ছায়ার আড়ালে আগুন-Erotic Thriller [Part-4: অন্তিম যুদ্ধ] - অধ্যায় ২
গল্প: "ছায়ার আড়ালে আগুন" (পার্ট-৪: অন্তিম যুদ্ধ)
প্রথম পরিচ্ছেদ: ছাই থেকে জন্ম নেওয়া ফিনিক্স পাখির মতো রানির জীবন
দেড় বছর আগে যে মেয়েটা রাস্তায় বিন্দুবালার রক্তমাখা শরীর জড়িয়ে কাঁদছিল, আজ রানি আর সেই মেয়েটা আর নেই।
এখন রানি দাঁড়িয়ে আছে তার নিজের কারখানার ভিতরে — একটা পুরনো কিন্তু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন শেডের মতো জায়গা, যার চারপাশে ফলের গন্ধ আর মশলার তীব্র সুবাস ভাসছে। বড় বড় অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে আঁচে ফুটছে আম, আনারস, পেয়ারা আর কাঁচা আমের মিশ্রণ। চিনির গাঢ় সিরাপের গন্ধে গোটা জায়গাটা মিষ্টি হয়ে আছে। পাশের টেবিলে সারি সারি কাচের বয়ামে ভরা হয়ে যাচ্ছে জ্যাম, জেলি আর নানা রকমের আচার।
রানি আজ পরনে একটা লাল-কালো ছাপা শাড়ি। শাড়ির আঁচলটা কোমরে গুঁজে রেখেছে যাতে কাজে বাধা না হয়। চুলটা পিছনে বেণি করে বেঁধেছে। গলায় আর কানে কোনো গয়না নেই — শুধু হাতে একটা পাতলা রুপোর চুড়ি। চোখে এখন আর আগের মতো সেই নরম, দ্বিধাগ্রস্ত চাহনি নেই। চোখ দুটো এখন শান্ত, কিন্তু গভীর — যেন প্রতিদিন সে নিজের ভিতরে কোনো একটা আগুন নিয়ে ঘুমায়।
“দিদি, এই ব্যাচটা কি চিনির পরিমাণ একটু কম রাখব?”
একজন মাঝবয়সী মহিলা — মালতী — জিজ্ঞেস করল। তার হাতে আঁচড়ের দাগ, চোখে ক্লান্তি। কিন্তু মুখে একটা শান্তির ছাপ। এই কারখানায় কাজ করে সে এখন তার দুই ছেলেকে কলেজে পড়াতে পারে।
রানি হাসল। সেই হাসিতে এখন আর আগের মতো লজ্জা নেই।
“মালতীদি, তুমি যা ভালো বোঝো তাই করো। আমি শুধু বলব — যেন স্বাদটা ঠিক থাকে। মানুষ যেন বলে, ‘রানির জ্যামটা অন্যরকম।’”
মালতী হাসল। আশেপাশের আরও কয়েকজন মহিলা — সবাই দরিদ্র ঘরের — কাজ করতে করতে মাঝে মাঝে রানির দিকে তাকাচ্ছে। তাদের চোখে শ্রদ্ধা আছে। কেউ কেউ বলে, “রানি দিদি না থাকলে আমরা আজও ঘরে বসে থাকতাম।”
রানি ধীরে ধীরে কারখানার ভিতর দিয়ে হাঁটছে। তার পায়ের শব্দ শুনে কয়েকজন মহিলা “নমস্কার দিদি” বলে মাথা নিচু করছে। সে প্রত্যেকের কাছে গিয়ে দু-একটা কথা বলছে — কারও ছেলের পরীক্ষা নিয়ে, কারও মেয়ের বিয়ে নিয়ে, কারও স্বামীর অসুস্থতা নিয়ে।
এই কারখানাটা এখন শুধু ব্যবসা নয়। এটা একটা আশ্রয়।
বিন্দুবালার সময় এখানে মদের কারবার চলত — চোরাই, বিপজ্জনক, রক্তাক্ত। রানি সেই সব বন্ধ করে দিয়েছে। প্রথমে অনেকে বলেছিল, “তুমি পাগল হয়ে গেছো।” কিন্তু রানি থেমে যায়নি। সে ব্যাংক থেকে ছোট ঋণ নিয়ে, কয়েকজন বিশ্বস্ত লোককে সাথে নিয়ে শুরু করেছিল এই জ্যাম-জেলির কারখানা। আজ এখানে পঁয়ত্রিশজন মহিলা আর দশজন পুরুষ কাজ করে। সবাই ন্যায্য মজুরি পায়। সবাই সন্ধ্যায় ঘরে ফেরে শান্তিতে।
রানি একটা বড় টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সেখানে সারি সারি বয়াম সাজানো। সে একটা বয়াম তুলে নিয়ে আলোর দিকে তাকাল। ভিতরে কাঁচা আমের আচার — হলুদ, লাল, মশলায় ভরা।
হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল — দেড় বছর আগের সেই রাত। বিন্দুবালা তার কোলে মাথা রেখে বলেছিল, “আমার ব্যবসাটা তোর হাতে দিয়ে গেলাম…”
রানি চোখ বন্ধ করল এক সেকেন্ডের জন্য। তারপর আবার চোখ খুলল।
“দিদি, অর্জুন ডাকছে।”
পেছন থেকে একজন বয়স্ক মহিলা — যাকে সবাই “মাসিমা” বলে — ডাকল। তার কোলে একটা ছোট্ট ছেলে — মাত্র এক বছর বয়সী। চোখ দুটো বড়, ঠোঁটে হাসি, আর মাথায় কয়েকটা নরম কোঁকড়া চুল।
অর্জুন।
রানি ঘুরে দাঁড়াল। তার মুখে একটা আলাদা রকমের হাসি ফুটে উঠল — যেটা শুধু এই ছেলের জন্য। সে হাত বাড়িয়ে ছেলেকে নিয়ে নিল। অর্জুন তার মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে মুখ লুকিয়ে ফেলল।
রানি ছেলের পিঠে হাত বুলিয়ে বলল, “কী হয়েছে রে? মা-কে দেখে লুকোচ্ছিস?”
অর্জুন মাথা নাড়ল। তারপর আবার মুখ তুলে মায়ের দিকে তাকাল। তার চোখের আকৃতিটা… অনেকটা তার বাবার মতো।
রানি এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল।
অংশুমান।
সেই নামটা এখনো তার বুকে একটা ভারী পাথরের মতো চেপে বসে আছে। দেড় বছর আগে সে প্রতিজ্ঞা করেছিল — সে এই ছেলেকে নিয়ে একা লড়বে। কিন্তু প্রতিদিন সকালে যখন অর্জুন চোখ মেলে তার দিকে তাকায়, তখন রানি বুঝতে পারে — এই লড়াইটা শুধু ব্যবসা বা ক্ষমতার নয়। এটা তার নিজের হৃদয়ের সাথেও।
সে ছেলেকে কোলে নিয়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে শহরের রাস্তা, গাড়ির শব্দ, মানুষের ভিড়।
“জানিস অর্জুন,” সে আস্তে আস্তে বলল, “তোর মা এখন আর আগের মতো নেই। তোর মা এখন লড়াই করতে শিখেছে।”
ছেলেটা তার মায়ের গালে ছোট্ট হাত রাখল।
রানি চুমু খেল তার কপালে।
কিন্তু তার চোখের গভীরে একটা আগুন জ্বলছিল — যেটা দেড় বছর ধরে ধীরে ধীরে বড় হয়েছে।
সে জানে, এই শান্তি চিরকাল থাকবে না।
অংশুমান এখনো আছে। তার ক্ষমতা আরও বেড়েছে। থানার বড়বাবু হয়ে সে এখন আরও বিপজ্জনক। মন্ত্রীসাহেবা রুবিনার সাথে তার সম্পর্ক — সব মিলিয়ে সে এখন একটা বড় জাল বুনেছে।
রানি জানে, একদিন না একদিন সেই জাল তার দিকে ছুঁড়ে আসবে।
সে ছেলেকে আরও জড়িয়ে ধরল।
“তুই বড় হবি,” সে ফিসফিস করে বলল, “আর তখন হয়তো তুই আমাকে জিজ্ঞেস করবি — তোর বাবা কে?”
সে থামল। তারপর নিজের কান্না চেপে রেখে বলল,
“কিন্তু আজ না হলে… তুই আমাকে ঠিকই বুঝবি।”
বাইরে সূর্য ডুবে যাচ্ছিল। কারখানার ভিতরে আলো কমে আসছিল।
রানি অর্জুনকে কোলে নিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখে এখন আর শুধু মায়ের দৃষ্টি নেই — সেখানে আছে একজন নেত্রীর দৃষ্টি।
সে জানে, অন্তিম যুদ্ধ এখন আর দূরে নয়।