ছায়ার আড়ালে আগুন-Erotic Thriller [Part-4: অন্তিম যুদ্ধ] - অধ্যায় ৩২
গল্প: "ছায়ার আড়ালে আগুন" (পার্ট-৪: অন্তিম যুদ্ধ)
একত্রিশ পরিচ্ছেদ: মালতির দুর্দশা
স্বাধীনতা দিবসের দানের কাজ প্রায় শেষের দিকে। মাঠটা এখন অনেকটাই ফাঁকা হয়ে এসেছে। শুধু কয়েকজন মহিলা আর বাচ্চা দাঁড়িয়ে আছে শেষের কাপড়-চোপড় নিতে। রানি একটা শাড়ি ভাঁজ করে রাখছিল, এমন সময় তার চোখ পড়ল মাঠের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা এক মহিলার দিকে।
মহিলাটির বয়স ত্রিশের কোঠায়। সরু চেহারা, চোখ দুটো ক্লান্ত। তার গালের এক কোণে কালচে-নীলচে একটা দাগ স্পষ্ট। রানি প্রথমে ভাবল হয়তো কোনো দুর্ঘটনা। কিন্তু দাগটা দেখে তার মনে হল এটা সাধারণ আঘাত নয়। এটা মারধরের দাগ।
রানি ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে গেল। মহিলাটি নাম মালতি। সে রানির দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে নমস্কার করল। রানি তার গালের দাগটা ভালো করে দেখল। তারপর নরম গলায় জিজ্ঞেস করল, “এটা কী হয়েছে মালতি?”
মালতি প্রথমে চুপ করে রইল। চোখ দুটো লাল হয়ে আসছিল। রানি তার কাঁধে হাত রাখল। “বলো।”
মালতি আর থাকতে পারল না। তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। সে কাঁপা গলায় বলল, “আমার স্বামী… সে মদ খেতে চেয়েছিল। টাকা চেয়েছিল। কিন্তু আমার কাছে শুধু ছেলেকে ভালো করে খাওয়ানোর টাকাটুকুই ছিল। আমি দিতে পারিনি। বলেছি, আজ না, কাল দিচ্ছি। সে রেগে গিয়ে… আমাকে মেরেছে।”
রানি চুপ করে শুনছিল। তার বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে উঠছিল। মালতি কথা বলতে বলতে আরও কেঁদে ফেলল। “আমার ছেলেটা কলেজে যায়। তার জন্য একটু ভালো খাবার কিনতে চেয়েছিলাম। কিন্তু স্বামী বলছে, তার মদের টাকা আগে দিতে হবে। আমি দিতে পারিনি… তাই এই অবস্থা।”
রানি মালতির চোখের জল মুছিয়ে দিল। তার হাতটা ধরে রাখল। “তুমি কাঁদো না।” তার গলায় গভীর আফসোস ছিল। “এভাবে তোমাকে মারবে, এটা ঠিক না।”
মালতি মাথা নিচু করে রইল। রানি তার হাতব্যাগ থেকে একটা খাম বের করল। ভেতর থেকে পাঁচ হাজার টাকা বের করে মালতির হাতে তুলে দিল। “এটা নাও। তোমার আর তোমার ছেলের জন্য জামাকাপড় কিনবে।”
মালতি অবাক হয়ে তাকাল। “এত টাকা… আমি কীভাবে…”
রানি তার হাত চেপে ধরল। “নাও। আর একটা কথা বলছি। তোমার ছেলেকে ভালো করে পড়াও। তার পড়াশোনার খরচ আমি বহন করব। সে যেন বড় হয়ে একটা ভালো মানুষ হয়।”
মালতি আর থাকতে পারল না। সে রানির পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে গেল। রানি তাকে ধরে তুলে বলল, “এসব করতে হবে না। তুমি শক্ত থেকো। যদি কোনো সমস্যা হয়, আমার কাছে আসবে।”
মালতি চোখ মুছতে মুছতে বলল, “আপনি আমার মা-বোনের মতো।”
রানি হাসল না। তার মুখে একটা গভীর দুঃখ ছিল। সে ভাবছিল, এই শহরে এখনো কত মালতি আছে, যাদের স্বামী মদের নেশায় ঘর ভাঙছে, স্ত্রীকে মারছে। সে জানত, শুধু টাকা দিলে সমস্যার সমাধান হয় না। কিন্তু এই মুহূর্তে মালতির পাশে দাঁড়ানো ছাড়া তার আর কিছু করার ছিল না।
মালতি টাকাটা শাড়ির আঁচলে বেঁধে নিল। তার চোখে এখনো জল ছিল, কিন্তু মুখে একটা স্বস্তির ছাপ পড়েছিল। রানি তাকে বলল, “যাও, ছেলেকে নিয়ে বাড়ি যাও। আজ আর কাঁদবে না।”
মালতি চলে যাওয়ার পর রানি মাঠের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল। সে জানত, এই দান-খয়রাত শুধু দয়া নয়। এটা তার নিজের ভেতরের কিছু শূন্যতা পূরণ করার চেষ্টাও বটে। কিন্তু আজ মালতির মতো একজন মায়ের দুর্দশা দেখে সে সত্যিই কষ্ট পেয়েছিল।
সন্ধ্যা নামছিল। রানি গাড়িতে উঠে বসল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে সে ভাবল, এই শহরে আরও কত মালতি আছে, যাদের সাহায্য দরকার। আর সে কতটুকু করতে পারবে?
গাড়ি চলতে শুরু করল। রানি চোখ বন্ধ করে মালতির কান্নার কথা মনে করছিল। তার হাতে এখনো মালতির চোখের জলের ছোঁয়া লেগে আছে বলে মনে হচ্ছিল।