দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস? - অধ্যায় ৩৭
৩৭।
সন্ধ্যা সাতটার দিকে আমি রবীন্দ্র সরোবরের কাছাকাছি পৌঁছালাম। দিনের বেলার ভ্যাপসা গরমটা এখন আর নেই। লেকের দিক থেকে একটা খুব স্নিগ্ধ, ঠান্ডা বাতাস বইছে। চারপাশের ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলো লেকের কালো পানিতে পড়ে একটা মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছে। সরোবরের সিঁড়িগুলোতে কপোত-কপোতীরা বসে আছে, বাদাম আর চটপটির দোকানের হাঁকডাক, গিটার হাতে কয়েকজন ছেলে গান গাইছে। ঢাকা শহরের এই চিরচেনা সন্ধ্যার একটা নিজস্ব রোমান্টিকতা আছে।
আমি লেকের পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে আনিকাকে খুঁজতে লাগলাম। হঠাৎ একটা গাছের নিচে, একটু আধো-অন্ধকার জায়গায় উনাকে দেখতে পেলাম। আমি আক্ষরিক অর্থেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেলাম। আনিকা নাওহারের শারীরিক সৌন্দর্যের বর্ণনা দিতে গেলে আসলে ডিকশনারির শব্দভাণ্ডার কম পড়ে যায়। উনাকে আমি শাড়িতে দেখেছি, স্লিপিং গাউনে দেখেছি, সম্পূর্ণ অনাবৃত অবস্থাতেও দেখেছি। কিন্তু আজ উনার ক্যাজুয়াল, ওয়েস্টার্ন লুকটা আমাকে যেন নতুন করে আবার প্রেমে ফেলে দিল।
উনার পরনে একটা স্কাই-ব্লু রঙের ডেনিম জিন্স, যেটা উনার নিখুঁত, সুডৌল পা এবং নিতম্বের সাথে একেবারে লেপ্টে আছে। ওপরে একটা ধবধবে সাদা রঙের লিনেন কাপড়ের কুর্তি। কুর্তিটা ঢিলেঢালা হলেও, বাতাস যখন উনার গায়ে এসে লাগছিল, তখন কাপড়টা উনার সেই ভরাট, উদ্ধত বক্ষদেশের সাথে সেঁটে গিয়ে একটা মারাত্মক আবেদন তৈরি করছিল। উনার ঘাড়ের ওপর দিয়ে একটা কালো রঙের পাতলা শাল খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে জড়ানো।
চুলগুলো আজ কোনো পার্লার স্টাইলে সাজানো নেই, বরং একটা খুব সাধারণ 'মেসি বান' বা অগোছালো খোঁপা করে মাথার ওপরে আটকানো। কয়েক গোছা অবাধ্য চুল উনার ফর্সা গলার কাছে এসে পড়ছে। মুখে মেকআপের কোনো লেয়ার নেই, শুধু চোখে গাঢ় কাজল আর ঠোঁটে একটা হালকা পিংক কালারের লিপবাম।
এই সাধারণ সাজেও উনাকে এত বেশি সুন্দর, এত বেশি আভিজাত্যপূর্ণ এবং একই সাথে এত বেশি আবেদনময়ী লাগছিল যে, আমার মনে হলো আমি উনার সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ি। আমি উনার কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ালাম।
"অনেকক্ষণ অপেক্ষা করালাম?" আমি একটা মুগ্ধ হাসি দিয়ে বললাম।
আনিকা আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন। "না, এই তো জাস্ট এলাম। চলো, ওই দিকটায় বসি। ওখানে ভিড় কম।" আমরা লেকের পাড়ের একটা ফাঁকা বেঞ্চে গিয়ে বসলাম। একটা পিচ্চি ছেলের কাছ থেকে মাটির ভাঁড়ে দু কাপ চা নিলাম। আমি পকেট থেকে বেনসন বের করে একটা ধরালাম।
আমাদের দুজনের মাঝখানে একটা অদ্ভুত, ভারী নীরবতা। আমি বাসে করে গ্রামে চলে যাচ্ছি। আনিকা হয়তো আর কিছুদিন পর লন্ডনে ফিরে যাবেন। আমাদের এই অদ্ভুত, নিষিদ্ধ এবং বন্য সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কী, সেটা আমরা কেউই জানি না। আমি চায়ের ভাঁড়ে একটা চুমুক দিয়ে সিগারেটের ধোঁয়াটা বাতাসে ছাড়লাম।
"আনিকা," আমি নীরবতা ভেঙে, খুব শান্ত, কিন্তু গভীর গলায় বললাম। "আমি তো চলে যাচ্ছি। এক মাসের জন্য। আমি জানি না ফিরে আসার পর তোমাকে আর পাব কি না। কিন্তু যাওয়ার আগে, আমার মন একটা প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য খুব ছটফট করছে। আমার মস্তিষ্ক শান্তিতে নেই।"
আনিকা চায়ের ভাঁড়টা দুই হাত দিয়ে ধরে লেকের কালো পানির দিকে তাকিয়ে ছিলেন। উনি আমার দিকে ঘাড় ফেরালেন না, শুধু বললেন, "কী প্রশ্ন?"
আমি উনার চোখের দিকে সরাসরি তাকালাম। "সেদিন শাহবাগে তুমি বলেছিলে... বেলাল সাহেব নাকি সবকিছু জানতেন। তুমি বলেছিলে, এসব নাকি উনিই শুরু করেছিলেন! আমার সাথে তোমার এই সম্পর্ক, এই উন্মাদনা— এগুলোর পেছনে নাকি উনারই কোনো হাত আছে। আনিকা, আমি গত কয়েকদিন ধরে এই কথাটা নিয়ে ভেবে ভেবে পাগল হয়ে যাচ্ছি। তুমি আমাকে অর্ধেক কথা বলে অন্ধকারে ফেলে রেখেছ।"
আমি একটু দম নিলাম। উনার মুখের দিকে তাকিয়ে উনার রিয়্যাকশন বোঝার চেষ্টা করলাম। উনার মুখটা একদম শান্ত, কিন্তু চোখের দৃষ্টিতে একটা অদ্ভুত শীতলতা। "আনিকা, প্লিজ। আজ আমাকে সত্যি কথাটা বলো। কী শুরু করেছিলেন বেলাল সাহেব? উনি কী জানতেন? তোমাদের এই পারফেক্ট, হাই-সোসাইটির বিয়ের পেছনের আসল সত্যিটা কী?"
আমার প্রশ্নগুলো রাতের বাতাসে একটা ভারী পাথরের মতো গিয়ে পড়ল। আনিকা নাওহার কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন। উনি উনার চায়ের ভাঁড়টা বেঞ্চের ওপর রাখলেন। তারপর উনার কালো শালটা দুই হাত দিয়ে নিজের শরীরের চারপাশে একটু ভালো করে জড়িয়ে নিলেন, যেন উনি ভেতরের কোনো শীত বা কোনো অতীত স্মৃতি থেকে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করছেন।
উনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। সেই দীর্ঘশ্বাসের সাথে উনার বুকের সেই ভরাট স্ফীতিটা একবার ওপরে উঠল এবং নিচে নামল। উনি উনার সেই গভীর, বাদামি চোখ দুটো সোজা আমার চোখের ওপর স্থাপন করলেন। উনার দৃষ্টিতে এখন কোনো কামুকতা নেই, কোনো খেলা নেই। সেখানে এখন একটা নগ্ন, রূঢ় এবং ভয়ংকর সত্যের ছায়া।
"তুমি সত্যিটা জানতে চাও রাশেদ?" আনিকা খুব নিচু, ফিসফিস করা, কিন্তু ইস্পাতের মতো কঠিন গলায় বললেন।
"তুমি আমার আর বেলালের এই পারফেক্ট বিয়ের পেছনের নোংরা, কদর্য আর কুৎসিত সত্যিটা শুনতে চাও?"
আমি ঢোঁক গিলে শুধু মাথা নাড়লাম। "হ্যাঁ। আমি শুনতে চাই।"
আনিকা উনার ঠোঁটটা একটু কামড়ে ধরলেন। উনার চোখ দুটো লেকের পানির দিকে নিবদ্ধ হলো। "তাহলে শোনো..." আনিকা উনার জীবনের সেই বন্ধ দরজার তালাটা খুলতে শুরু করলেন। "সবাই ভাবে বেলাল একজন জিনিয়াস ইঞ্জিনিয়ার, একজন লাভিং হাসব্যান্ড। কিন্তু বেলালের আসল রূপটা তুমি জানো না রাশেদ। ও কোনো সাধারণ পুরুষ নয়। ওর মাথার ভেতর যে বিকৃতি কাজ করে, সেটা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না..."
"আমাদের সংসারটা শুরুতে খুব সুন্দর ছিল, রাশেদ," আনিকা বলতে শুরু করলেন। উনার কণ্ঠস্বরটা রাতের এই মৃদু বাতাসে কেমন যেন একটা দীর্ঘশ্বাসের মতো শোনাল। "বেলাল মানুষ হিসেবে খুব চমৎকার ছিল। অন্তত প্রথম তিন বছর। লন্ডনে আমাদের ছোট্ট ফ্ল্যাটটা ছিল আমাদের নিজেদের একটা স্বর্গ। ও সারাদিন ওর ইউনিভার্সিটি আর রিসার্চ নিয়ে ব্যস্ত থাকত, আর আমি আমার কাজ নিয়ে। কিন্তু দিন শেষে যখন আমরা ওই বাসায় ফিরতাম, তখন আমাদের মাঝখানে কোনো দূরত্ব থাকত না। আমরা দুজনে একসাথে রান্না করতাম, গান শুনতাম... আর আমাদের প্রাইভেট মুহূর্তগুলো ছিল খুব সাধারণ, কিন্তু ভীষণ উষ্ণ।"
আমি উনার কথা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম। আমি কোনো অস্থিরতা দেখালাম না। আমি পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরালাম। সিগারেটের ধোঁয়াটা আমাদের মাঝখানের শূন্যতায় রিং তৈরি করে বাতাসে মিলিয়ে যেতে লাগল।
"কিন্তু তিন বছর পর," আনিকা উনার গলার স্বরটা আরেকটু নামিয়ে নিলেন, "আমি প্রথম খেয়াল করলাম, বেলালের মধ্যে একটা পরিবর্তন আসছে। খুব সূক্ষ্ম পরিবর্তন। ও যখন আমার কাছে আসত, তখন সেই পুরোনো মনোযোগটা থাকত না। ও যেন একটা দায়িত্ব পালন করছে, এমন একটা ভাব। আমাকে স্যাটিসফাই করার জন্য ও খুব তাড়াহুড়ো করত, কিন্তু নিজের কোনো সম্পৃক্ততা থাকত না। ও যেন শারীরিকভাবে আমার সাথে থাকত, কিন্তু মানসিকভাবে ও অন্য কোথাও হারিয়ে যেত।"
আমি সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, "তুমি কিছু জিজ্ঞেস করোনি?"
"করেছিলাম," আনিকা উনার ঠোঁটটা একটু কামড়ে ধরে বললেন। উনার ফর্সা গলার পেশিগুলো একটু শক্ত হয়ে উঠল। "ও বলত কাজের খুব প্রেসার। ইউনিভার্সিটির প্রমোশনের চাপ, রিসার্চের টেনশন। আমিও ভাবলাম, হ্যাঁ, হয়তো এটাই সত্যি। একটা মানুষ যখন ক্যারিয়ার নিয়ে এত স্ট্রাগল করে, তখন শারীরিক সক্ষমতা বা আগ্রহ একটু কমে যেতেই পারে। আমি স্পেস দিয়েছিলাম। প্রায় এক বছর আমি এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছি। আমি কখনো কোনো প্রেশার দিইনি।"
আমি আনিকার দিকে তাকালাম। এই সুন্দরী, পরিণত নারীটি উনার জীবনের সেই একাকীত্বের দিনগুলোতে কতটা কষ্ট পেয়েছিলেন, তা উনার চোখের কোণের সেই হালকা পানির বিন্দু দেখেই বোঝা যাচ্ছে। উনার কাপড়ের নিচ দিয়ে উনার বুকের সেই ভরাট গঠনটা প্রতিটা নিশ্বাসের সাথে ভারী হয়ে উঠছিল।
"কিন্তু এক বছর পর," আনিকা বলতে থাকলেন, উনার কণ্ঠস্বরটা এবার একটু শক্ত হয়ে উঠল, "পরিস্থিতি আরও খারাপ হলো। বেলাল আমাকে স্পর্শ করাই বন্ধ করে দিল। ও দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ আমার পাশে শুয়ে থাকত, কিন্তু কোনো সাড়াশব্দ থাকত না। আমি যদি গায়ের ওপর হাত রাখতাম, ও খুব ভদ্রভাবে শরীরটা সরিয়ে নিত। বলত, 'আজ খুব টায়ার্ড লাগছে আনিকা, চলো ঘুমাই।' শেষমেশ পরিস্থিতি এমন দাঁড়াল যে, আমার নিজের ভেতরের শারীরিক তাড়নায়, নিজের ক্ষুধার কারণে আমাকেই ইনিশিয়েটিভ নিতে হতো।"
আমি উনার দিকে তাকিয়ে আমার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত যন্ত্রণা অনুভব করলাম। এই অপরূপা নারী, যার একটি ইশারায় যেকোনো পুরুষ উনার পায়ে লুটিয়ে পড়তে পারে, তাকে উনার নিজের স্বামীর কাছে এভাবে হাত পাততে হতো!
"এবং যখন আমি ওর কাছে যেতাম," আনিকা উনার চোখ বন্ধ করে ফেললেন, যেন উনার অতীতের সেই চরম অপমানের স্মৃতিটা উনি আবার দেখতে পাচ্ছেন, "ও বিছানায় একটা পাথরের মূর্তির মতো পড়ে থাকত। কোনো রিয়্যাকশন থাকত না, কোনো রেসপন্স থাকত না। ও শুধু শুয়ে থাকত, আর আমাকেই সবকিছু করতে হতো। মনে হতো আমি কোনো প্রাণহীন, ঠাণ্ডা লাশের সাথে জড়িয়ে আছি। শরীরটা আমার ছোঁয়ায় একটুও সাড়া দিত না। পুরুষাঙ্গ আমার হাতের মুঠোয় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে থাকত। এক বছর... পুরো এক বছর আমি এই নরক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গিয়েছি রাশেদ। আমার নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে কুৎসিত এবং সবচেয়ে অপাংক্তেয় নারী বলে মনে হতো।"
আনিকার চোখ দিয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। উনার সেই ফর্সা গালে অশ্রুবিন্দুটি ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় একটা মুক্তোর দানার মতো জ্বলজ্বল করতে লাগল। আমার উনার হাতটা ধরতে ইচ্ছে করল, কিন্তু আমি উনাকে ডিস্টার্ব করলাম না। আমি উনার গল্প শুনতে লাগলাম।
"একদিন আমি আর পারলাম না," আনিকার গলার স্বরটা এখন রাগে আর অপমানে কাঁপছে। "আমি জাপটে ধরলাম। চেপে ধরে বললাম, 'বেলাল, কী হয়েছে তোমার? সত্যি করে বলো। তুমি কেন আমার সাথে এমন করছ? তোমার কি কোনো রোগ হয়েছে?' ও প্রথমে কিছু বলল না। চুপ করে রইল। আমি যখন অনেক জোরাজুরি করলাম, ডিভোর্সের হুমকি দিলাম, তখন ও খুব শান্ত গলায় মাথাটা বালিশে হেলিয়ে দিয়ে একটা কথা বলল।"
"কী বলল?" আমি খুব নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করলাম।
"ও বলল, 'আনিকা, আমি তোমার শরীরে আর কোনো থ্রিল পাই না। তোমার সাথে শোয়াটা এখন আমার কাছে একটা রুটিন ওয়ার্কের মতো মনে হয়। এই রিলেশনশিপটা আমার জন্য একটা বোঝা।'"
আনিকা একটু থামলেন। উনার শ্বাস এখন খুব দ্রুত ওঠানামা করছে। পরনের কাপড়ের সামনের অংশটা সেই নিশ্বাসের ধাক্কায় ফুলে উঠছে। আমি উনার এই তীব্র যন্ত্রণার মধ্যেও উনার শারীরিক গঠনের সেই মারাত্মক আকর্ষণটা এড়াতে পারছিলাম না। উনার কোমরটা বেঞ্চের ওপর একটা সুন্দর ধনুকের মতো বাঁক তৈরি করেছিল।
"আমি তো অবাক!" আনিকা বলতে থাকলেন। "আমি বললাম, 'থ্রিল পাও না মানে? আমি তোমার স্ত্রী!' ও বলল, 'তাতে কী? মানুষের রুচি তো বদলাতেই পারে।' আমি যখন আরও প্রেশার দিলাম, জিজ্ঞেস করলাম ওর কি অন্য কোনো চয়েস আছে কি না, তখন ও খুব ঠান্ডা মাথায় একটা স্বীকারোক্তি দিল। ও বলল, ওর ইউনিভার্সিটির এক সাদা চামড়ার কলিগ, নাম ক্যাথরিনের সাথে ও গত কয়েক মাস ধরে রেগুলার সেক্স করছে।"
আমি চমকে উঠলাম। আনিকা একটা বিষাক্ত হাসি হাসলেন।
"আমি বেলালকে বললাম, 'কিন্তু আমার প্রতি তোমার এই অনিহা তো গত কয়েক মাসের না, এটা তো প্রায় দুই বছর ধরে চলছে! তাহলে তার আগে কী হয়েছিল?' বেলাল তখন ওর ডিকশনারির সবচেয়ে নোংরা পাতাটা খুলল। ও স্বীকার করল, ক্যাথরিনের আগে, ওর খুব ভালো বন্ধু রাসেল— রাসেলও আমাদের সাথে ইউকেতেই থাকে— রাসেলের বউ তানিষার সাথে ও নিয়মিত ফিজিক্যাল রিলেশনে ছিল। রাসেল যখন অফিসে থাকত, বেলাল তখন রাসেলের বাসায় গিয়ে তানিষার সাথে বিছানায় মেতে উঠত।"
আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। বেলাল সাহেব লোকটা তো আস্ত একটা সাইকোপ্যাথ! তার নিজের খুব ভালো বন্ধুর স্ত্রীর সাথে সে নিয়মিত শারীরিক সম্পর্ক রাখছিল!
"শুধু তানিষা আর ক্যাথরিনই নয়," আনিকার চোখ দুটো এখন প্রতিশোধের আগুনে জ্বলছে। "ও জানাল, গত আড়াই-তিন বছরে ও আরও অন্তত তিন-চারজন ভিন্ন ভিন্ন নারীর সাথে শুয়েছে। ওদেশে ওয়ান-নাইট স্ট্যান্ড বা ক্যাজুয়াল সেক্স তো খুব সহজ। ও বলল, এই কাজগুলোতে খুব ভালো লাগে। কোনো গিল্ট ফিলিং হয় না, কোনো অপরাধবোধ বা লজ্জা নেই। ও জীবনটাকে এনজয় করতে চায়।"
আমি নিচু, বিষণ্ণ গলায় জিজ্ঞেস করলাম, "তুমি কিছু বললে না? তুমি কি উনাকে ডিভোর্সের কথা বললে না?"
"বলেছিলাম," "অনেক রাগারাগি করেছি, অনেক কেঁদেছি, পায়ে পর্যন্ত ধরেছি যে আমাদের বিয়েটা যেন ও এভাবে নষ্ট না করে। কিন্তু ও বলল, 'আনিকা, আমাদের বিয়েটা একটা সোশ্যাল স্ট্যাটাস। আমরা সমাজকে দেখাতে পারি যে আমরা খুব সুখে আছি। কিন্তু আমাদের পার্সোনাল লাইফে আমরা স্বাধীন। তোমার যদি শারীরিক চাহিদা থাকে, তুমিও অন্য কোনো পুরুষের সাথে ঘুমাতে পারো। আমার কোনো আপত্তি থাকবে না। আমরা চাইলে ওপেন ম্যারেজ ট্রাই করতে পারি। আর তোমার যদি এতে আপত্তি থাকে, আমরা সোজা ডিভোর্সের দিকে এগোতে পারি।'"
আমি আর কোনো কথা খুঁজে পেলাম না। আনিকা নাওহারের মতো একজন ক্লাসি, রূপবতী এবং অহংকারী নারীকে উনার নিজের স্বামী একটা ওপেন ম্যারেজের প্রস্তাব দিচ্ছেন! উনাকে বলছেন— "তুমি চাইলে অন্য পুরুষের বিছানায় যাও, আমার আপত্তি নেই।" এই অপমানের চেয়ে বড় কোনো অপমান একজন নারীর জীবনে হতে পারে না।
"আমি ডিভোর্স চাইনি রাশেদ," আনিকা উনার চোখের পানি মুছে খুব শান্ত গলায় বললেন। "আমি চেয়েছিলাম বেলালকে একটু সময় দিতে। আমি ভেবেছিলাম, আমি যদি এইবার একটু বেশি দিনের জন্য দেশে আসি, ও যদি ওই ফ্যান্টাসির বাইরে একা থাকে, হয়তো একাকিত্বের ভয়ে আমার কাছে ফিরে আসবে। অনুতাপ হবে। ভুল বুঝতে পারবে। আমি ডিভোর্স দিয়ে আমাদের সুন্দর অতীতটাকে ভেঙে ফেলতে চাইনি। আর বেলালের ওপর রেগে গিয়ে, নিজের সতীত্ব অন্য কোনো সস্তা পুরুষের বিছানায় গিয়ে বিসর্জন দিতেও আমার ইগোতে লেগেছে।"
আমি আনিকার দিকে তাকালাম। উনার চোখের মণি দুটো এখন লেকের পানির অন্ধকারে আরও বেশি গভীর আর রহস্যময় মনে হচ্ছে। উনার এই সরল, সততা মেশানো স্বীকারোক্তি আমার ভেতরের সমস্ত অবিশ্বাসকে ঝেড়ে ফেলে দিল।
"কিন্তু..." আনিকা হঠাৎ উনার বসার ভঙ্গিটা পাল্টালেন। উনার গলার স্বরটা এখন একটা বরফের মতো শীতল।
"আমার সমস্ত ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল এই দেশে এসে।"
"কেন?" আমি জিজ্ঞেস করলাম। আমার বুকটা আবার ধকধক করছে। "দেশে এসে কী হলো?"
"দেশে এসে আমি বেলালের এমন একটা খবর পেলাম, এমন একটা নোংরা ঘটনা জানতে পারলাম, যা জানার পর আমার ভেতরের ওই সতী নারীটা চিরতরে মরে গেল। আমার মনে হলো, আমি বেলালের জন্য যে আত্মত্যাগ করছি, সেটা একটা চরম বোকামি। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, বেলালকে আমি ওর ভাষাতেই জবাব দেব।"
আনিকা একটু থামলেন।
"কী খবর পেয়েছিলে তুমি?" আমি উনার দিকে একটু ঝুঁকে এসে জিজ্ঞেস করলাম।
আনিকা নাওহারের ঠোঁটে একটা খুব শীতল, ম্লান হাসি ফুটে উঠল। "রাশেদ, উত্তরটা দেওয়ার আগে আমাকে একটা সিগারেট ধরাও তো," আনিকা বললেন। উনার গলার স্বরটা খুব শান্ত, কিন্তু তার গভীরে একটা দীর্ঘশ্বাসের কাঁপুনি ছিল।
আমি পকেট থেকে বেনসনের প্যাকেট বের করলাম। একটা ম্যাচ কাঠি জ্বালিয়ে আগুনটা উনার ঠোঁটে ধরা সিগারেটের ডগায় ধরলাম। আগুনের সেই ক্ষণস্থায়ী আলোয় আমি আনিকার চোখের মণি দুটো দেখলাম। সেই বাদামি চোখে আজ কোনো মায়া নেই, সেখানে শুধু জমে আছে এক বিষাক্ত অতীত।
আমি নিজের জন্যও একটা সিগারেট ধরালাম। ধোঁয়াটা ফুসফুসে টেনে নিয়ে বাতাসের দিকে ছুঁড়ে দিলাম। আনিকা সিগারেটে একটা দীর্ঘ টান দিলেন। ধোঁয়াটা কিছুক্ষণ নিজের ভেতরে আটকে রেখে উনি খুব রিল্যাক্সড ভঙ্গিতে বাতাসে ছাড়লেন। উনার ফর্সা, মসৃণ মুখমণ্ডলের ওপর ধোঁয়ার একটা পাতলা আস্তরণ তৈরি হয়ে আবার মিলিয়ে গেল।
"রাশেদ, দেশে আসার পর তোমার সঙ্গে যখন আমার প্রথম পরিচয় হলো," আনিকা বলতে শুরু করলেন। উনার গলার স্বর খুব নিচু, যেন উনি নিজের সাথেই কথা বলছেন। "আমি কিন্তু প্রথম দিন থেকেই খেয়াল করেছিলাম যে তোমার ভেতরে একটা অদ্ভুত ছটফটানি কাজ করছে। তুমি তোমার ওই তীক্ষ্ণ, শিকারি চোখ জোড়া দিয়ে আড়চোখে আমার শাড়ির কুঁচি, আমার কোমর, আমার বক্ষদেশ যেভাবে তারিয়ে তারিয়ে চুষে খাচ্ছিলে— তা দেখেই আমি বুঝে গিয়েছিলাম যে তুমি আমার প্রেমে বা আমার শরীরের নেশায় হাবুডুবু খাচ্ছ।"
আমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিলাম। আমার গাল দুটো একটু গরম হয়ে উঠল।
আনিকা উনার ঠোঁটের কোণে একটা মৃদু হাসি ফুটিয়ে বললেন, "কিন্তু আমি তো তখনো সতী সেজেছিলাম। বেলাল আমাকে এত বড় একটা আঘাত দেওয়ার পরও আমি আমার মনে বেলালের জন্য একটা ছোট জায়গা বাঁচিয়ে রেখেছিলাম। আমি ভেবেছিলাম, না, আমি বেলালের মতো নোংরা হব না। আমি আমার সতিত্ব আগলে রাখব। তাই প্রথম প্রথম আমি তোমাকে খুব একটা পাত্তা দিইনি। তোমার ওই লোলুপ দৃষ্টি আমি খুব উপভোগ করতাম ঠিকই, কিন্তু আমি তোমাকে একটা সীমারেখার ওপাশে আটকে রেখেছিলাম।"
আমি উনার কথা মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে একটু অধৈর্য গলায় বললাম, "আহা! আমি আমার নিজের গল্প শুনতে এখানে আসিনি আনিকা। আমার ওই ক্ষুধার্ত চোখের কথা তো আমি নিজেই জানি। তুমি আমাকে বলো— কী এমন জানতে পারলে তুমি? কার কাছ থেকে জানতে পারলে যে তোমার ওই ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল?"
আনিকা সিগারেটের ছাইটা লেকের পানিতে ঝেড়ে ফেলে একটা লম্বা নিশ্বাস নিলেন। উনার সাদা লিনেনের কুর্তিটা সেই নিশ্বাসের ধাক্কায় ফুলে উঠে আবার নেমে গেল।
"দেশে আসার ঠিক দুই সপ্তাহের মাথায় ঘটনাটা ঘটল," আনিকা বলতে লাগলেন। "আমার এই ধানমন্ডির ফ্ল্যাটটা তো অনেক দিন ধরে তালাবন্ধ থাকে। ফ্ল্যাটটা ক্লিন করার জন্য আর আমাকে টুকটাক হেল্প করার জন্য ঐযে কাজের মেয়েটা আসত। মনে আছে না তোমার?মেয়েটার নাম ময়না। বয়স বড়জোর উনিশ বা বিশ হবে। খুব সাদাসিধে, গ্রাম্য একটা মেয়ে।"
আমি মাথা নাড়লাম। হ্যাঁ, ওই মেয়েটার কথা আমি জানি। আমি যখন ফ্ল্যাটে ছিলাম, মেয়েটা সকালে এসে ক্লিন করে দিয়ে যেত।
"তো, একদিন ময়না ঘর মুছতে মুছতে আমাকে খুব ক্যাজুয়াল একটা প্রশ্ন করল," আনিকা বললেন। "সে বলল— 'ম্যাডাম, এইবার স্যার আইবেন না?' আমি প্রশ্নটাকে খুব সাধারণ একটা কৌতূহল বলেই ধরে নিয়েছিলাম। কারণ আমরা তো এর আগে যখনই দেশে এসেছি, দুজনে একসাথেই এসেছি। আমি হাসিমুখে বললাম— 'না ময়না, তোমার স্যার তো এবার আসবে না। ও ওখানে খুব ব্যস্ত।' ময়না একটু চুপ করে থেকে বলল— 'স্যার মানুষটা অনেক ভালো ম্যাডাম।' আমি কথা শুনে একটু হাসলাম। বললাম— 'হ্যাঁ, ও মানুষ হিসেবে ভালোই।' কিন্তু ময়না সেখানেই থামল না। সে ঘর মোছার বালতিটা একপাশে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল— 'স্যার যখন গতবার আইছিলেন, আপনি তো আসেন নাই। তখন আমার মায়ের খুব কঠিন অসুখ আছিল। চিকিৎসার জন্য অনেক টাকার দরকার আছিল। স্যার আমারে অনেক টাকা দিয়া সাহায্য করছেন। স্যার বড় ভালা মানুষ।'
আনিকা একটু থামলেন। উনার চোখের মণি দুটো এখন বরফের মতো ঠাণ্ডা।
আমি উনার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, "তারপর? তুমি অবাক হলে?"
"অবাক মানে?" আনিকা একটা বিষাক্ত হাসি হাসলেন। "আমার মাথার ভেতরের সমস্ত লজিক যেন এক সেকেন্ডে জ্যাম হয়ে গেল। আমি মনে মনে হিসাব করতে লাগলাম— বেলাল গতবার একলা দেশে এসেছিল? কখন এসেছিল? ও তো আমাকে কোনোদিন বলেনি যে ও একলা বাংলাদেশে গিয়ে ঘুরে এসেছে! আমি আমার স্মৃতি হাতড়ে দেখলাম, আমি দেশে আসার ঠিক তিন-চার মাস আগে বেলাল আমাকে বলেছিল যে ও একটা বৈজ্ঞানিক সেমিনারের কাজে ফ্রান্স যাচ্ছে। ১০-১২ দিনের জন্য। আমার কাছে সবকিছু পরিষ্কার হতে শুরু করল। বেলাল আসলে ফ্রান্স যায়নি। ও উনার ওই বৈজ্ঞানিক সেমিনারের মিথ্যা গল্প সাজিয়ে সোজা ঢাকায় চলে এসেছিল! একলা!"
আমি খুব মনোযোগ দিয়ে উনার কথা শুনছিলাম। আমার মনের ভেতর একটা অদ্ভুত বিস্ময় কাজ করছে। বেলাল সাহেব উনার স্ত্রীকে লুকিয়ে দেশে এসেছিলেন!
"আমার হঠাৎ করে এক তীব্র সন্দেহ হলো," আনিকা বললেন। উনার গলার স্বর এখন কাঁপছে। "বেলাল এই ফ্ল্যাটে একলা এসে থেকেছে, অথচ আমার কাছে সেই খবরটা ও লুকিয়ে গেছে। কেন? আর তার চেয়েও বড় কথা— বেলাল মানুষ হিসেবে কখনো মানবদরদী ছিল না। ও লন্ডনে কোনো চ্যারিটিতে এক পাউন্ড টাকা দিতে গেলেও দশবার হিসাব করে। সেই বেলাল হঠাৎ করে আমাদের ফ্ল্যাটের এক সাধারণ কাজের মেয়েকে মায়ের চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা দিয়ে দিল? এটা কোনোভাবেই বেলালের চরিত্রের সাথে মেলে না। আমি ময়নাকে একপ্রকার রিমান্ডে নিলাম।"
"তুমি ময়নাকে জেরা করলে?" আমি জিজ্ঞেস করলাম।
"হ্যাঁ। খুব শান্ত গলায় বললাম— 'ময়না, তোমার স্যার তোমাকে কত টাকা দিয়েছিল?' ময়না একটু ঘাবড়ে গেল। বলল— 'ম্যাডাম, অনেক টাকা দিছিল। প্রায় লাখখানেক।' আমি বললাম— 'তোমার স্যার তো কখনো কাউকে এক টাকাও ফ্রি দেয় না ময়না। ও তোমাকে এত টাকা কেন দিল? সত্যি করে বলো তো, ও কি এমনি এমনি টাকাটা দিয়েছিল?' ময়না আমার গলার স্বরের কাঠিন্য দেখে ভয় পেয়ে গেল। ও কাঁপতে কাঁপতে কাঁদতে শুরু করল। আমি আর একটু চেপে ধরতেই, উনি সোজা আমার পায়ের কাছে বসে পড়ল। ও কাঁদতে কাঁদতে স্বীকার করল— 'ম্যাডাম, আমার খুব ভুল হইয়া গেছে। স্যার টাকা দিছিল ঠিকই, কিন্তু উনার লগে শুইতে কইছে।'"
আনিকার কথাগুলো শোনার পর আমার নিজের শরীরের ভেতর দিয়েও একটা অদ্ভুত অস্বস্তির হাওয়া বয়ে গেল। নিজের ফ্ল্যাটে, নিজের বিছানায়, নিজের কাজের মেয়ের সাথে স্বামী শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছে!