মরীচিকা ও মোহময়ী - অধ্যায় ৬৫
৮
বিকেল তিনটে।
উত্তর কলকাতার সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ ধরে উবেরটা যখন শোভাবাজার মোড়ের দিকে বাঁক নিল, বিদিশা জানলার কাচটা এক ইঞ্চি নামিয়ে দিলেন।
আকাশটা নীলচে ভাব হারিয়ে কেমন যেন একটা ধূসর, বিবর্ণ রূপ ধারণ করেছে।
বড়দিনের উৎসবে মাতোয়ারা পুরো শহর যখন ময়দান, পার্ক স্ট্রিট, আলিপুর চিড়িয়াখানা মুখী তখন বিদিশা চলেছেন নিজের উৎসের খোঁজে, এক সম্পূর্ণ অচেনা অতীতের সন্ধানে।
ট্যাক্সির সিটে বসে বিদিশা কোলে রাখা চামড়ার হ্যান্ডব্যাগটা অনবরত শক্ত হাতে চেপে ধরছিলেন। ব্যাগের ভেতরে সযত্নে রাখা আছে তার মায়ের পুরানো কয়েকটা সাদা-কালো ছবি। এগুলো সেদিনের অ্যালবাম থেকে পাওয়া ছবিগুচ্ছের অংশ। ছবিতে ওনার মা যে বিশাল বারান্দায় নক্সাদার লোহার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন, বিদিশার অনুমান ওটা ওনার মামারবাড়ি।
কিন্তু সমস্যা হলো, বিদিশা তার মামারবাড়িতে পা রাখেননি। বিদিশার মা নাকি বেঁচে থাকতে কখনো বাবার বাড়ির নাম মুখে আনতেন না।
বিদিশার বাবাও এককালে জেদ করে, পরিবারকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বিদিশার মাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন। সেই প্রেম দুজনের সাথেই তাদের পরিবারের সম্পর্কের সাঁকোটা ভেঙে দিয়েছিল। দুই পরিবারই বিদিশার মা ও বাবাকে ত্যাজ্য করেছিল।
বিদিশার শৈশব কিংবা কৈশোরে কোনদিন 'মামারবাড়ি' বা 'দাদুরবাড়ি'র অস্তিত্ব ছিল না।
আজ ছুটির দিনে তিনি খানিকটা বাধ্য হয়েই মামারবাড়ির খোঁজে বেরিয়ে পড়েছেন।
ছুটির শেষ কয়েকদিন তার তদন্তের বিশেষ কোন অগ্রগতি হয়নি। হঠাৎ করে পাওয়া ছবিগুলোর পেছনে যেসব অদ্ভুত শব্দ, ভৌগোলিক অবস্থান, ফাইল নং তিনি পেয়েছিলেন সেগুলোর কোন অর্থই তিনি বের করতে পারেননি।
ইন্টারনেটে সার্চ করে শুধু বোঝা গেল যে ফাইল নম্বরটি কারোর ব্যক্তিগত ফাইল ক্যাবিনেটের কোড নম্বর। সরকারি মহাফেজখানায় খুঁজে লাভ নেই। তাছাড়া, গবেষিকা ছাড়া ওখানে ঢুকতেই দেবে না।
তবে উপায় ?
ছোটবেলায় বিদিশা বাবার মুখে আবছা শুনেছিলেন, উত্তর কলকাতার কোনো একটা রাস্তার নাম, 'দুর্গাচরণ...'
সেই অস্পষ্ট স্মৃতির সূত্র ধরেই আজ পঁচিশে ডিসেম্বরের ছুটির দিনে বিদিশার এই অভিযান।
"ম্যাডাম, আর তো গাড়ি ঢুকবে না। সামনের রাস্তাটা বড্ড সরু। এখানেই নামতে হবে", ড্রাইভার আয়নায় বিদিশার দিকে তাকিয়ে বলল।
বিদিশার চিন্তার সূত্র ছিঁড়ে গেল। ক্যাব রাস্তার একটা মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। সামনের রাস্তাতে সত্যিই গাড়ি ঢুকবে না। তবে, একজন মানুষ স্বচ্ছন্দে হেঁটে যেতে পারে।
ক্যাব থেকে নেমে বিদিশা পার্স থেকে ড্রাইভারের টাকাটা মিটিয়ে দিলেন। ওনার পরনে একখানা পেস্তারঙা সুতি-সিল্কের শাড়ি, তার উপরে জড়ানো হালকা একটি কালো শাল।
দুর্গাচরণ মিত্র স্ট্রিট।
দর্জিপাড়ার এই রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে বিদিশা কপাল কুঁচকে নিজের চারপাশে চেয়ে দেখলেন।
বিদিশার আভিজাত্য আর চলাফেরার মধ্যে এমন এক আলগা গাম্ভীর্য ছিল যে, অচেনা দু-একজন পথচারীও অজান্তেই থমকে দাঁড়িয়ে ওনার দিকে নজর না দিয়ে পারল না।
বিদিশা অবশ্য কারও কৌতূহলী চাউনিকে পাত্তা দিলেন না; শালটা গায়ে আর একটু শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে এক পলক চারপাশটা দেখে নিলেন।
মোড়ের মাথায় নীল-সাদা কার্বস্টোনের পাশে দাঁড় করানো একটা সাবেকি হাতে টানা রিকশো; তার কাঠের হাতলে বসে অলস চোখে বিড়ি টানছে এক রিকশাওয়ালা।
ঠিক তার পেছনেই এক বিশাল বাড়িতে লেডিজ হোস্টেল’-র সাইনবোর্ড, আর তার ঠিক পাশ দিয়ে চলে গেছে আরেকটা সংকীর্ণ পিচঢালা গলি।
কিছুটা এগোতেই একপাশে ‘স্বাধীন চক্র ক্লাব’-এর নীল সাইনবোর্ডওয়ালা শতাব্দীর পুরোনো চুনকাম-খসে-পড়া নীল দালান। তার লোহার পিলারে লাগানো জাতীয় পতাকাটা বাতাসে দুলছে। মাথার ওপর ঝুলন্ত কেবলের কালো জটলা যেন পুরো আকাশটাকে টুকরো টুকরো করে কেটে রেখেছে। তারই ফাঁক দিয়ে ডিসেম্বরের শেষ বিকেলের রোদ ছিটকে এসে পড়েছে রাস্তার উপর। নির্জন পিচঢালা রাস্তার বুক চিরে একটা কালো কুকুর হেলতে দুলতে পার হয়ে গেল, যেন এই পাড়ার আসল মালিক সে-ই।
দু’পাশে প্রাচীন সব বাড়ি। তলায় দালান আর উপরের ঝুলন্ত বারান্দায় আদ্যোপান্ত সেকেলে কাঠের জাফরি। কোন কোন বাড়িতে পুরোনো দিনের সবুজ কাঠের খড়খড়ি দেওয়া জানালা আর তার নিচে বাড়ির দেওয়ালে কোনো এক পুরোনো রাজনৈতিক দলের অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া দেওয়াল লিখন, সব মিলিয়ে এখানে সময় যেন থমকে আছে। চারপাশে অদ্ভুত, নির্জন নীরবতা।
বিদিশা বুঝে উঠতে পারলেন না কাকে জিজ্ঞেস করবেন। কিছুটা থমকে দাঁড়িয়ে, ইতস্তত করে গলির মুখে একটু ভেতরে একটা দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন তিনি।
দোকানদার লোকটির বয়স সত্তরের কাছাকাছি। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, পরনে সাদা ফতুয়া আর ধুতি। কাঁচের বয়াম থেকে কয়েকটা লজেন্স গুছিয়ে এক খুদে খদ্দেরের হাতে তুলে দিচ্ছিলেন।
বিদিশা একটু দ্বিধা নিয়ে এগিয়ে গিয়ে বললেন,
"জ্যাঠাবাবু, একটু শুনবেন?"
বৃদ্ধ চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে বিদিশার দিকে তাকালেন। ওনার রুচিশীল পোশাক আর আভিজাত্য আর কথা বলার ধরন তাকে বুঝিয়ে দিল যে এই মহিলা এই পাড়ার কেউ নন।
"হ্যাঁ মা, বলুন? কী চাই?"
বিদিশা ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে ভাঁজ করা একটা টুকরো কাগজ বের করে বৃদ্ধের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। সেখানে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা, ‘মুখার্জীবাড়ি, দুর্গাচরণ মিত্র স্ট্রিট’।
"এই পাড়ায় মুখার্জীদের একটা বেশ পুরোনো ভিটে আছে বলতে পারেন? শুনেছি বেশ নামডাক ছিল, আর ওদের বাড়িতে নাকি দুর্গাপুজোও হতো..."
বিদিশার গলায় প্রত্যাশার সুর।
বৃদ্ধ কাগজটার দিকে কয়েক সেকেন্ড চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে রইলেন। তারপর মাথা নেড়ে একগাল হেসে বললেন,
" না মা! আপনি ভুল জায়গায় চলে এসেছেন। দুর্গাচরণ মিত্র স্ট্রিটে মুখার্জীবাড়ি নামে কোন প্রাচীন বাড়িই নেই, দুর্গাপুজো তো অনেক পরের কথা। এ পাড়ায় মিত্রদের নামকরা পুজো আছে বটে। কিন্তু মুখুজ্জেদের কোন পুজো আমি আমার সত্তর বছরের জীবনে দেখিনি মা।"
বিদিশার বুকের ভেতরটা যেন এক মুহূর্তে খালি হয়ে গেল। হাত থেকে কাগজটা নামিয়ে নিয়ে একটু কুঞ্চিত কপালে শুধোলেন,
"এখানে কোন মুখার্জীবাড়িই নেই? হয়তো পুজোটা অনেক বছর ধরে বন্ধ হয়ে গেছে...একটু ভেবে দেখুন না ? বিশাল বড় বারান্দা আর লোহার নক্সাদার রেলিং আছে...।"
" ধুর! অমন ঝুলন্ত বারান্দা আর লোহার রেলিংওয়ালা বাড়ি তো উত্তর কলকাতার মোড়ে মোড়ে আছে, মা।"
প্রবীণ দোকানদার কাউন্টারে রাখা ওপরে রাখা টিনের কোটোটা সরাতে সরাতে বললেন।
"আপনি নিশ্চিত যে নামটা দুর্গাচরণ মিত্র স্ট্রিট-ই শুনেছিলেন? হতে পারে আপনি একেবারে ভুল রাস্তায় এসে পড়েছেন।"
"রাস্তার নাম আর কী-ই বা হতে পারে?"
বিদিশা কিছুটা হতাশার সুরেই বললেন,
‘দুর্গাচরণ’ নামটা তো আমার স্পষ্ট মনে আছে..."
বৃদ্ধ এবার হাতের কাজ থামিয়ে একটু চিন্তায় পড়লেন। তারপর কপালে হাত দিয়ে কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,
"মা, উত্তর কলকাতার ইতিহাস অত সহজ নয়। 'দুর্গাচরণ' নামে এই অঞ্চলে অনেক রাস্তা আছে। আপনি দর্জিপাড়ার 'দুর্গাচরণ মিত্র স্ট্রিট'-এ ঢুকে পড়েছেন। অথচ আপনি যে ঐতিহ্যবাহী মুখার্জিবাড়ির কথা বলছেন, হতে পারে সেটা দুর্গাচরণ মুখার্জি স্ট্রিটে! ওটাও তো উত্তর কলকাতাতেই।"
বিদিশার চোখে মুহূর্তের জন্য একটা আলোর ঝলক খেলে গেল,
"দুর্গাচরণ মুখার্জি স্ট্রিট? সেটা আবার কোথায়? এখান থেকে কাছে ?"
"দূরে মানে? ওটা বাগবাজারে।"
দোকানদার গলার গামছাটা দিয়ে কপালটা মুছে নিয়ে বললেন,
"এখান থেকে কম করে ২ কিলোমিটার তো হবেই। এ রাস্তায় সোজা হেঁটে গিয়ে ট্যাক্সি ধরতে হবে আপনাকে।"
'বাগবাজার!'
শব্দটা শুনেই বিদিশা থমকে গেলেন।
এতক্ষণ ঘুরে ঘুরে শরীরের সঙ্গে সঙ্গে মনটাও যেন এক ধাক্কায় ক্লান্ত হয়ে পড়ল।
২ কিলোমিটার দূরে আরেকটা অচেনা রাস্তা, আর সেখানে গিয়েও যে উত্তর মিলবে। তারই বা গ্যারান্টি কোথায়? বিদিশা একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে শালটা আর একটু গায়ে জড়িয়ে নিলেন।
"মা।"
দোকানদার গলাটা সামান্য নামিয়ে বললেন,
"ওখানে দুটো কাছাকাছি রাস্তা আছে। একটা হলো দুর্গাচরণ মুখার্জি স্ট্রিট আর তার কাছাকাছিই রয়েছে দুর্গাচরণ ব্যানার্জী স্ট্রিট।"
বিদিশা একমুহূর্ত থমকে গেলেন। মনের ভেতরে দোলাচলটা এক ধাক্কায় আরও কিছুটা বেড়ে গেল।
দুটো রাস্তা আছে ? দুটোই পাশাপাশি ?
বৃদ্ধ ওনার মুখের দ্বিধাটা হয়তো টের পেলেন।
"এক কাজ করুন মা।"
তিনি সহানুভূতিশীল গলায় বললেন,
"এখান থেকে আর গাড়ি পাবেন না। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের মোড়ে গিয়ে একটা অটো ধরে সোজা বাগবাজার মোড়ে নেমে পড়ুন। ওখান থেকে যে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই দুর্গাচরণ মুখার্জি স্ট্রিট আর ব্যানার্জী স্ট্রিট দুটোই দেখিয়ে দেবে। তবে বেলা পড়ে আসছে... যা খোঁজার আলো থাকতে থাকতেই খুঁজে নিন। ওসব পুরনো অলিগলিতে অন্ধকার নামলে বাড়ি চেনা বড় দায়।"
কাগজটা আবার সযত্নে পার্সের ভেতরে পুরতে পুরতে বিদিশা নম্র গলায় বললেন,
"অনেক ধন্যবাদ, জ্যাঠাবাবু।"
"আরে কিসের ধন্যবাদ মা! আদি উত্তর কলকাতার অলিগলি তো গোলকধাঁধার মতো। গিয়ে দেখুন যদি সন্ধান মেলে।"