকবে। আগামীকাল অফিসিয়াল ঘোষণা হয়ে যাবে। আর আবগারী দফতরের বিষয়েও আমি নজর রাখব। প্রয়োজনে আমি নিজেই সেখানে হস্তক্ষেপ করব।”
একজন মধ্যবয়সী নেত্রী সাহস করে বললেন, “মিতালিদি, রুবিনা বেগমের সমর্থকরা তো এখনো আছে। তারা কি রাজি হবে?”
মিতালি হেসে উঠলেন। হাসিটা মিষ্টি, কিন্তু চোখে ঠান্ডা।
“সমর্থক থাকবেই। কিন্তু সমর্থকদেরও নেতা দরকার। আমি তাদের জায়গা করে দেব। কেউ যদি বাধা দিতে চায়, তাকে আলাদা করে দেখা হবে। দলে এখন ঐক্য দরকার, বিভেদ নয়।”
বৈঠক শেষে অধিকাংশ নেত্রী মিতালির সাথে একমত হয়েই বেরিয়ে গেলেন। কেউ কেউ তার হাত জড়িয়ে ধরে সমর্থন জানালেন। মিতালি প্রত্যেককে মৃদু হাসি দিয়ে বিদায় করলেন। ভেতরে ভেতরে তিনি জানতেন— এরা কেউই তাকে পছন্দ করে না। কিন্তু ভয় পায়। আর ভয়ই এখন তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
বৈঠক শেষে মিতালি একা অফিস চেম্বারে গেলেন। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে শহরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। নিচের রাস্তায় গাড়ির ভিড়, মানুষের চলাচল। মনে মনে হিসেব করছিলেন। রুবিনা বেগম তার পথে একটা বড় বাধা ছিল। মন্ত্রী হয়ে তিনি অনেকগুলো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যা মিতালির এনজিও ও পার্টির অভ্যন্তরীণ হিসাব নষ্ট করেছিল। এখন সেই বাধা নেই। অংশুমান অবশ্য এখনো আছে। ছেলেকে তিনি ভালোবাসেন, কিন্তু নিয়ন্ত্রণে রাখতেও জানেন। রুবিনার সাথে ছেলের সম্পর্কের কথা তার কানে এসেছিল। তিনি সেটা চেপে গিয়েছিলেন। এখন আর সেই সম্পর্কের প্রয়োজন নেই।
টেবিলের ফোনটা বেজে উঠল। সোমদেব চ্যাটার্জির নম্বর। মিতালি ধরলেন। গলায় নরম, কিন্তু আত্মবিশ্বাসী সুর।
“হ্যালো সোমদেববাবু।”
অপর প্রান্ত থেকে সোমদেবের গলা এল, “মিতালি, তুমি যা চেয়েছিলে তাই হচ্ছে। মহিলা উইং-এর অফিসিয়াল ঘোষণা আগামীকালই হয়ে যাবে। তোমার নামই থাকবে। কিন্তু একটা কথা… অংশুমানকে একটু সামলে রেখো। ওর নাম এখন খুব বেশি উঠছে। কিছু লোক ওকে নিয়ে কথা বলছে।”
মিতালি হেসে বললেন, “আপনি চিন্তা করবেন না। ছেলেকে আমি বুঝি। ও আমার কথা শুনবে। আর যদি না শোনে, আমি শেখাব।”
সোমদেব একটু চুপ থেকে বললেন, “তুমি খুব দ্রুত এগোচ্ছ মিতালি। সাবধানে। অনেকের চোখ এখন তোমার উপর।”
“আমি জানি,” মিতালি শান্ত গলায় উত্তর দিলেন। “তাইতো আরও দ্রুত এগোতে হবে।”
ফোন কেটে মিতালি চেয়ারে বসলেন। টেবিলের উপর আঙুল দিয়ে আলতো টোকা দিচ্ছিলেন। তার চোখে একটা ঠান্ডা জয়ের আভা। রুবিনার মৃত্যু তার জন্য শুধু একটা দুর্ঘটনা নয়— একটা সুযোগ। আর তিনি সেই সুযোগ দুই হাতে ধরে ফেলেছেন। মহিলা উইং তার হাতে, আবগারী দফতরের উপর নজরদারি তার হাতে, সোমদেববাবুর সমর্থন তার হাতে। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।
দলের ভেতরে এখন নতুন হিসাব শুরু হয়েছে। মিতালি সেন আর শুধু এনজিও-র প্রেসিডেন্ট বা মহিলা নেত্রী নন। তিনি ধীরে ধীরে পার্টির অন্যতম কেন্দ্রীয় মুখ হয়ে উঠছেন। তার প্রতিটি পদক্ষেপে আছে হিসেব, প্রতিটি হাসি আছে পরিকল্পনা।
আর এই উত্থানের পেছনে রুবিনার মৃত্যুর ছায়া পড়ে আছে— যে ছায়া কেউ এখনো স্পষ্ট করে দেখতে পাচ্ছে না। মিতালি সেই ছায়াকে কাজে লাগিয়ে নিজের জায়গা আরও মজবুত করে নিচ্ছিলেন।
বিকেলের আলো অফিসের জানালা দিয়ে ঢুকে তার মুখে পড়েছিল। তিনি আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে ফেললেন। হাসিটা আয়নায় প্রতিফলিত হয়ে ফিরে এল— ঠান্ডা, আত্মবিশ্বাসী এবং বিপজ্জনক।