২টি ছাদ ও কয়েকটি বিকেল... - অধ্যায় ১৯

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-73110-post-6273475.html#pid6273475

🕰️ Posted on Sun Jul 26 2026 by ✍️ Dead people (Profile)

🏷️ Tags:
📖 4210 words / 19 min read

পর্ব ১৮ শীতটা এবার একটু দেরিতে নামছিল। ক্যালেন্ডার বলছিল ডিসেম্বর চলে এসেছে, কিন্তু বাতাস এখনও পুরোপুরি কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো ঠান্ডা হয়নি। তবুও সকালের রোদে একটা নরম সোনালি বিষণ্নতা ছিল—যেন বছরটা ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে। বারান্দায় সেই রোদ এসে পড়েছে। শুভ্র মেঝেতে পা মুড়ে বসে কলেজের জুতা পালিশ করছে। তার ছোট্ট আঙুলে কালো পালিশ লেগে গেছে, কিন্তু সে খুব মনোযোগ দিয়ে কাজ করছে। মাঝেমধ্যে জুতাটা চোখের সামনে তুলে ধরে দেখে চকচক করছে কিনা। তারপর আবার ঘষে। তার জিভ একটু বের হয়ে আছে মনোযোগের চাপে। বাচ্চাদের একটা অদ্ভুত গুণ আছে—ওরা ছোট কাজগুলোও এমন গুরুত্ব দিয়ে করে, যেন সেটার ওপর পুরো পৃথিবীর ভার রাখা। রাফি দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে ছিল। তার বুকের ভেতর হঠাৎ খুব অদ্ভুত একটা ব্যথা উঠল। কারণ কয়েক মাস আগেও সে নিশ্চিত ছিল না—এই দৃশ্যগুলো সে ধরে রাখতে পারবে কিনা। এই সকাল, এই রোদ, এই বাচ্চাটার নির্ভার মুখ—সবকিছু হারিয়ে যেতে পারে ভেবে কত রাত সে ঘুমাতে পারেনি। এখন শুভ্র জুতার ফিতা বাঁধতে বাঁধতে হঠাৎ মাথা তুলে বলল, “আব্বু, আমি বড় হইলে ব্যাংকে চাকরি করব না।” রাফি একটু চমকে তাকাল। “ক্যান?” শুভ্র খুব সিরিয়াস গলায় বলল, “তুমি সবসময় টেনশনে থাকো।” কথাটা বলেই আবার জুতার দিকে মন দিল সে। কিন্তু কথাটা এসে রাফির বুকের কোথাও আটকে গেল। কারণ বাচ্চারা অনেক সময় এমন সত্যি দেখে ফেলে, যেটা বড়রা আয়নার সামনেও দেখতে পারে না। ভেতরে রান্নাঘরে নীলা ডিম ভাজছে। তেলের শব্দ উঠছে—ছটছট করে। পেঁয়াজ পোড়ার গন্ধ পুরো ঘরে ছড়িয়ে গেছে। রেডিওতে পুরনো একটা গান বাজছে, মাঝেমধ্যে সিগন্যাল কেটে গিয়ে শব্দ ভেঙে যাচ্ছে। এই সাধারণ শব্দগুলো একসময় রাফির কাছে খুব বিরক্তিকর লাগত। এখন এই শব্দগুলোই তার কাছে নিরাপত্তা। কারণ সে জানে, মানুষ যখন ভয় পেতে পেতে বাঁচে, তখন সবচেয়ে সাধারণ জিনিসগুলোই আশ্রয় হয়ে ওঠে। নীলা রান্নাঘর থেকে বলল, “শুভ্র, দেরি করো না।” তারপর একটু থেমে আবার বলল, “রাফি, কাগজটা পড়ে থাকলে চা ঠান্ডা হইয়া যাবে।” রাফি খবরের কাগজের দিকে তাকাল। পাতা খোলা, কিন্তু সে অনেকক্ষণ ধরেই একই জায়গায় চোখ রেখে বসে আছে। সে পড়ছে না। তার মাথার ভেতর এখনও কিছু শব্দ আটকে আছে। “ইন্টারনাল ইনভেস্টিগেশন।” “সাসপেনশন।” “কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট।” এই শব্দগুলো গত কয়েক মাসে তার ঘুমের ভেতর ঢুকে গেছে। রাতে ঘুমাতে গেলেও মনে হতো কেউ দরজায় কড়া নাড়বে। কেউ এসে বলবে—সব শেষ। চাকরি শেষ। সম্মান শেষ। সংসার শেষ। মাঝে মাঝে সে ঘুম থেকে উঠে নিজের বুকের ওপর হাত রাখত, শুধু এটা বোঝার জন্য যে সে এখনও এখানে আছে কিনা। রকিকে ধরা হয়েছিল শেষ পর্যন্ত। কিন্তু সেটা সিনেমার মতো দ্রুত কিছু ছিল না। সেখানে কোনো হিরোইজম ছিল না, কোনো নাটকীয় বন্দুকযুদ্ধও না। ছিল শুধু লম্বা ক্লান্তিকর ভয়। একটার পর একটা রাত। অচেনা নম্বর। চুপচাপ অনুসরণ করা। পুলিশের সাথে গোপনে দেখা করা। ব্যাংকের কিছু ফাইল কপি করা। সন্দেহজনক লেনদেনের রিপোর্ট পাঠানো। রাফি যখন প্রথমবার বাপ্পির হাতে সেই পেনড্রাইভটা দিয়েছিল, তখন তার হাত এত কাঁপছিল যে পেনড্রাইভটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। বাপ্পি শুধু বলেছিল, “এখন পিছে ফিরার রাস্তা নাই।” সেই রাতে বাড়ি ফিরে শুভ্রকে ঘুমাতে দেখেছিল রাফি। ছেলেটা ঘুমের মধ্যে নাক ডাকছিল হালকা করে। নীলা তার পাশে শুয়ে ছিল। অন্ধকারে তাদের দেখে রাফির মনে হয়েছিল—সে যেন একটা কাঁচের ঘর নিয়ে হাঁটছে। বাইরে আগুন। আর একটু ভুল হলেই সব ভেঙে যাবে। সেই রাতেই সে প্রথমবার বুঝেছিল—মানুষ নিজের জন্য যতটা না বাঁচতে চায়, তার চেয়ে বেশি বাঁচতে চায় অন্যদের হারানোর ভয় থেকে। ইন্টারনাল ইনভেস্টিগেশনের দিনগুলো ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর। অফিসের করিডোরগুলো তখন তার কাছে আদালতের মতো লাগত। সহকর্মীদের চোখে সন্দেহ আছে কিনা, সেটা বোঝার চেষ্টা করত সে। কেউ স্বাভাবিকভাবে কথা বললেও তার মনে হতো—লোকটা সব জানে। একদিন তাকে আলাদা রুমে ডেকে বসানো হয়েছিল। টেবিলের ওপরে কয়েকটা প্রিন্টেড রিপোর্ট। ম্যানেজার চশমা খুলে বলেছিলেন, “আপনি কিছু জানেন?” এই “কিছু” শব্দটার ভেতর এত সম্ভাবনা ছিল যে রাফির বুক শুকিয়ে গিয়েছিল। সে বুঝতে পারছিল না কতটা বলবে, কতটা লুকাবে। কারণ সত্যি বললে সে নিজেও ডুবে যেতে পারে। আর মিথ্যা বললে আবার সেই পুরনো অন্ধকারে ফিরে যাবে। বাড়ি ফিরে সে অনেকক্ষণ বাথরুমে বসে ছিল। কল খুলে রেখেছিল যাতে কান্নার শব্দ বাইরে না যায়। আয়নায় নিজের মুখ দেখে তার মনে হয়েছিল—এই মানুষটাকে সে চেনে না। চোখের নিচে কালি, দাড়ি না কাটা, ঠোঁট শুকনো। মনে হচ্ছিল কেউ তার ভেতর থেকে একটু একটু করে রক্ত বের করে নিয়েছে। তখন দরজার বাইরে নীলা খুব আস্তে বলেছিল, “রাফি?” শুধু নামটা। তবুও সেই ডাকের ভেতর এমন কিছু ছিল, যেটা তাকে আবার বাইরে আসতে বাধ্য করেছিল। এক রাতে নীলা ঘুম থেকে উঠে দেখেছিল বারান্দায় আলো জ্বলছে। শীতের রাত। বাতাসে হালকা কুয়াশা। রাফি চেয়ারে বসে ছিল। তার হাতে সিগারেট নেই, ফোন নেই, কিছুই নেই। শুধু বসে আছে। এমনভাবে বসে, যেন সে নিজের ভেতরের শব্দ শুনছে। নীলা ধীরে গিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিল। অনেকক্ষণ কেউ কিছু বলেনি। নিচে রাস্তার কুকুর ডাকছিল। দূরে কোথাও ট্রেনের শব্দ ভেসে আসছিল। তারপর রাফি খুব আস্তে বলেছিল, “আমি যদি চাকরিটা হারাই?” কথাটা বলার সময় তার গলায় এমন এক ভয় ছিল, যেটা নীলা আগে খুব কম শুনেছে। এটা শুধু টাকার ভয় না। এটা একজন মানুষের নিজের প্রয়োজনীয়তা হারানোর ভয়। সে ভয় পাচ্ছিল—চাকরি গেলে হয়তো নীলা তার দিকে আগের মতো তাকাবে না। শুভ্র হয়তো কলেজে শুনবে—তার বাবা খারাপ মানুষ। সমাজ মানুষকে যতটা না অপরাধ দিয়ে মাপে, তার চেয়ে বেশি মাপে ব্যর্থতা দিয়ে। নীলা তার পাশে বসে খুব আস্তে হাত ধরেছিল। খুব শক্ত করে না। শুধু এমনভাবে, যেন কাউকে ডুবে যাওয়ার সময় ছুঁয়ে দেখে—এখনও মানুষটা আছে কিনা। তারপর বলেছিল, “চাকরি গেলে আবার শুরু করবা। কিন্তু যদি আবার মিথ্যা বলো… তখন হয়তো আর কিছু থাকবে না।” কথাটা খুব শান্ত ছিল। কিন্তু সেই শান্তির ভেতর একটা সীমা ছিল। একটা শেষ সতর্কতা। সেই রাতের পর থেকে রাফি বদলাতে শুরু করেছিল। পুরোপুরি না। মানুষ একদিনে বদলায় না। কিন্তু সে প্রথমবার নিজের ভয় নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছিল। আগে সে সবকিছু লুকিয়ে রাখত। পুরুষদের একটা অদ্ভুত শিক্ষা দেওয়া হয়—চুপ থাকো, সব একা সামলাও। কিন্তু সেই চুপ থাকা একসময় মানুষকে ভেতর থেকে পচিয়ে দেয়। এখন মাঝেমধ্যে রাতে সে নিজেই নীলাকে বলে, “আজকে আবার ওইসব মনে পড়তেছিল।” অথবা “আজ অফিসে একটা কল আসছিল, বুক ধক কইরা উঠছিল।” নীলা শোনে। সবসময় উত্তর দেয় না। কিন্তু শোনে। আর কখনো কখনো শুধু শোনা জিনিসটাই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। একদিন শুভ্র কলেজে রচনা লিখেছিল—“আমার পরিবার।” সে লিখেছিল, “আমার আব্বু আগে খুব চুপচাপ ছিল। এখন বেশি হাসে।” লাইনটা পড়ে রাফি অনেকক্ষণ কিছু বলতে পারেনি। তারপর সে বাথরুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করেছিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল। খুব শব্দ করে না। শুধু চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল। কারণ কিছু কান্না মানুষ সন্তানের সামনে কাঁদতে পারে না। তবুও সেই কান্নার ভেতর একটা স্বস্তি ছিল। যেন সে অনেকদিন পর নিজের ভেতরের জমে থাকা কিছু বের হতে দিচ্ছে। কিন্তু সব ঠিক হয়ে যায়নি। কিছু ভয় থেকে গেছে। এখনও যদি রাতের বেলা অচেনা নম্বর থেকে ফোন আসে, নীলার বুক ধক করে ওঠে। এখনও রাফি মাঝে মাঝে হঠাৎ চুপ হয়ে যায়। একদিন বাজার থেকে ফিরতে একটু দেরি হয়েছিল তার। ফোন ধরেনি। নীলা তখন রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে কাঁপছিল। তার মাথায় সবচেয়ে আগে কী এসেছিল জানে? পুলিশ। দুর্ঘটনা। অথবা রকি পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই কেউ প্রতিশোধ নিয়েছে। রাফি ফিরে এসে দেখেছিল নীলা খুব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে। কিন্তু তার হাত কাঁপছে। তখন সে প্রথমবার বুঝেছিল—তার অতীত শুধু তাকে না, পুরো পরিবারকে অসুস্থ করে দিয়েছে। সেই রাতেই সে নীলাকে বলেছিল, “আমি জানি না সব ঠিক করতে পারব কিনা।” নীলা তখন অনেকক্ষণ চুপ ছিল। তারপর বলেছিল, “সব ঠিক করতে হবে না। শুধু আবার ভাঙবা না।” এই লাইনটা রাফির মাথায় আটকে গিয়েছিল। কারণ মানুষ আসলে পুরোপুরি সুস্থ হয় না। শুধু শেখে কোথায় ভাঙলে আবার জোড়া লাগানো যায়। শীত আরও নেমে এলো ধীরে ধীরে। একদিন সন্ধ্যায় লোডশেডিং হলো। পুরো ফ্ল্যাট অন্ধকার। জানালার বাইরে অন্য বিল্ডিংগুলোর কিছু কিছু আলো জ্বলছে। দূরে কোথাও জেনারেটরের শব্দ। শুভ্র অনেক আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে। তার কম্বলের ভেতর থেকে শুধু মাথাটা দেখা যাচ্ছে। নীলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। ঠান্ডা বাতাসে তার চুল একটু উড়ছিল। রাফি এসে পাশে দাঁড়াল। অন্ধকারে মানুষের মুখ পুরো দেখা যায় না। শুধু উপস্থিতি বোঝা যায়। অনেকক্ষণ কেউ কিছু বলল না। তারপর রাফি খুব আস্তে বলল, “তুমি কি এখনও ভয় পাও?” প্রশ্নটা করার সময় তার নিজের গলাও কেঁপে উঠছিল। কারণ সে উত্তরটা জানত। তবুও শুনতে চাচ্ছিল। নীলা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। দূরে কুকুর ডাকছিল। পাশের ফ্ল্যাটে কেউ মোমবাতি জ্বালিয়েছে, সেই আলো হালকা এসে পড়ছে। তারপর নীলা বলল, “হুম।” একটা ছোট্ট শব্দ। কিন্তু সেই শব্দের ভেতর এত সত্যি ছিল যে রাফির বুক কেঁপে উঠল। নীলা আবার বলল, “কিন্তু ভয় পাওয়ার পরও পাশে থাকা যায়।” কথাটা শুনে রাফির মনে হলো—এই লাইন সে আগে কোথাও শুনেছে। তারপর মনে পড়ল—শিউলি একদিন সাইফকে একই কথা বলেছিল। তখন সে বুঝল, মানুষ আসলে একে অপরের কাছ থেকে ভালোবাসার ভাষা ধার করে বাঁচে। কেউ পুরো নতুন কিছু বলতে পারে না। শুধু পুরনো সত্যিগুলো নতুন মানুষের মুখে আবার জন্ম নেয়। রাফি ধীরে নীলার দিকে তাকাল। অন্ধকারে তার চোখ পুরো দেখা যাচ্ছিল না। তবুও সে বুঝতে পারছিল—সন্দেহ পুরো শেষ হয়নি। ভয়ও না। কিন্তু তবুও এই মানুষটা এখনও পাশে দাঁড়িয়ে আছে। এই দাঁড়িয়ে থাকাটাই ভালোবাসা। সবকিছু জেনে, সব ভয় নিয়েও থেকে যাওয়া। সে খুব আস্তে নীলার হাত ধরল। হাত ঠান্ডা ছিল। কিন্তু সেই ঠান্ডার ভেতরেও জীবন ছিল। দূরে কোথাও আবার বিদ্যুৎ এলো। কয়েকটা বিল্ডিং একসাথে আলোয় ভরে উঠল। তাদের ঘর এখনও অন্ধকার। তবুও সেই অন্ধকার আগের মতো ভয়ঙ্কর লাগছিল না। কারণ এবার তারা দুজন একই দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর অনেক সময় মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এটুকুই যথেষ্ট। রকিকে ধরার পর পাড়া কয়েকদিন যেন নিজের শব্দ হারিয়ে ফেলেছিল। যে গলিটা আগে রাত দুটাতেও মোটরসাইকেলের শব্দে কাঁপত, যেখানে চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছেলেরা সিগারেটের ধোঁয়ার ভেতর রাজনীতি, মারামারি আর টাকার গল্প করত, সেই গলিতে এখন সন্ধ্যা নামলেই শাটার পড়ে যায়। দোকানিরা আগের মতো জোরে ডাকাডাকি করে না। চায়ের কাপে চামচ নেড়ে শব্দ করতেও মানুষ যেন ভয় পায়। রাস্তার কুকুরগুলো পর্যন্ত অস্বাভাবিক চুপ হয়ে গেছে, যেন তারাও বুঝে গেছে—এলাকার বাতাস বদলে গেছে। মানুষ সরাসরি কিছু বলে না, কিন্তু ফিসফিস করে। কারও মুখে নাম আসে না, কিন্তু সবাই জানে কার কথা হচ্ছে। “ওই রাতটার” কথা এখন একটা ছায়ার মতো ছড়িয়ে আছে পুরো এলাকায়। কেউ বলে রকিকে ধরাটা ছিল সময়ের ব্যাপার। কেউ বলে—না, এত সহজ না, বড় কেউ পেছনে ছিল। আর এইসব কথার মাঝখানে রাফির বুকের ভেতর প্রতিদিন নতুন একটা ভয় জন্ম নিতে থাকে। কারণ সে জানে, রকি ধরা পড়লেও রকির তৈরি ভয় পুরোপুরি মরে যায় না। ভয় কখনো একজন মানুষের মধ্যে থাকে না; সেটা ছড়িয়ে যায় মানুষের স্মৃতিতে, মানুষের চোখে, মানুষের অভ্যাসে। রাতে বাসায় ফিরতে ফিরতে রাফির এখনো মনে হয় কেউ তাকে অনুসরণ করছে। লিফটের আয়নায় নিজের পেছনে কাউকে না দেখলেও সে কয়েকবার ঘুরে তাকায়। বাসার সামনে দাঁড়িয়ে দরজায় নক করার আগে তার বুক ধকধক করে—যদি কোনোদিন দরজা না খুলে? যদি কোনোদিন নীলা আর শুভ্রকে নিরাপদ না পায়? এই ভয়গুলো সে কাউকে বলে না। কারণ কিছু ভয় মুখে আনলে আরও বাস্তব হয়ে যায়। বাপ্পির ভেতরেও শান্তি আসেনি। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে—সে জিতে গেছে। রকির মতো একজন মানুষকে নামানো সহজ না। পুলিশ যেটা বছরের পর বছর পারেনি, সেটা শেষ পর্যন্ত সম্ভব হয়েছে। কিন্তু বিজয়ের পরও মানুষের ভেতর সবসময় আলো নামে না। কখনো কখনো যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরই মানুষ বুঝতে পারে, তার ভেতরে কতটা ধ্বংস হয়ে গেছে। বাপ্পি এখন আগের চেয়ে কম কথা বলে। পাড়ার ছেলেরা সামনে পড়লে এখনও সম্মান নিয়ে দাঁড়ায়, “বাপ্পি ভাই” বলে, কিন্তু সে আগের মতো হেসে পিঠ চাপড়ে দেয় না। তার চোখে এখন অদ্ভুত এক শূন্যতা। যেন সে প্রতিটা মানুষের মুখের পেছনে আরেকটা মুখ দেখতে পায়। সে জানে, রকি শুধু একজন অপরাধী না। সে একটা পথ ছিল, যেই পথে একবার নামলে মানুষ নিজের ভেতরকার অন্ধকারকে স্বাভাবিক ভাবতে শুরু করে। রকির জায়গায় কাল অন্য কেউ আসবে। অন্য নামে, অন্য চেহারায়। কারণ ভয় কখনো খালি থাকে না। আর এই উপলব্ধিটা বাপ্পিকে ভেতর থেকে ক্লান্ত করে ফেলেছে। রাতে বাসায় ফিরে মমতা যখন জিজ্ঞেস করে, “খাবা দিব?” তখনও সে কিছুক্ষণ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। যেন বাসার ভেতরে ঢুকতে গেলেও তাকে নিজের শরীরটাকে টেনে আনতে হয়। কখনো কখনো সে আয়নায় নিজের মুখ দেখে ভয় পায়। কারণ তার চোখের নিচের ক্লান্তি এখন রহিম চাচার চোখের মতো হয়ে গেছে—যে মানুষটা একসময় সারারাত দোকানে বসে গল্প করত, আর এখন হাসপাতালের সাদা বিছানায় শুয়ে নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট পায়। রহিম চাচাকে দেখতে গেলে বাপ্পির বুকের ভেতর অদ্ভুত ভার জমে। হাসপাতালের করিডোরে সেই চেনা গন্ধ—ডেটল, ওষুধ, ঘাম, আর অসহায়তার মিশ্রণ। সাদা দেয়ালের দিকে তাকালে মনে হয় এখানে মানুষ ধীরে ধীরে নিজের শক্তি জমা দিয়ে যায়। রহিম চাচাকে প্রথম যেদিন অক্সিজেন মাস্কে দেখেছিল, বাপ্পির বুকের ভেতর হঠাৎ অপরাধবোধ উঠেছিল। কারণ তার মনে হয়েছিল—এই মানুষটার দোকানের সামনেই তো তাদের বড় হওয়া। সেই দোকানের বেঞ্চে বসেই প্রথম সিগারেট খাওয়া, প্রথম মারামারির পরিকল্পনা, প্রথম রাত জাগা। আর এখন সেই মানুষটা হাত তুলতেও কষ্ট পাচ্ছে। রহিম চাচার হাত আগের মতো মোটা আর শক্ত না। চামড়া কুঁচকে গেছে, শিরা বের হয়ে এসেছে। একদিন তিনি খুব কষ্টে চোখ খুলে বাপ্পির দিকে তাকিয়েছিলেন। সেই চোখে আগের মতো কঠোরতা ছিল না। ছিল শুধু ক্লান্তি। “তুই ক্লান্ত না?” তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন। খুব সাধারণ একটা প্রশ্ন। কিন্তু বাপ্পি উত্তর দিতে পারেনি। কারণ সে সত্যিই ক্লান্ত। জেল খাটতে খাটতে, রাতের পর রাত পালাতে পালাতে, মানুষ মরতে দেখতে দেখতে তার ভেতরের বয়স শরীরের বয়সের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে গেছে। কখনো কখনো তার মনে হয়, সে যদি এখন ঘুমিয়ে পড়ে, তাহলে হয়তো আর উঠতে চাইবে না। এই সময়গুলোতে মমতা এখনও তার পাশে থাকে। কিন্তু সেই পাশে থাকাটার ভেতরেও এখন ভয় মিশে গেছে। আগে মমতা রাগ করত, ঝগড়া করত, কাঁদত। এখন সে অনেক শান্ত। আর এই শান্তিটাই বাপ্পিকে আরও বেশি ভয় দেখায়। কারণ মানুষ যখন চিৎকার করা ছেড়ে দেয়, তখন বুঝতে হয় সে ভেতরে ভেতরে ক্লান্ত হয়ে গেছে। মমতা এখন মাঝরাতে উঠে দরজা চেক করে। বাপ্পি বাসায় ফিরতে দেরি করলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে। ফোন ধরতে দেরি হলেই তার হাত ঠান্ডা হয়ে যায়। এক রাতে বৃষ্টি হচ্ছিল। বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল। মোমবাতির আলোয় ঘরটা আধা অন্ধকার। মমতা হঠাৎ বলেছিল, “তুমি যদি একদিন না ফিরো?” প্রশ্নটা করার সময় তার গলা কাঁপছিল না। কিন্তু চোখের ভেতর জমে থাকা ভয়টা স্পষ্ট ছিল। বাপ্পি প্রথমে হেসেছিল। খুব ছোট্ট একটা হাসি। তারপর নিচু গলায় বলেছিল, “আমি তো অনেক আগেই হারাইছি।” এই কথাটা শুনে মমতার বুক ভেঙে গিয়েছিল। কারণ সে বুঝেছিল—এই মানুষটা নিজের জীবনের দাম ধীরে ধীরে কমিয়ে ফেলেছে। আর যেদিন মানুষ নিজের জীবনের দাম কমিয়ে ফেলে, সেদিন সে মৃত্যুকেও ভয় পায় না। মমতা সেদিন কেঁদেছিল। খুব চুপচাপ। যেন কান্নার শব্দ করলেও মানুষটা ভেঙে যাবে। সেদিন রাতে, যেদিন সব শেষ হয়ে গেল, শহরে ভারী বৃষ্টি হচ্ছিল। রাস্তার ওপর স্ট্রিটলাইটের আলো কাঁপছিল, যেন পানির ভেতর কেউ আগুন ধরে রেখেছে। বাপ্পি একা মোটরসাইকেল চালিয়ে ফিরছিল। তার জ্যাকেট ভিজে গেছে। হেলমেটের কাচে পানি জমে রাস্তা ঝাপসা লাগছিল। ফোনে তখনও মমতার তিনটা মিসড কল। সে দেখেছিল। কিন্তু থামেনি। কারণ তার মাথার ভেতর সেই পুরনো ক্লান্তি আবার ঘুরছিল। কখনো কখনো মানুষ বাসায় ফিরতে দেরি করে শুধু এই কারণে যে, বাসায় ফিরলে তাকে বেঁচে থাকার অভিনয় করতে হবে। রাস্তার মোড়ে একটা কালো মাইক্রোবাস দাঁড়িয়ে ছিল। খুব সাধারণ দৃশ্য। শহরে প্রতিদিন এমন গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু কিছু দৃশ্যের ভেতরে মৃত্যু লুকিয়ে থাকে। প্রথম গুলির শব্দটা বাপ্পি ঠিকমতো শুনতেই পারেনি। শুধু বুকের ভেতর প্রচণ্ড একটা ধাক্কা অনুভব করেছিল। তারপর দ্বিতীয়টা। তৃতীয়টা। চতুর্থটা। মোটরসাইকেলটা পিছলে রাস্তার ওপর পড়ে গেল। ভেজা রাস্তায় তার রক্ত পানির সাথে মিশে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে যাচ্ছিল। আকাশ থেকে বৃষ্টি পড়ছিল। যেন শহরটা তার রক্ত ধুয়ে ফেলতে চাইছে। পরদিন খুব সকালে পুরো পাড়া জেগে উঠেছিল। মানুষের ভিড়। ফিসফিসানি। মোবাইল ফোনে ছবি। কেউ বলছিল পুরনো শত্রু। কেউ বলছিল রকির বাকি লোকজন। কেউ বলছিল—“এটাই হওয়ার ছিল।” মানুষ মৃত্যুর পর খুব সহজে গল্প বানিয়ে ফেলে। যেন গল্প বানালে ভয়টা কম লাগে। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছে মমতা কোনো গল্প শোনেনি। সে শুধু সাদা চাদরের নিচে বাপ্পির মুখ দেখেছিল। অদ্ভুত শান্ত লাগছিল তাকে। যেন বহুদিন পর সে সত্যি ঘুমিয়েছে। মমতা হাত বাড়িয়ে খুব আস্তে তার গাল ছুঁয়েছিল। ঠান্ডা। সম্পূর্ণ ঠান্ডা। তখন তার হঠাৎ মনে হয়েছিল—এই মানুষটা কোনোদিন ঠিকভাবে বাঁচতেই শিখল না। সে শুধু লড়াই করতে শিখেছিল। ভালোবাসতেও শিখেছিল ভুলভাবে। এত শক্ত করে ভালোবাসত যে শেষ পর্যন্ত সবকিছু ভেঙে যেত। মমতা তখন কাঁদেনি। কারণ কিছু শোক আছে যেগুলো এত গভীর হয় যে চোখে পানি আসে না। শুধু বুকের ভেতর একটা ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়, যেটা সারাজীবন থেকে যায়। বাপ্পির মৃত্যুর খবর শুনে রাফি দীর্ঘসময় চুপ হয়ে ছিল। সে অফিসে ছিল তখন। ফোনটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার মাথার ভেতর একটার পর একটা স্মৃতি ঘুরছিল। ছোটবেলার গলি। বাপ্পির চিৎকার। মারামারির পর রক্তমাখা শার্ট। আবার সেই একই মানুষ রাতের শেষে তাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে বলছে—“খালাম্মারে কিছু কইস না।” মানুষ কখনো পুরো খারাপ হয় না। আবার পুরো ভালোও না। বাপ্পির কথা ভাবতে গিয়ে রাফির বুকের ভেতর অদ্ভুত অপরাধবোধ উঠল। কারণ শেষ পর্যন্ত বেঁচে গেছে সে। আর বাপ্পি পারেনি। বাসায় ফিরে সে শুভ্রকে ঘুমাতে দেখেছিল। বাচ্চাটা পাশ ফিরে শুয়ে আছে, হাতের মুঠোয় খেলনা গাড়ি। নীলা এসে খুব আস্তে জিজ্ঞেস করেছিল, “খবর পাইছ?” রাফি শুধু মাথা নেড়েছিল। তারপর অনেকক্ষণ শুভ্রের পাশে বসে ছিল। তার মনে হচ্ছিল—এই ছোট্ট জীবনের জন্যই তাকে যেকোনো অন্ধকার থেকে দূরে থাকতে হবে। কারণ একটা ভুল শুধু একজন মানুষকে না, পুরো পরিবারকে টেনে নিয়ে ডুবে যায়। অনেক পরে, পাড়ার ছেলেরা এখনও মাঝে মাঝে বাপ্পির কথা বলে। চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে কেউ বলে, “বাপ্পি ভাই ওইদিন একা পাঁচজনের সামনে দাঁড়াইছিল।” কেউ বলে, “বাপ্পি ভাই না থাকলে রকি আরও আগেই পুরো এলাকা খাইয়া ফেলত।” গল্পগুলো বদলায়। বাড়ে। মানুষ ধীরে ধীরে কিংবদন্তি হয়ে যায়। কিন্তু কিংবদন্তির ভেতর মানুষের আসল ক্লান্তি থাকে না। তার ভয় থাকে না। তার রাতের নিঃসঙ্গতা থাকে না। মমতার কাছে বাপ্পি কোনো গল্প না। কোনো হিরো না। সে শুধু একটা মানুষ, যে খুব ভুলভাবে ভালোবাসতে শিখেছিল। আর রাফির কাছে বাপ্পি একটা সতর্কতা। একটা আয়না। সে মাঝে মাঝে রাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভাবে—যদি সেদিন সে অন্য সিদ্ধান্ত নিত? যদি রকির পাশে দাঁড়িয়ে যেত? তাহলে হয়তো আজ শুভ্রের ঘরে আলো জ্বলত না। নীলা তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকত না। মানুষের জীবন আসলে খুব পাতলা সুতোয় ঝুলে থাকে। একটা ভুল ফোনকল। একটা ভুল বন্ধুত্ব। একটা ভুল রাত। আর সবকিছু বদলে যায়। সাত মাস পর, বাসার ভেতরের সময়টা আর আগের মতো চলে না। এখন সময় ঘড়ি দেখে না—মেহর দেখে। সে কখন কাঁদবে, কখন ঘুমাবে, কখন হঠাৎ মাঝরাতে বুকভরা চিৎকারে পুরো ঘর কাঁপিয়ে তুলবে, তার ওপরই যেন পুরো সংসারের শ্বাসপ্রশ্বাস নির্ভর করে। ভোর পাঁচটায় কখনো তার কান্নায় ঘুম ভাঙে, কখনো আবার রাত তিনটায় ছোট ছোট হাত ছুঁড়ে উঠে বসে সে। শিউলির এখন টানা ঘুম বলতে কিছু নেই। তার চোখের নিচে কালি পড়েছে, ঠোঁট শুকনো থাকে, চুল প্রায় সবসময় এলোমেলো খোঁপায় বাঁধা। তবুও তাকে অন্যরকম সুন্দর লাগে। এই সৌন্দর্য সাজের না, বিশ্রামের না—এটা টিকে থাকার সৌন্দর্য। একটা মানুষ যখন নিজের শরীর, নিজের ঘুম, নিজের সময় সবকিছু ধীরে ধীরে অন্য এক ছোট্ট জীবনের জন্য বিলিয়ে দেয়, তখন তার ভেতরে আলাদা একটা আলো জন্মায়। সাইফ মাঝেমধ্যে গভীর রাতে জেগে উঠে শুধু শিউলির দিকে তাকিয়ে থাকে। দেখে—মেয়েটা আধা ঘুমের ভেতরেও মেহরকে বুকের কাছে টেনে রাখে, যেন পৃথিবীর সব ভয় থেকে ওকে আড়াল করতে চায়। তার বুকের ভেতর তখন অদ্ভুত কষ্ট হয়। কারণ সে জানে, শিউলি শুধু মা হওয়ার লড়াই করছে না। সে নিজের সংসারটাকেও বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। আর সেই লড়াইয়ের একটা অংশের নাম—আদিরা। মেহর আসার পর বাসার ভেতর দুধের গন্ধ স্থায়ী হয়ে গেছে। বিছানার কোণায় ছোট ছোট জামা, ড্রেসিং টেবিলের ওপর বেবি অয়েল, সোফার পাশে ঝুলে থাকা নরম গোলাপি কম্বল। রান্নাঘরে আগের মতো শুধু রান্নার শব্দ হয় না; এখন মাঝেমধ্যে শিশুর কান্না, হাসি, কাশির ছোট্ট শব্দ সবকিছু মিশে থাকে। সাইফ সত্যি চেষ্টা করছে। খুব অদ্ভুতভাবে চেষ্টা করছে। আগে যে মানুষটা নিজের ভেতরের অনুভূতিগুলো নিয়েই গুছিয়ে উঠতে পারত না, সে এখন ইউটিউব দেখে ডায়াপার পাল্টানো শেখে। মাঝরাতে মেহর কাঁদলে শিউলির আগে উঠে কোলে নেয়। ছোট্ট শরীরটাকে বুকে চেপে ঘরের ভেতর হাঁটে। কখনো কখনো ক্লান্তিতে তার নিজের চোখ বন্ধ হয়ে আসে, তবুও হাঁটে। শিউলি ঘুমিয়ে পড়লে খুব আস্তে তার গায়ের ওপর কম্বল টেনে দেয়। সকালে অফিসে যাওয়ার আগে মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে যায়। বাইরে থেকে দেখলে একটা সুন্দর, স্বাভাবিক পরিবার। কিন্তু সুখের ভেতরেও কখনো কখনো খুব সূক্ষ্ম ফাটল থাকে। বাইরে থেকে দেখা যায় না। শুধু ভেতরের মানুষ টের পায়। শিউলি সেই ফাটলটা টের পায়। কারণ সে বুঝতে পারে—সাইফ চেষ্টা করছে ঠিকই, কিন্তু কিছু জায়গায় সে এখনও পুরোপুরি পৌঁছাতে পারেনি। যেন তার একটা অংশ এখনও কোথাও আটকে আছে। আর সেই “কোথাও”-এর একটা নাম আছে—আদিরা। প্রথম প্রথম শিউলি নিজেকে বোঝাত, সে বেশি ভাবছে। একটা মেয়ে তার মৃত বোনের প্রেমিকের খোঁজ নিতেই পারে। তার উপর তারা ফ্যামেলি ফ্রেন্ড। এতে অস্বাভাবিক কিছু নেই। কিন্তু ধীরে ধীরে ছোট ছোট জিনিস বদলাতে শুরু করল। আদিরা এখন প্রায়ই আসে। কখনো মেহরের জন্য খেলনা নিয়ে, কখনো ছোট জামা, কখনো বেবি লোশন। সে খুব যত্ন করে মেহরকে কোলে নেয়। এমনভাবে তাকায়, যেন বাচ্চাটার ভেতর সে হারানো কিছু খুঁজে পায়। শিউলি লক্ষ্য করে—মেহর কাঁদলে আদিরা অদ্ভুত দ্রুত উঠে আসে। সাইফ যদি হাসে, আদিরার চোখে সেই হাসির প্রতিফলন পড়ে। কখনো কখনো সে সাইফের কথার আগেই বুঝে যায় সে কী চাইছে। এই বোঝাপড়াটা খুব পুরনো মানুষের মধ্যে হয়। শিউলির বুকের ভেতর তখন হালকা ঠান্ডা কিছু নড়ে ওঠে। কারণ সে জানে, ভালোবাসা সবসময় স্পষ্ট না। কখনো কখনো সেটা যত্নের ভেতর লুকায়, অভ্যাসের ভেতর লুকায়, কিংবা কারও প্রিয় চায়ের কাপ মনে রাখার ভেতরও লুকিয়ে থাকে। একদিন দুপুরে শিউলি ঘুমিয়ে ছিল। মেহর অনেকক্ষণ কাঁদার পর একটু আগে ঘুমিয়েছে। পুরো বাসা তখন অদ্ভুত নীরব। জানালার ফাঁক দিয়ে রোদ এসে বিছানার একপাশে পড়ছে। শিউলির শরীর এত ক্লান্ত ছিল যে চোখ বন্ধ করতেই ঘুম এসে গেছে। সেই সময় সাইফ বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। হাতে চায়ের কাপ। চা ঠান্ডা হয়ে গেছে। নিচে রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিল সে। তখন আদিরা এসে পাশে দাঁড়াল। সে প্রথমে কিছু বলল না। শুধু একই দিকে তাকিয়ে রইল। বাতাসে শ্যাম্পুর হালকা গন্ধ ছিল। দূরে কোথাও একটা ফেরিওয়ালা হাঁক দিচ্ছিল। অনেকক্ষণ পর আদিরা খুব আস্তে বলল, “আপনি সুখী?” প্রশ্নটা এত হঠাৎ ছিল যে সাইফ সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিতে পারেনি। সে শুধু তাকিয়ে রইল। আদিরা হালকা হাসল। সেই হাসিটা আনন্দের না। বরং এমন, যেন মানুষ নিজের ভেতরের কষ্ট লুকাতে গিয়ে হাসে। তারপর বলল, “সবচেয়ে খারাপ কী জানেন?” সাইফ চুপ। আদিরা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, “কারও জায়গা নিতে নিতে একসময় মানুষ নিজের জায়গাটাই হারিয়ে ফেলে।” কথাটা বলার সময় তার চোখে পানি ছিল না। কিন্তু এমন এক ক্লান্তি ছিল, যেটা কান্নার চেয়েও ভারী। সেই মুহূর্তে সাইফ প্রথমবার স্পষ্ট বুঝল—আদিরা শুধু আরিবার স্মৃতিকে ধরে নেই। সে নিজেও ডুবে গেছে। খুব ধীরে, খুব নিঃশব্দে। আর এই উপলব্ধিটা তাকে ভয় পাইয়ে দিল। কারণ সে জানে, মানুষের অনুভূতি সবসময় নৈতিক হয় না। কিছু টান আছে যেগুলো ভুল, তবুও সত্যি। সেই রাতে সে ঘুমাতে পারেনি। শিউলি পাশে ঘুমিয়ে। মেহর মাঝেমধ্যে ছোট ছোট শব্দ করছে। ঘরের অন্ধকারে সাইফের মনে হচ্ছিল, সে যেন দুই জীবনের মাঝখানে আটকে আছে। একদিকে বাস্তব—যেখানে একটা শিশু তার ওপর নির্ভর করে, একটা স্ত্রী প্রতিদিন নিজেকে ভেঙে সংসার গড়ে। অন্যদিকে অসমাপ্ত অনুভূতি—যেগুলো কখনো পুরোপুরি মরে না, শুধু রূপ বদলায়। সে নিজের মাথায় হাত চাপা দিয়ে বসে ছিল। তার মনে হচ্ছিল, সে যদি এখন কোনো ভুল করে, তাহলে শুধু একটা সম্পর্ক না—পুরো একটা পরিবার ভেঙে যাবে। মেহরের ভবিষ্যৎও সেই ভাঙনের মধ্যে বড় হবে। আর এই ভয়টাই তাকে আরও বেশি চুপচাপ করে দিল। শিউলি ধীরে ধীরে সব বুঝতে শুরু করল। কেউ তাকে কিছু বলেনি। তবুও সে বুঝল। কারণ একজন নারী যখন পরিবার হারানোর ভয় পায়, তখন তার চোখ অন্যরকম তীক্ষ্ণ হয়ে যায়। সে ছোট ছোট জিনিস খেয়াল করে। আদিরা এলে সাইফের চুপ হয়ে যাওয়া। কথার মাঝখানে থেমে যাওয়া। চোখ সরিয়ে নেওয়া। আবার আদিরার সেই অদ্ভুত দৃষ্টি—যেটা খুব বেশি সময় ধরে থাকে। যেন মানুষ কোনো হারানো ঘরকে আবার ছুঁয়ে দেখতে চাইছে। শিউলি প্রথমে নিজেকে বোঝাল—না, এগুলো তার মাথার ভ্রম। সন্তান হওয়ার পর মানুষ সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। কিন্তু যত সময় গেল, তত সে অনুভব করল—না, কিছু একটা সত্যিই বদলাচ্ছে। একদিন আদিরা মেহরকে কোলে নিয়ে বলছিল, “ওর চোখ একদম সাইফ ভাইয়ের মতো।” কথাটা খুব সাধারণ। তবুও শিউলির বুক হঠাৎ কেঁপে উঠেছিল। কারণ “সাইফ ভাই” বলার ভেতরেও অদ্ভুত কোমলতা ছিল। সেই রাতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শিউলি নিজেকে দেখছিল। চোখের নিচে কালি। শরীর বদলে গেছে। কাঁধে ঘুমন্ত মেহর। তার মনে হচ্ছিল, সে যেন ধীরে ধীরে নিজের জায়গাটা হারিয়ে ফেলছে। সাইফ পেছন থেকে এসে জিজ্ঞেস করেছিল, “কী ভাবছো?” শিউলি আয়নার ভেতর তার দিকে তাকিয়েছিল। অনেকক্ষণ। তারপর খুব আস্তে বলেছিল, “তুমি কি কখনো পুরোপুরি আমার হবে?” প্রশ্নটা শুনে সাইফের বুকের ভেতর ধক করে উঠেছিল। কারণ এই প্রশ্নের উত্তর সহজ না। আর সবচেয়ে ভয়ংকর সত্যি হলো—কিছু প্রশ্নের পুরো সৎ উত্তর মানুষ উচ্চারণ করতে পারে না। সে জানে, সে শিউলিকে ভালোবাসে। মেহরকে কোলে নিলে তার বুক নরম হয়ে যায়। বাসায় ফিরতে ইচ্ছে করে। কিন্তু একই সাথে সে এটাও জানে, আরিবার স্মৃতি এখনও তার ভেতরে বেঁচে আছে। আর এখন সেই স্মৃতির ছায়ার ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে আদিরা। সে কিছু বলতে পারেনি। শুধু শিউলির দিকে তাকিয়ে ছিল। আর এই নীরবতাই শিউলিকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিল। কারণ কখনো কখনো “না” শোনার চেয়েও খারাপ হলো—উত্তর না পাওয়া। এরপর থেকে শিউলি বদলে যেতে শুরু করল। খুব চুপচাপভাবে। আগে সে আদিরা এলে খুশি হতো। এখন অদ্ভুত অস্বস্তি লাগে। কিন্তু সে সেটা প্রকাশ করে না। বরং আরও ভদ্র হয়। আরও স্বাভাবিক। কারণ সে ভয় পায়—যদি সে সন্দেহপ্রবণ স্ত্রী হয়ে যায়? যদি সাইফ ভাবে, সে বাড়াবাড়ি করছে? কিন্তু ভেতরে ভেতরে তার মাথার মধ্যে ভয় জমতে থাকে। সে মাঝরাতে উঠে মেহরের পাশে বসে থাকে। বাচ্চাটার ছোট্ট হাত ধরে ভাবে—এই পরিবারটা কি সত্যিই নিরাপদ? একটা শিশুর জন্য সবচেয়ে দরকারি জিনিস কী? ভালোবাসা? নাকি স্থিরতা? সে নিজের শৈশবের কথা ভাবে। বাবার-মায়ের ঝগড়া। বন্ধ দরজার ওপাশের কান্না। সে চায় না মেহর সেই পরিবেশে বড় হোক। তাই সে আরও বেশি চুপ হয়ে যায়। কারণ অনেক নারী সংসার বাঁচানোর জন্য নিজের কষ্টকে ধীরে ধীরে অভ্যাস বানিয়ে ফেলে। আদিরাও নিজের ভেতরে বদলাচ্ছিল। সে জানে—এই অনুভূতি ভুল। তবুও থামাতে পারছে না। রাতে নিজের ঘরে ফিরে সে অপরাধবোধে ভোগে। আরিবার ছবি সামনে নিয়ে বসে থাকে। মাঝেমধ্যে ফিসফিস করে বলে, “আমি ইচ্ছা করে করি নাই আপু…” তারপর কাঁদে। কারণ সে জানে, মানুষ সবসময় খারাপ হয়ে খারাপ কিছু করে না। কখনো কখনো খুব একা হয়ে গেলেও ভুল জায়গায় হৃদয় আটকে যায়। সাইফ যখন মেহরকে কোলে নেয়, আদিরার বুকের ভেতর অদ্ভুত শূন্যতা হয়। তার মনে হয়, এই দৃশ্যটার ভেতরে সে থাকার কথা না। তবুও সে বারবার ফিরে আসে। যেন নিজের কষ্টটাকেই ছুঁয়ে দেখতে চায়। একদিন সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে জিজ্ঞেস করেছিল—“আমি কি আপুর জীবনটা চুরি করতে চাই?” প্রশ্নটার উত্তর সে দিতে পারেনি। কারণ তার অনুভূতির ভেতরে ভালোবাসাও আছে, লজ্জাও আছে, আর ভয়ও আছে। বৃষ্টির সেই সন্ধ্যাটা খুব ধীরে নেমে এসেছিল। আকাশ কালো। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ। আদিরা বাসার সামনে দাঁড়িয়ে। তার হাতে মেহরের জন্য কেনা ছোট্ট গোলাপি জামা। অনেকক্ষণ সে কলিংবেল চাপেনি। শুধু উপরের বারান্দার দিকে তাকিয়ে ছিল। সেখানে শিউলি দাঁড়িয়ে। তার কোলে মেহর। বাচ্চাটা আধা ঘুমে মাথা কাঁধে রেখে আছে। ভেতরে ঘরের আলো জ্বলছে। আর সেই আলোর ভেতরে সাইফের ছায়া দেখা যাচ্ছে। মুহূর্তটা খুব সাধারণ হতে পারত। কিন্তু হয়নি। কারণ তিনজন মানুষ একই সাথে বুঝে ফেলেছিল—তাদের সম্পর্ক আর সরল নেই। আদিরা মাথা তুলে তাকাল। শিউলির সাথে তার চোখাচোখি হলো। কেউ কিছু বলল না। তবুও হাজারটা কথা পেরিয়ে গেল। শিউলি সেই চোখে অপরাধবোধ দেখল। আবার টানও দেখল। আদিরা শিউলির চোখে ভয় দেখল। নিজের পরিবার হারানোর ভয়। আর সেই মুহূর্তে দুজনেই বুঝে গেল—এই গল্প এখনও শেষ হয়নি। কারণ কিছু ভালোবাসা শেষ হয় না। শুধু মানুষকে ধীরে ধীরে ভেঙে বদলে দেয়। (সমাপ্ত?)