মরীচিকা ও মোহময়ী - অধ্যায় ৬৯
ডান হাতের লম্বা আঙুল দুটো দিয়ে চেপে ধরা একটা ক্রিস্টালের ফ্লুট গ্লাস, ভেতরে চিল্ড স্পার্কলিং ওয়াইন। গাঢ় গোলাপি তরলে থেকে সূক্ষ্ম বুদ্বুদগুলো অবিরাম উপরে উঠে আসছে। ডান হাতের লম্বা আঙুল দুটো গ্লাসের ডাঁটিটা সে এমন শক্ত করে চেপে ধরেছে যে, নখগুলোর চারপাশ একদম রক্তশূন্য, ধবধবে সাদা দেখাচ্ছে।
বৈশালী আধবোজা চোখে কাঁচের ওপারে বহুদূরে আবছায়া হয়ে আসা সাউথ সিটি টাওয়ারের ঝাপসা রেখার দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু তার মন সেখানে নেই। তার পুরো শরীর জুড়ে তীব্র অস্বস্তি কাজ করছে।
প্রতিবার যখনই সে সিটে বসার চেষ্টা করছে কিংবা গাউনের পাতলা কাপড়টা তার কোমরের নিচের ত্বকে আলতো করে ঘষা খাচ্ছে, তখনই তার নিতম্ব জুড়ে তীব্র আগুনের ফুলকি জ্বলে উঠছে।
ঠাস! ঠাস!
সেদিনের ওই শব্দগুলো যেন এখনও এই নিস্তব্ধ বাতাসে প্রতিধ্বনি তুলছে। বৈশালী অনিচ্ছাসত্ত্বেও নিজের চোখ দুটো সজোরে বন্ধ করল।
গতকাল সকালের সেই দৃশ্য। ফাঁকা মাঠ, গ্যালারির ধাতব নেট। অয়নের হিংস্র, দয়ামায়াহীন চোখের চাউনি আর ওর ডেনিম শর্টসের ওপর সশব্দে আছড়ে পড়া হাতের এক একটা থাপ্পড়।
তার রেশমি গাউনের নিচে, নিটোল পাছার চামড়ায় জমে থাকা হালকা লালচে দাগগুলো দপদপ করছে। অয়নের হাতের ছাঁচটা যেন চিরকালের জন্য তার শরীরে খোদাই হয়ে গেছে।
বৈশালী গ্লাসে এক চুমুক দিল। ওয়াইনের তিতকুটে মিষ্টি স্বাদটা তার গলা দিয়ে নামতেই সে নিজের ডান হাতটা শক্ত করে মুঠো পাকালো, লম্বা আঙুলের নখগুলো বসে গিয়ে হাতের চেটোতে লাল দাগ বসে গেলো।
"ওয়াইনটা বেশ ভালো, কিন্তু তোর গেলার স্পিড দেখে মনে হচ্ছে, বাংলা খাচ্ছিস। একটু আস্তে, এত তাড়াতাড়ি মানুষ বিষও খায় না।"
খোঁচাটা শুনে বৈশালী ধীরগতিতে মাথা তুলে জিনিয়ার দিকে মুখ তুলে তাকাল। এক মুহূর্তের জন্য তার দৃষ্টিতে আগুনের ঝলক খেলে গেল।
বৈশালীর উল্টোদিকে পাতা নিচু লেদার কাউচের ওপর গা এলিয়ে বসেছে জিনিয়া আর একটা পা আলতো করে ছড়িয়ে দিয়েছে পাশে থাকা অটোম্যানটার ওপর।
জিনিয়ার পরনে একটা কাট-আউট ফিটেড ক্রপ-টপ আর থাই-হাই স্লিট দেওয়া কালো স্কার্ট। তার আঙুলের ফাঁকে সরু মেভিস স্মোক-সিগারেট থেকে নীলচে ধোঁয়ার রিং উঠছে। জিনিয়ার চোখ দুটো কুঁচকে আছে, তাতে গভীর পর্যবেক্ষণ আর একধরনের শয়তানি মেজাজ।
বৈশালী ফ্ল্যাট গলায় বলল,
"আমার জ্ঞান শুনতে ইচ্ছে করছে না জিনিয়া। তোর যদি ড্রিঙ্ক করা হয়ে গিয়েছিল থাকে, তা হলে চুপচাপ বসে থাক। নাহলে গেট ইজ দ্যাট ওয়ে। এমনিতেও আমাকে একটু পরে বেরোতে হবে। দেবমাল্য আমার জন্য পার্ক স্ট্রিটের ক্লাবে ওয়েট করবে।"
কথাটা শুনে জিনিয়ার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি খেলে গেল।
"ওহ, সেই ভোঁদরটা ? যে সবসময় তোর জুতো খোলার জন্য বসে থাকে?"
সে সিগারেটের ছাইটা টেবিলে রাখা ক্রিস্টালের অ্যাসট্রেতে ঝেড়ে শরীরটা একটু সামনের দিকে হেলিয়ে দিল।
জিনিয়ার চোখ দুটো সরু হয়ে এল।
"খুব চিল্লাচ্ছিস, তাই না? পরশুদিন যখন মাঠের গ্যালারির পেছন থেকে টলতে টলতে বেরিয়ে এলি, তখন তোর একটা ছবি তুলে রাখা উচিত ছিল।
সেদিন প্র্যাকটিস গ্রাউন্ডের গ্যালারির ফেন্সিংয়ের কাছে অতক্ষণ ধরে অয়ন তোকে নিউ ইয়ার্সের জন্য কী গিফট দিচ্ছিল সেটা একবার দেখাবি না?"
কথাটা শোনা মাত্রই বৈশালী সটান সোজা হয়ে বসল। গ্লাসের তরলটুকু এক ঝটকায় কার্পেটের ওপর ছিটকে পড়ল। তার মুখটা মুহূর্তের মধ্যে রক্তবর্ণ রূপ ধারণ করল।
"শাট আপ জিনিয়া! জাস্ট শাট আপ! তুই কাল থেকে যা তা বকে যাচ্ছিস! অয়ন আর আমার মধ্যে ঝগড়া হয়েছিল, দ্যাটস ইট! ও একটা বাস্টার্ড, একটা কালচারলেস গুন্ডা! ও আমাকে ম্যানহ্যান্ডেল করার চেষ্টা করেছিল আর সেজন্য আমি ওর গালে থাপ্পড় মেরেছি!"
"ওহ, রিয়্যালি?"
"তুই ওকে থাপ্পড় মেরেছিলি আর ও তোর থাপ্পড় খেয়ে চুপচাপ বসে ছিল। তুইও থাপ্পড় মেরে ওর সাথে পৌনে এক ঘন্টা ধরে বসে রইলি বল ?"
জিনিয়া আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। সে বৈশালীর একদম কাছে এসে, হাত বাড়িয়ে বৈশালীর গাউনের কাঁধের অংশটা সামান্য সরিয়ে দিল। বৈশালীর ফর্সা কলারবোনের পাশে, ঘাড়ের ওপর দুটো কালশিটে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বৈশালীর পুরো শরীর যেন এক অদৃশ্য বিদ্যুতের ঝটকায় আড়ষ্ট হয়ে গেল। শ্বাসের গতি দ্রুত হতে লাগল। সে চমকে উঠে গাউনটা টেনে ঢাকা দিতে গেল, কিন্তু জিনিয়া তার কবজিটা শক্ত করে ধরে ফেলল।
"আমাকে মিথ্যে বলবি বৈশালী? আমি তোর বেস্টফ্রেন্ড, তোর পুরো হিস্ট্রি আমার জানা।"
জিনিয়া বৈশালীর চোখের দিকে সরাসরি তাকাল।
"তোকে ওখানে রেখে মাঠের বাইরে যাবার পৌনে এক ঘন্টা পরে দেবমাল্য আমায় মেসেজ করেছিল, ও তোকে বারবার কল করে পায়নি। আমি ওকে বানিয়ে বানিয়ে গ্যারেজের গল্প দিয়ে বিষয়টা কভার করেছি। কী করছিলি তুই ?"
"জিনিয়া! তুই লিমিট ক্রস করছিস!"
বৈশালী গলার সবটুকু জোর দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল।
"তুই জানিস না কী হয়েছিল! ও আমাকে প্রভোক করেছিল! ও বলছিল আমি নাকি ইগোইস্টিক, ও নাকি আমার সাথে জাস্ট টাইম পাস করেছিল!"
তার চোখ দুটো দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ার উপক্রম।
"আর তুই?"
জিনিয়া ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করল,
"তুই কী করছিলি ?
তুই যখন মাঠ থেকে বেরিয়ে এলি, তখন তোর হাঁটার গতি স্বাভাবিক ছিল না। মেকআপটা পুরো ঘেঁটে গিয়েছিল, তোর নিচের ঠোঁটটা ফুলে লাল হয়ে উঠেছিল। তোর হাই-পনিটেলটা খোলা ছিল, চুলগুলো পেছনে জট পাকিয়ে গিয়েছিল আর তোর ডেনিম শর্টসের পেছনে যে লোহার মরচের ছাপ লেগেছিল, সেটা আমি দেখিনি ভাবছিস ? তুই কি গ্যালারির লোহা আঁকড়ে ধরে কঁকাচ্ছিলি, বৈশালী?"
বৈশালী এক লহমায় ভেঙে পড়ল। তার সমস্ত অহংকার, আভিজাত্যের দেয়াল এক মুহূর্তে ধসে মাটিতে মিশে গেল। সে দুই হাতে মুখ ঢেকে অটোম্যানের ওপর বসে পড়ল। তার পাতলা রেশমি গাউনটা একটু আলগা মেঝেতে হয়ে ছড়িয়ে পড়ল।
"ও একটা সাইকো জিনিয়া... ও একটা ব্লাডি অ্যানিমাল..." বৈশালীর গলা কাঁপছিল।
"আমি চেয়েছিলাম ওকে অপমান করতে। আমার অপমানের প্রতিশোধ নিতে ... কিন্তু, কিন্তু ...
বৈশালী মুখ তুলল। তার চোখে ভয়ার্ত ভাব। সে জোরে নিজের ঠোঁটখানা কামড়ে ধরল। চোখ দুটো জলে ভিজে উঠলেও সেখানে ভেঙে পড়ার কোন চিহ্ন ছিল না, তার বদলে মেয়েলি লজ্জা আর অবদমিত কামনার একটা মিশ্রণ কাজ করছিল।
"ও যখন আমাকে ওই লোহার জালে উল্টে ধরল... ওর বুকের চাপটা যখন আমার পিঠে এসে লাগল... জিনিয়া, আই সোয়ের, আমার মনে হয়েছিল আমি মরে যাব! কিন্তু... কিন্তু একই সাথে..."
জিনিয়া স্থির চোখে বৈশালীর দিকে তাকিয়ে রইল।
বৈশালীর শরীর তখনও এক অদ্ভুত অনূভূতির কাঁপনে শিউরে উঠছে।
"তোর শরীরের ভেতরের আগুনটা জ্বলে উঠেছিল, তাই তো?"
জিনিয়া ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিষাক্ত হাসি ঝুলিয়ে বলল।
বৈশালী নিজের ঠোঁটটা এত জোরে কামড়ে ধরল যে রক্তের স্বাদ পেল।
"আমার মনে হচ্ছিল যেন চামড়া চিরে আগুন বেরিয়ে আসছে ... আমি ... আমি চেয়েছিলাম ওকে থামাতে, ওর হাত দুটো চেপে ধরে চিৎকার করে বলতে যে আমি আর সহ্য করতে পারছি না, কিন্তু আমার গলা দিয়ে কোনো আওয়াজই বেরোচ্ছিল না; সব কথা আমার গলার কাছে এসে আটকে যাচ্ছিল। শুধু চোখ ফেটে জল আসছিল আর আমি মনে মনে ওর কাছে মিনতি করছিলাম যেন ও এবার থেমে যায়। কিন্তু ও থামেনি! মাথার চুল ধরে টেনে পেছনে এনে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, 'ইটস পানিশমেন্ট টাইম!'..."
"তুই বিশ্বাস করবি ?"
বৈশালী অস্ফুট স্বরে, প্রায় ফিসফিস করে বলল,
"প্রতিটা থাপ্পড়ের সাথে সাথে আমার তলপেট থেকে কেমন যেন একটা অদ্ভুত ফিলিংস উঠে আসছিল। পা দুটো কেমন অবশ হয়ে আসছিল...
আমার মনে হচ্ছিল... অয়ন যদি ওই মুহূর্তে আমায় ওই মাঠেই আমাকে শেষ করে ফেলে... তাহলেও আমি ওকে কোন বাধা দেব না..."
বৈশালী চুপ করে গেল।
জিনিয়া সোফায় হেলান দিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
অয়নের মতো ছেলেরা এরকমই হয় আর মেয়েরা সব জেনেশুনে বারবার এদের কাছে ফিরে গিয়ে নিজের জীবনটা নষ্ট করে।
সে বিরক্ত ভাবে বলে,
"তোর অয়নের সাথে ইনভলভড হওয়াটাই ভুল ছিল, বৈশালী।"
"শুরুটা কিন্তু এমন ছিল না..."
কথাটা বলে, বৈশালী ব্যালকনির দিকে চুপ করে তাকিয়ে রইল। তার দৃষ্টি ওদিকে থাকলেও মন ফিরে গেছে অতীতে।
পাঁচ মাস আগের কথা।
তখন সবে একমাস কলেজ শুরু হয়েছে। অয়ন চ্যাটার্জী তখন একজন শান্ত, চুপচাপ, কিন্তু প্রচণ্ড আকর্ষণীয় একজন স্টুডেন্ট।
বৈশালী ক্লাসের প্রথম দিন থেকেই অয়নকে খেয়াল করেছিল। অয়নের হ্যান্ডসাম ফেস, তার চালচলন, স্পোর্টসম্যান বডি আর সবচেয়ে বড় কথা, তার উদাসীনতা। অনেক মেয়ে ওর প্রতি অ্যাট্রাক্টেড ছিল কিন্তু সে মেয়েদের দিকে চোখ তুলে তাকাত না। ক্লাসে এসে চুপচাপ থাকত, কারোর সাথে বেশি কথা বলতো না।
তখন ওকে দেখে বৈশালীর মনে হতো শান্ত, গোছানো একটা স্টুডেন্ট। ওর উদাসীনতাকে মনে হতো কেয়ারলেসনেস।
দু-একজন মেয়ে অলরেডি ওকে ডেটে যাবার অফার দিয়েছে শুনে বৈশালী দেরি করেনি। ও ভেবেছিল অয়নের মতো শান্ত একটা ছেলেকে নিজের আঙুলের ডগায় নাচাতে অসুবিধা হবে না। ইচ্ছে হলে রাখবে, না হলে ছুঁড়ে ফেলে দেবে।
সেদিনও পার্ক স্ট্রিটের একটা ক্লাবে পার্টি ছিল। অয়ন অবশ্য ক্লাবিং পছন্দ করত না, কিন্তু ওর ফুটবল টিমের সিনিয়রদের চাপে নতুন রিক্রুটদের মতো ওকেও সেখানে বাকিদের মতো বাধ্য হয়ে যেতে হয়েছিল।
বৈশালী সেদিন একটা রেড ড্রেস পরেছিল। ক্লাবের ধোঁয়াটে আলো আর লাউড মিউজিকের মাঝে বৈশালী ইচ্ছে করেই অয়নের গায়ের ওপর গিয়ে পড়েছিল।
"ওহ, সরি! আমি খেয়াল করিনি..."
সে তার মোহময়ী হাসিটা ছড়িয়ে বলেছিল।
অয়ন ওকে ধরে সোজা করে দিয়েছিল। তার স্পর্শে শুধু সতর্কতা ছাড়া আর কিছু ছিল না।
"ইটস ওকে। সাবধানে হাঁটো।"
স্রেফ এটুকু বলে অয়ন আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছিল।
সেই ছুতো ধরে বৈশালী অয়নকে ড্রিংক অফার করেছিল। অয়ন ড্রিংক নেয়নি, স্রেফ ডায়েট কোক ধরে রেখেছিল। কিন্তু বৈশালী হাল ছাড়েনি। সে অয়নের পাশে বসে ক্রমাগত ফিসফিস করে কথা বলে গেছে, নিজের শরীরটাকে অয়নের বাহুর সাথে লেপ্টে রেখে দিয়েছিল।
পরের দু-সপ্তাহে তাদের পরিচয়টা সম্পর্কের দিকে মোড় নেয়। অয়ন তখন প্রচণ্ড অপরাধবোধে ভুগছে। নিজের মায়ের প্রতি নিষিদ্ধ আকর্ষণ তাকে তাড়িয়ে বেরাচ্ছে। সে বাড়ি যাওয়া বন্ধ করেছে। পড়াশোনার পাশাপাশি নিজেকে স্পোর্টসে ডুবিয়ে দিয়েছে।
ওই সময় অয়ন একটা আউটলেট খুঁজছিল। সে বৈশালীর সাথে ঘুরতে শুরু করে। ওরা ক্যাফেতে যেত, বৈশালীর গাড়িতে লং ড্রাইভে গেছে, রেস্টুরেন্টে গেছে, সিনেমা দেখেছে। চুমু খেয়েছে।
তারা শুধু আর কখনো ক্লাবে যায়নি, অয়ন ক্লাবিং পছন্দ করতো না।
বৈশালী যথেষ্ট অহংকারী মেয়ে, আর রাগীও। সে ভেবেছিল সহজেই অয়নকে নিজের মুঠোবন্দী করে ফেলবে। কিন্তু, অয়ন তো বৈশালীর প্রেমে পড়েনি।
সে বৈশালীর ডমিনেশন মানতে যাবে কেন ?
দুজনের মধ্যে ঝামেলা শুরু হল। ঝগড়া, কথা কাটাকাটি লেগেই থাকত। বৈশালী বুঝতে পারল অয়নকে বাইরে থেকে যতটা শান্তশিষ্ট মনে হয় আসলে সে তেমন নয়।
প্রজেক্ট ফেলিওর বুঝে তার সরে আসাটাই সঠিক হত। কিন্তু, তার ইগো তাকে বাধা দিল।
একদিন রাতে, যখন ডর্মে কেউ ছিল না, বৈশালী ওর কাছে এসে হাজির হয়। সে ভেবেছিল আজকে অয়নকে সহজেই ফাঁসানো যাবে। কিন্তু, অয়ন ওকে বিছানায় ফেলে রেখে সোজা বাথরুমে ঢুকে যায়।
দশ মিনিট পর বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে, সম্পূর্ণ ঠান্ডা গলায়, বৈশালীর দিকে না তাকিয়ে ওকে বলে
'তুমি বাড়ি চলে যাও বৈশালী। দিস ইজ নট ওয়ার্কিং। আই কান্ট ডু দিস টু ইউ।'..."
স্বভাবতই বৈশালী সেটা মেনে নেয়নি। রেগে গিয়ে সে চিৎকার করে উঠলে অয়ন তাকে ঘর থেকে ধাক্কা মেরে বের করে দেয়।
বৈশালীর হাতে ওর ড্রেস, পরনে ব্রা আর প্যান্টি।
এরপর অয়ন ওকে ইগনোর করা শুরু করে।তারপর থেকে বৈশালীর কোন ফোন ও তোলেনি, মেসেজের রিপ্লাই দেয়নি।
সেদিনের অপমানের জ্বালা বৈশালী আজ পর্যন্ত ভুলতে পারেনি। এই যন্ত্রণা তাকে রোজ রাতে কুরে কুরে খায়।
এরপর অয়ন অন্য মেয়েদের সাথে ক্যাজুয়ালি ঘুরতে শুরু করে, কিন্তু ওর দিকে আর ফিরে তাকায় নি। বৈশালী ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ালে অয়ন স্রেফ পাশ কাটিয়ে হেঁটে চলে যেত, এই সেদিনও সুরঙ্গনা ব্যানার্জীর ক্লাসে এমন বিহেভ করল যেন বৈশালী একটা হাওয়া, যার কোন অস্তিত্বই নেই।
বর্তমান
"কিরে, কী ভাবছিস ?"
জিনিয়ার গলার আওয়াজে বৈশালী বর্তমানে ফিরে এল।
ব্যালকনির ছায়া এখন আরো ঘন হয়ে এসেছে। সানসেটের শেষ লাল আভাটুকু মুছে গিয়ে রাতের নীলচে অন্ধকার নেমে এসেছে।
বৈশালী ওয়াইনের গ্লাসটা সশব্দে কাঁচের টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখল।
"ও আমাকে আবর্জনার মতো ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল জিনিয়া! ও আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে আমার কোনো ভ্যালু নেই! আমি অয়ন চ্যাটার্জীকে ঘৃণা করি! আই হেট হিম!"
"তুই ওকে ঘৃণা করিস না বৈশালী,"
জিনিয়া সোজা হয়ে বসে কড়া গলায় বলল।
"তুই ওর ওপর অবসেসড।"
"নোট অ্যাট অল!" বৈশালী গর্জে উঠল।
"তাহলে কাল মাঠে যখন ও তোকে মেটাল ফেন্সিংয়ে চেপে ধরল, তুই চিৎকার করে লোক ডাকলি না কেন?"
জিনিয়া এক পা এগিয়ে এল, তার চোখ দুটো বৈশালীর মুখে আটকে আছে।
"মাঠের ওপাশে গ্রাউন্ডসম্যানরা কেউ না কেউ থাকে। তুই একটা চিৎকার করলে ওরা ছুটে আসত! অয়ন কলেজ থেকে পার্মানেন্টলি রাস্টিকেট হয়ে যেত! তুই চেঁচালি না কেন?"
বৈশালী কোনো উত্তর দিতে পারল না। তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল।
"তুই চেঁচাসনি কারণ..."
জিনিয়া বৈশালীর কানের একদম কাছে এসে ফিসফিস করে বলল,
"...কারণ তুই চাসনি কেউ তোদের মাঝখানে আসুক। তুই চেয়েছিলি অয়ন তোকে ওইভাবে স্পর্শ করুক। তুই চেয়েছিলি ও তোকে চাবকাক, তোকে পেষণ করুক!"
"স্টপ ইট জিনিয়া! শাট আপ!"
বৈশালী দুই হাতে কান চেপে ধরল। তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল।
জিনিয়া পিছু হটলো না। সে বৈশালীর হাত দুটো কান থেকে টেনে সরিয়ে দিল।
"আয়নায় নিজের মুখটা দেখ বৈশালী! কত ছেলে তোর জন্য পাগল। দেবমাল্য তোকে ভালোবাসে, তোর আবদার সহ্য করে, তোকে রানি বানিয়ে রাখতে চায়। কিন্তু তুই ওকে মনে মনে সম্মান করিস না। তুই চাস অয়নকে, যে তোকে অ্যানিমালের মতো ট্রিট করে ছেড়ে চলে যায়!"
বৈশালী ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ল। সে আর নিজের সাথে যুদ্ধ করতে পারছে না।
হ্যাঁ, জিনিয়া সত্যি বলছে।
পরশুদিন যখন অয়নের শক্ত পুরুষাঙ্গ ওর শর্টসের ওপর দিয়ে ওর নিতম্বে ঘষা খাচ্ছিল, যখন অয়নের সশব্দ থাপ্পড় ওর নিতম্বে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন এক মুহূর্তের জন্য বৈশালী ভুলে গিয়েছিল যে ও আসলে কে। সে স্রেফ একজন কামাতুর নারী হয়ে উঠেছিল।
"আমি এখন কী করব জিনিয়া?"
বৈশালীর গলায় অসহায়তার সুর।
জিনিয়া এবার সোজা হয়ে বসল। সে বৈশালীর চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। তার গলার স্বর এবার অত্যন্ত গম্ভীর এবং সতর্কতামূলক।
"বৈশালী, ভালো করে শোন।"
বৈশালী চোখ তুলে জিনিয়ার দিকে তাকাল।
"তুই একটা মারাত্মক সাইকোলজিক্যাল ট্র্যাপে পা দিয়েছিস।"
জিনিয়া কেটে কেটে বলল।
"তুই ভাবছিস তুই অয়নের ওপর প্রতিশোধ নিচ্ছিস। কিন্তু রিয়্যালিটি হলো, তুই অয়নের সাথে আরও বেশি করে জড়িয়ে যাচ্ছিস। দিস ইজ নট গুড ফর ইউ। তুই অয়নের কোল্ড, ডমিন্যান্ট আর ভায়োলেন্ট রূপটার ওপর অ্যাডিক্টেড হয়ে পড়ছিস।"
"না! আমি ওর ওপর অ্যাডিক্টেড নই! আই হেট হিম!"
বৈশালী চিৎকার করে উঠতে গেল।
"স্টপ লায়িং টু ইউরসেলফ!"
জিনিয়া হাত তুলে ওকে থামিয়ে দিল।
"অয়ন একটা চোরাবালি বৈশালী।"
সে আরও নিচু গলায় বলল।
"অয়ন চ্যাটার্জীর থেকে দূরে থাক। দেবমাল্যকে ইউজ করছিস কর, কিন্তু অয়নের দিকে পা বাড়াস না।
কারণ পরের বার যদি ও তোকে শাস্তি দেয় বৈশালী... এবার হয়তো শুধু স্প্যাঙ্কিংয়ে শেষ হবে না।
তুই যদি নিজেকে বাঁচাতে চাস, তা হলে ওর থেকে দূরে থাক। আর যদি নিজেকে পুরোপুরি ধ্বংস করতে চাস... তা হলে পার্টির রাতে অয়নের সামনে আবার গিয়ে দাঁড়া।"
কথাটা বলে জিনিয়া আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে সে ঘর থেকে বেরোনোর জন্য পা বাড়াল।
ও একটা বিষয়ে সিওর। বৈশালী ওর কথা শুনবে না। যদি অয়ন পার্টিতে আসে তবে ও আবার অয়নের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে। আগুনের নেশা এমনিই।
ও নিজেও সেটাই চায়।
যাক গে, বৈশালীকে এখন কেবল বাঁচাতে পারে অয়ন। এটা বোঝাই যাচ্ছে সে কোনদিন বৈশালীকে ভালোবাসেনি। অয়ন যেই দেখেছে বৈশালী তার ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে চাইছে, তখনই সে পিছিয়ে গেছে।
পার্টিতে অয়ন আসবে বলে মনে হয় না। সেদিন তো ঘুরিয়ে বলেই দিল।