ছায়ার আড়ালে আগুন-Erotic Thriller [Part-4: অন্তিম যুদ্ধ] - অধ্যায় ৪৭
গল্প: "ছায়ার আড়ালে আগুন" (পার্ট-৪: অন্তিম যুদ্ধ)
সপ্তচল্লিশ পরিচ্ছেদ: রোশনীর হতাশা ও ক্ষোভ
রোশনীর ঘরের জানালা দিয়ে সকালের আলো ঢুকছিল, কিন্তু ঘরের ভেতরটা অন্ধকারই লাগছিল। বিছানায় শুয়ে তিনি সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। চোখের পাতা ভারী, গলা শুকনো। গতকাল রাত থেকে চোখ একবারও বন্ধ হয়নি। মায়ের মুখটা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল— কখনো হাসি ভরা, কখনো ক্লান্ত, কখনো কঠোর। আর তার পাশেই ভেসে উঠছিল অংশুমানের মুখ।
রুবিনা আর নেই।
কথাটা এখনো বিশ্বাস হচ্ছিল না। মা তো সবসময়ই ছিলেন। যতই দূরত্ব থাকুক, যতই ঝগড়া হোক, মা ছিলেন একটা নিশ্চয়তা। এখন সেই নিশ্চয়তা ভেঙে গেছে। রোশনী বিছানা থেকে উঠে বসলেন। পা দুটো মেঝেতে ছুঁয়েই থেমে গেল। শরীর যেন ওজনহীন। তিনি উঠে জানালার কাছে গেলেন। বাইরে রাস্তায় লোকজন চলাচল করছে, রিকশার ঘণ্টি বাজছে, কেউ হাসছে। পৃথিবী যেন কিছুই হয়নি বলে চলছে। শুধু তার জগৎটা থেমে গেছে।
নাইসা কাঁদছিল অন্য ঘরে। রোশনী দ্রুত গিয়ে মেয়েকে কোলে তুলে নিলেন। নাইসার ছোট্ট মুখটা তার বুকে চেপে ধরলেন। মেয়ের গরম নিঃশ্বাস তার গলায় লাগছিল। চোখ বন্ধ করে তিনি বললেন,
“মা নেই রে… তোর নানী আর নেই…”
কথাগুলো বলতে গিয়ে গলা কেঁপে উঠল। নাইসা কিছু বুঝতে পারেনি। শুধু মায়ের বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে চুপ করে রইল। রোশনীর চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল জল। তিনি মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন। কান্না থামছিল না। বুকের ভেতরটা যেন কেউ চেপে ধরেছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল।
কিন্তু কান্নার মধ্যে অন্য একটা অনুভূতিও ছিল। ক্ষোভ। গভীর, বিষাক্ত ক্ষোভ।
কয়েকদিন আগেই তিনি জানতে পেরেছিলেন। মায়ের সাথে অংশুমানের সম্পর্কের কথা। প্রথমে বিশ্বাসই হয়নি। একটা গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। তারপর ধীরে ধীরে সত্যিটা সামনে এসেছে। মা— যিনি সবসময় নিজের ইজ্জত নিয়ে এত কথা বলতেন, যিনি মন্ত্রী হয়েও নিজের সীমা বজায় রাখার চেষ্টা করতেন— তিনি কীভাবে একজন পরপুরুষের সাথে জড়িয়ে পড়লেন? আর সেই মানুষটা আবার অংশুমান। যার বয়স মায়ের ছেলের মতো। যাকে রোশনী নিজেও কয়েকবার দেখেছেন, কিন্তু কখনো এমন করে ভাবেননি।
রোশনীর বুকের ভেতরটা জ্বলে উঠছিল। মাকে তিনি পুরোপুরি দোষ দিতে পারছিলেন না। মা হয়তো একা ছিলেন। হয়তো কোনো দুর্বল মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলেন। হয়তো অংশুমান তাকে ভালোবেসে ফাঁদে ফেলেছিল। কিন্তু অংশুমান…
অংশুমানের কথা ভাবলেই রোশনীর মুঠো শক্ত হয়ে যেত। সেই মানুষটা মায়ের কাছাকাছি থেকেছে। মায়ের বিছানায় থেকেছে। মায়ের শরীর স্পর্শ করেছে। আর এখন মা মারা গেছেন। গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট। চাকা খুলে গেছে। এত সহজে? রোশনীর মনে সন্দেহ জন্মাচ্ছিল। অংশুমান কি সত্যিই দায়ী থাকতে পারে? মাকে ব্যবহার করেছে, তারপর যখন প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে, তখন সরিয়ে দিয়েছে— এমনটা কি অসম্ভব?
রাশিদ দরজার বাইরে দাঁড়িয়েছিল। ভাইয়ের চোখেও জল। সে ভেতরে ঢুকে এসে বোনের পাশে বসল। রোশনী নাইসাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে মুখ তুললেন। চোখ লাল, গাল ভেজা। তিনি আস্তে করে বললেন,
রোশনী মনে মনে ভাবলো-“মা এভাবে মারা গেছেন। গাড়ির চাকা খুলে গেছে। এত সহজে হয়? চাকা কি এমনি এমনি খুলে যায়?… হতে পারে এতে অংশুমানের হাত থাকতে পারে।”
“পুলিশ বলছে সাধারন দুর্ঘটনা, তবে পুলিশ যা বলে তাই সত্যি হয় না।” রোশনী উঠে দাঁড়ালেন। তার চোখে এখন শুধু কষ্ট নয়, ক্ষোভও জ্বলছিল। “মাকে সে ব্যবহার করেছে। মায়ের বয়স, মায়ের অবস্থা— সব কাজে লাগিয়েছে। আর এখন মা নেই। আমি চুপ করে বসে থাকব না। আমি জানব সত্যি কী হয়েছিল।”
তিনি জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। বাইরের আলো তার মুখে পড়ছিল। চোখ দুটো লাল, কিন্তু তার ভেতরে একটা শক্ত সংকল্প জন্মাচ্ছিল। মায়ের মৃত্যুর শোক এখনো কাঁচা। চোখের পাতা ফোলা, বুক ভারী। কিন্তু সেই শোকের সাথে মিশে গেছে বিশ্বাসঘাতকতার ক্ষোভ। আর সন্দেহ। একটা বিষাক্ত সন্দেহ যেটা ধীরে ধীরে তার রক্তে মিশে যাচ্ছিল।
অংশুমানের নামটা মনে আসলেই রোশনীর দাঁত কচলাত। তিনি জানতেন না সত্যি কী হয়েছে। কোনো প্রমাণ নেই। শুধু একটা অনুভূতি। একটা গভীর অস্বস্তি। মায়ের মৃত্যুর পেছনে সেই মানুষটার ছায়া আছে— এই বিশ্বাসটা তার মনে জাঁকিয়ে বসছিল।
নাইসা আবার কাঁদতে শুরু করল। রোশনী মেয়েকে কোলে নিয়ে বারান্দায় এলেন। সকালের রোদ তার মুখে পড়ছিল। তিনি মেয়ের মাথায় চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বললেন,
“তোর নানী চলে গেছে রে… কিন্তু আমি আছি। আর আমি জানব… সত্যি কী হয়েছিল। কেউ যদি মায়ের ক্ষতি করে থাকে, আমি চুপ করে থাকব না।”
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে তার চোখ আবার ভরে এল। তিনি মেয়েকে বুকে চেপে ধরে চোখ বন্ধ করলেন। দূরে মসজিদের আজান ভেসে আসছিল। রোশনীর মনে হচ্ছিল, মায়ের আত্মা হয়তো কোথাও কাছেই আছে। কিন্তু ছুঁয়ে দেখার কোনো উপায় নেই। শুধু কষ্ট। আর ক্ষোভ। গভীর, নিঃশব্দ ক্ষোভ যেটা এখন তার ভেতরটাকে দখল করে নিচ্ছে।
তিনি জানতেন, এই ক্ষোভ সহজে যাবে না। আর অংশুমানের মুখটা যতবার মনে পড়বে, ততবার এই ক্ষোভ আরও তীব্র হবে।