মরীচিকা ও মোহময়ী - অধ্যায় ৩৮

🔗 Original Chapter Link: https://xossipy.com/thread-72560-post-6230639.html#pid6230639

🕰️ Posted on Wed Jun 3 2026 by ✍️ RockyKabir (Profile)

🏷️ Tags:
📖 2567 words / 11 min read

আজ ভীষণ ক্লান্ত লাগছে। তাই আর পোস্টার দিতে ইচ্ছে করল না। এই নভেলটা ওয়েব সিরিজগুলোকে মডেল করে লিখছি তাই আজ আপনাদের ধামাকা নয় বরং পরের আর্কে কী আসতে চলেছে সেই সম্পর্কে অনেকগুলো হিন্টস মিলবে। কারণ, এটাই এই আর্কের শেষ চ্যাপ্টার। তবে এরপর আমায় আবার নেক্সট আর্ক প্ল্যান করতে হবে। সেটার জন্য আগের বারের মতোই আবার দেড়-দুই সপ্তাহ ব্রেক নেব। সেই বিরতিটা হয় এই রবিবার, নাহলে পরের রবিবার থেকে শুরু হবে। যদি পরের সপ্তাহ থেকে শুরু করি তবে এই রবিবার একটা চ্যাপ্টার পোস্ট করব। অধ্যায় তেইশ Flashback  দশ বছর আগে। নর্থ ব্লক বয়েজ হোস্টেলের পেছনের দিকটা। এখন মাঝরাত, চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। একটু দূরে একটা সোডিয়াম ভেপার ল্যাম্প আছে বটে, সেটার আলোটা এমনি সময়ে ক্ষীণ, এখন জোরালো বৃষ্টির ছাঁটে হলদে রংটা আরো ঝাপসা দেখাচ্ছে। এতক্ষণ ধরে চলা মুষলধারে চলা বৃষ্টির তোড়টা আগের থেকে সামান্য কমলেও ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়েই চলেছে। ঘন, কালো মেঘের গর্জনে চারপাশটা মাঝে মাঝেই কেঁপে উঠছে। এইরকম অবস্থায় কারোর বাইরে থাকার কথা নয়। অথচ, হোস্টেলের ছাদের কার্নিশ ঘেঁষে কয়েকটা ছায়ামূর্তিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে।  ল্যাম্পের ক্ষীণ আলো কালো, জমাট বাঁধা অন্ধকারকে ভেদ করতে ব্যর্থ। তাদের মুখ স্পষ্ট নয়। শুধু অবয়বগুলো বোঝা যাচ্ছে। এমন সময় ছাদ থেকে তলার দিক লক্ষ্য করে একটা টর্চলাইট জ্বলে উঠল। টর্চের আলোর রেখাটা ওপর থেকে নিচে অন্ধকারের বুক চিরে নেমে গেল। বৃষ্টির মোটা ধারাগুলো সেই আলোর রেখার মধ্যে দিয়ে পড়ার সময় রুপোলি তীরের মতো দেখাচ্ছে। আলোর বৃত্তটা নিচে পড়ে থাকা একটা নিথর, দুমড়ে যাওয়া মৃতদেহের ওপর গিয়ে স্থির হলো। নিচের অন্ধকারে পড়ে আছে একটা মানুষের শরীর। বাঁ পা-টা হাঁটুর কাছ থেকে এমন একটা কোণে বেঁকে আছে, যেটা কোন জীবিত মানুষের মধ্যে সম্ভব না। ঘাড়টা কাঁধের সাথে একটা অসম্ভব কোণে হেলে আছে, ঘাড়ের হাড়গুলো যে মটকে কয়েক টুকরো হয়ে গেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।  তার নিষ্প্রাণ, ফ্যাকাশে মুখটার ওপর অবিশ্রান্ত ধারায় বৃষ্টির জল আছড়ে পড়ছে। আধখোলা, স্থির চোখদুটো যেন অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে কোনো এক না-বলা প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে। মাথার পেছনের দিকটা কংক্রিটের সাথে যেখানে আছড়ে পড়েছে, সেখান থেকে গাঢ় লাল রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। অবিরাম বৃষ্টির তোড়ে জলের সাথে মিশে সেটা সঙ্গে সঙ্গে থকথকে ভাবটা হারিয়ে ফেলছে, তারপর সেটা একটা অপেক্ষাকৃত পাতলা, উজ্জ্বল লাল স্রোত তৈরি করছে। বৃষ্টির ফোঁটার আঘাতে তোড়ে সেই ধারাটা আবার চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। ছেলেটার ডান হাতের আঙুলগুলো আধো-মুঠি করা। পড়ার শেষ মুহূর্তে সে শূন্যে কিছু একটা খামচে ধরতে চেয়েছিল নাকি তার হাতে কিছু একটা শক্ত করে ধরা ছিল ? টর্চের আলোটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। সেটা স্পষ্ট হল ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেগুলোর মধ্যে একজন পিছিয়ে যাওয়া শুরু করতে।  "যাঃ..." ছেলেটার গলা থেকে একটা অস্ফুট, কাঁপাকাঁপা শব্দ বেরিয়ে এল। ড্রেনপাইপ দিয়ে হুড়হুড় করে জল নামার শব্দ আর হাওয়ার আওয়াজের মধ্যে শব্দটা প্রায় হারিয়ে যাচ্ছিল।  সে একটা শুকনো ঢোঁক গিলল, তার বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে। সে আরেকবার কার্নিশের কাছে গিয়ে নিচের দৃশ্যটা দেখার চেষ্টা করল। এবার, তার হাত থেকে টর্চটা প্রায় খসে পড়ার উপক্রম হল।   "ভাই... মালটার ঘাড়টা পুরো বেঁকে গেছে! মারা গেল নাকি রে!" ছেলেটার গলাটা ভয়ে কাঁপছে। "তোর কী মনে হয়...এত ওপর থেকে পড়লে আর কী হতে পারে ?" যে উত্তর দিল তার গলাটা প্রথমজনের চেয়ে অনেক বেশি শান্ত। দেখা গেল দ্বিতীয় ছায়ামূর্তিটা একটু এগিয়ে এসেছে। সে টর্চ ধরা প্রথম ছায়ামূর্তির হাতটা আলতো করে ধরে আলোটা বডির দিক থেকে সরিয়ে পাশের দেওয়ালে ফেলল। "আলোটা নেভা। নিচে কেউ দেখে ফেললে অকারণে সিন ক্রিয়েট হবে।" এই অবস্থাতেও তার গলায় একটা অদ্ভুত কমান্ডিং টোন। তারপর সে প্রথমজনকে সান্ত্বনা দিল। "প্যানিক করিস না। যা হবার হয়ে গেছে।" "কী বলছিস তুই! কাল সকালে ফর শিওর পুলিশ আসবে! এনকোয়ারি হবে! আমরা সবাই ফেঁসে যাব..." আতঙ্কিত প্রথমজন এবার দু'হাতে নিজের ভেজা চুলগুলো খামচে ধরল। এমন সময় পাশ থেকে আরেকটা ছায়ামূর্তি এক পা এগিয়ে এসে প্রথমজনের শার্টের কলারটা সজোরে খামচে ধরল। "চুপ কর শালা ! একদম ঘ্যানঘ্যান করবি না! তোর সবেতেই বাড়াবাড়ি। ওই শুয়োরের বাচ্চাটা সব লিমিট ক্রস করে ফেলেছিল, ওর এটাই প্রাপ্য ছিল।"  সে হিসহিস করে উঠল। তার গলার স্বরে মৃত ব্যক্তির প্রতি আক্রোশ ভর্তি। "তোরা থামবি! এটা বাওয়াল করার টাইম নয়! ওর কলারটা ছেড়ে দে।"  এবার, মোটা গলায় একজন ওদের সবাইকে ধমকে উঠল। "পুলিশ এলে, আসবে। এটা সিম্পল সুইসাইড। আমরা কেউ এখানে ছিলাম না, আমরা কেউ কিছু জানি না। ব্যস।" "কিন্তু... কিন্তু বডিটা? বডিটার কী হবে?"  প্রথমজনের গলায় আবার আর্তনাদ ফুটে উঠল। "কীভাবে ম্যানেজ করবি কিছু ভেবেছিস ?"  দ্বিতীয়জনের থেকে প্রশ্নটা ধেয়ে এল। "আমরা কিছু করব না, যা করার দত্ত করবে। তোরা শুধু খেয়াল রাখ, পেনড্রাইভটা আমাদের জায়গা মতো পৌঁছে দিতে হবে। ওর ল্যাপটপটা ফরম্যাট করে ফেলেছিস তো ?" যে উত্তর দিল তার গলাটা একদম সমতল, আবেগহীন এবং বরফের মতো ঠান্ডা। যেন একটু আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা তার কাছে একটা খুব তুচ্ছ ব্যাপার। এমন সময়... ছলাত ! বৃষ্টির একটানা শব্দের মধ্যে একটা খুব সূক্ষ্ম, কিন্তু স্পষ্ট শব্দ ওদের কান এল। শব্দটা ওদের পেছন থেকে, অর্থাৎ ছাদের সিঁড়ির দরজার দিক থেকে এল। ছাদের জমাট বাঁধা জলের ওপর একটা ভারী জুতোর পা পড়ার শব্দ। সবকটা ছায়ামূর্তি এক লহমায় পাথরের মতো জমে গেল। প্রথম ছেলেটার হাতের টর্চটা আবার জ্বলে উঠল আর সেটা সোজা ঘুরে গেল ওই দরজার দিকে। সিঁড়ির ঘরের ওই অন্ধকার, আবছা আয়তক্ষেত্রাকার ফ্রেমে একটা দীর্ঘ, অস্পষ্ট অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে। টর্চের আলোটা সরাসরি লোকটার মুখের ওপর পড়ল না, পড়ল তার গলা থেকে বুক অবধি।  লোকটার পরনে একটা ডার্ক কালারের রেইনকোট, যেটার ওপর দিয়ে বৃষ্টির জল গড়িয়ে পড়ছে, মুখটা সম্পূর্ণ অন্ধকারে ঢাকা। শুধু হাতে ধরা একটা আধ-খাওয়া সিগারেটের জ্বলন্ত লাল বিন্দুটা অন্ধকারের মধ্যে জ্বলজ্বল করছে। তার উপস্থিতিটা এতটাই ভারী যে ছাদের খোলা হাওয়ার মধ্যেও ছেলেগুলোর মনে হলো তাদের দমবন্ধ হয়ে আসছে। নিকষ অন্ধকারে দুর্যোগের রাতে এরকম অবস্থায় একটা অচেনা লোকের মুখোমুখি হলে অনেক কিছু ঘটতে পারে। লোকটা এক পা এক পা করে ওদের দিকে এগিয়ে আসতে থাকল। জলের ওপর ভারী জুতোর শব্দ হচ্ছিল।  যে ছেলেটা খিস্তি দিয়েছিল, তার গলা দিয়ে একটা শুকনো ঢোঁক গেলার শব্দ হলো। প্রথম ছেলেটার হাত থেকে টর্চের আলোটা ছিটকে নিচে পড়ে গেল। তার হাতের মুঠো কখন শিথিল হয়ে গেছে সে টের পায়নি। আলোটা নিভে গিয়ে ছাদটা একটা নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ডুবে গেল। কয়েক সেকেন্ডের একটা দমবন্ধ করা নিস্তব্ধতা। চারপাশে শুধু বৃষ্টির আওয়াজ। এমন সময় ঠাণ্ডা গলার মালিক ফিসফিস করে, একটা সমীহ মেশানো গলায় বলে উঠল, "স্যার... আপনি এখানে?" লোকটা কোন উত্তর না দিয়ে কার্নিশের ধারে এসে নিচের দিকে তাকাল। "স্যা...স্যার" প্রথম ছেলেটা তোতলে উঠল। লোকটা সিগারেটে একটা লম্বা টান দিল। তারপর অত্যন্ত শান্ত, ভাবলেশহীন গলায় বলল, "বডিটা ওইভাবেই পড়ে থাক। আমি ঠিক সময়ে সিকিউরিটিকে দিয়ে পুলিশকে কল করাব। তোমরা পেছনের সিঁড়ি দিয়ে নিজের নিজের রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। কাল সকালে পুলিশ এলে যেন তোমাদের চোখেমুখে ঘুমের রেশ থাকে।" ছায়ামূর্তিগুলো শুধু ঘাড় নাড়ল, যদিও অন্ধকারে সেটা দেখা গেল না। আস্তে আস্তে ছায়ামূর্তিগুলো কার্নিশ থেকে সরে শুরু করল। তারা মাথা নিচু করে, ওই দীর্ঘ ছায়ামূর্তিটার পাশ কাটিয়ে, সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল। যাবার আগে অবশ্য ওরা টর্চটা কুড়িয়ে নিয়ে যেতে ভুলল না। ওদিকে নিচে, ছেলেটার মাথা থেকে বেরোতে থাকা রক্তের স্রোত বৃষ্টির জলের তোড়ে ধুয়ে যাচ্ছিল। ছাদের ওপর তখন শুধু সেই রেইনকোট পরা লোকটা একা দাঁড়িয়ে। সে ধীরে ধীরে কার্নিশের দিকে এগিয়ে গেল। নিচের অন্ধকারের দিকে একবার তাকাল, সেখানে বৃষ্টির জলে একটা তরতাজা প্রাণের শেষ চিহ্নগুলো ধুয়ে যাচ্ছে। সে পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরাল। লাইটারের ক্ষণস্থায়ী আলোয় তার মুখের একটা পাশ কেবল এক সেকেন্ডের জন্য আলোকিত হয়ে আবার অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। বর্তমান সময় সকালের নরম, মিঠে রোদ ডর্মের জানলার কাঁচ গলে ঘরের ভেতরে এসে পড়ছে। সেই আলোয় বাথরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখটা দেখছে অয়ন। তার খালি গা, পরনে শুধু একটা ট্র্যাকপ্যান্ট। ট্যাপ থেকে বেসিনে সরু ধারায় জল পড়ছে, জল পড়ার একটানা শব্দ ছাড়া বাথরুমের ভেতর আর কোনো আওয়াজ নেই। পরশুদিন রাতে বক্সিং রিংয়ে বিকাশের সলিড জ্যাবগুলো তার ডান চোখের নীচে আর বাঁ গালে যে জায়গাগুলোতে আছড়ে পড়েছিল, সেই জায়গাগুলোতে কালচে-নীল কালশিটে দাগ বসে গেছে। নাকে একটা নাসাল স্ট্রিপ পরানো আছে। শ্বাস নিতে গেলে নাক আর পাঁজর দু জায়গাতেই, ব্যথা ভালোই টের পাওয়া যাচ্ছে। ভাগ্য ভালো যে নাকটা ভেঙে যায়নি। নিচের ঠোঁটের ডানদিকটা ফেটে কিছুটা ফুলে আছে, কাল সকাল অবধি ওখানটায় শুকিয়ে যাওয়া রক্তের একটা কালচে আস্তরণ লেগেছিল। কপালের একপাশে চামড়া ছড়ে গেছে। শার্টহীন অবস্থায় পাঁজরের কাছে, কাঁধের কাছে যেখানে যেখানে বিকাশের পাঞ্চগুলো এসে তার উপর পড়েছিল সেখানে সেখানে লালচে দাগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।  সারা শরীর জুড়ে একটা অবশ করা ভোঁতা ব্যথা; পেশিগুলো আড়ষ্ট হয়ে আছে, নড়তে-চড়তে গেলেও কষ্ট হচ্ছে। যেন তাদের উপর প্রচণ্ড ধকল গিয়েছে, অমানুষিক পরিশ্রম করানো হয়েছে।  কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, শরীরের এই নিদারুণ যন্ত্রণার সম্পূর্ণ বিপরীতে তার মাথার ভেতরটা অদ্ভুতভাবে শান্ত, ঠিক যেন কোনো গভীর হ্রদের স্থির, নিস্তরঙ্গ জল। অয়ন একটা তুলোয় অ্যান্টিসেপ্টিক মলম লাগিয়ে খুব সন্তর্পণে নিজের ফাটা ঠোঁটের ওপর ছোঁয়াল। সঙ্গে সঙ্গে জায়গাটা তীব্র জ্বালা করে উঠল ঠিকই, কিন্তু সে ব্যথায় মুখ বিকৃত করল না। গতকাল সারাটা দিন সে একরকম বিছানাতেই কাটিয়েছে। শরীরের এই অবস্থায় ফুটবল মাঠে যাবার প্রশ্নই ওঠে না, সেখানে শের সিংয়ের বক্সিং ক্লাব তো কোন ছাড়। কোচ সেনগুপ্তকে সে একটা টেক্সট করে জানিয়ে দিয়েছিল, 'বাথরুমে স্লিপ করে পড়ে গিয়েছিলাম স্যার। মুখে আর পাঁজরে একটু চোট লেগেছে। আজ মাঠে যেতে পারব না।'  কোচ সঙ্গে সঙ্গে ফিরতি মেসেজে তাকে রিপ্লাই করেছিলেন, 'ইটস্ ওকে। টেক রেস্ট। কাল ডক্টরকে দেখিয়ে নিও।'  গতকাল সকালে ওয়াশরুমে অয়ন যখন অ্যান্টিসেপ্টিক মলম নিয়ে ধীরেসুস্থে নিজের ফাটা ঠোঁটের ওপর লাগাচ্ছিল সেই সময় ওয়াশরুমের অর্ধেক খোলা দরজা দিয়ে উঁকি মেরেছিল রনি। সে তখন ব্রাশ হাতে নিয়ে রুমের ভেতরে ঢুকতে যাচ্ছিল, কিন্তু আয়নার সামনে অয়নের ওই চেহারাটা চোখে পড়ায় সে ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে। পায়ের শব্দ পেয়ে ঠিক সেইসময় অয়ন পিছন দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে রনির দিকে ফিরে তাকিয়েছিল। অয়নের ক্ষতবিক্ষত মুখ, তার সম্পূর্ণ আবেগহীন, হিমশীতল চোখের চাউনি দেখে রনি আক্ষরিক অর্থেই ভয়ে শিউরে উঠেছিল।  তার হাত থেকে ব্রাশটা প্রায় খসে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। অয়ন প্রায় দিন সন্ধ্যাবেলা কোথায় বেরিয়ে যায় আর কী করে রাত্রিবেলা হোস্টেলে ফেরে, সেটা ভেবেই সঙ্গে সঙ্গে ওর শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেছিল। একটা কথাও না বলে সে ভয়ে ছিটকে সেখান থেকে দৌড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। কথাটা মনে করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অয়ন মলমের টিউবটা বন্ধ করে বেসিনের ওপর রাখল। ফেস্টের রাতের পর থেকে ওর মাথার ভেতরটা একটা জ্বলন্ত চুল্লির মতো হয়ে ছিল। মায়ের প্রতি এক অদ্ভুত, নিষিদ্ধ আকর্ষণের জন্য, যার কারণ সম্পর্কে সে নিজেও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়, অয়ন বাড়ি থেকে এক প্রকার পালিয়ে আসে।  কিন্তু, এখানে এসেও নিজের মায়ের প্রতি তার সেই নিষিদ্ধ আকর্ষণ একটুও কমেনি। যেজন্য অয়ন দিনের পর দিন ভয়ংকর অপরাধবোধে ভুগেছে।  যার নিট ফলাফল হল প্রচণ্ড মানসিক অস্থিরতা। তবু এসব হয়তো সামলে নেওয়া যেত। কিন্তু, যাকে এড়ানোর জন্য এখানে আসা, সে নিজেই একদিন এখানে এসে হাজির হল। সেদিনের পর থেকে যা যা ঘটেছে তাতে অয়নের জীবন পুরোপুরি ঘেঁটে গেছে। সে আশা করেনি বিদিশা তাকে ক্যাম্পাসে সম্পূর্ণ অচেনা মানুষ হিসেবে ট্রিট করবেন, সে আশা করেনি বিক্রম তার মাকে নিয়ে ওইরকম একটা নোংরা পরিকল্পনা বানাবে। আর, সেই বিষয়ে সাবধান করতে গেলে তার মা যে তাকে অপমান করে নিজের অফিস থেকে বের করে দেবে এটা তো ওর কল্পনার অতীত ছিল। আর, সবশেষে ফেস্টের রাতে হাজারটা চোখের সামনে তার গালে বিদিশার ওই চড়! পুরোনো স্মৃতিগুলো আবার একসঙ্গে ভিড় করে এলেও আজকে অয়নের মনটা বরাবরের মতো চঞ্চল হয়ে উঠল না। গতকাল থেকেই তার মনটা এক অদ্ভুত স্তব্ধতায় আচ্ছন্ন। আজকেও অতীত স্মৃতির কোলাহল তার মনে চিন্তার ঝড় তুলতে ব্যর্থ হল। শূন্যতার এই অনুভূতিটা মোটেও যন্ত্রণাদায়ক নয়, বরং আরামদায়ক। সে চায় তার মনটা এবার থেকে এমনই থাকুক।  আজ অনেকদিন পর আবার ওর মাঠে নেমে যেতে ইচ্ছে করছে। অন্য কোন কারণে নয়, শুধুই ফুটবল খেলার জন্য।  যদিও শরীরের এই অবস্থায় সেটা সম্ভব নয়। শরীরের এখন কী অবস্থা জানার জন্য আজ ওকে একবার ওকে ডাক্তারের কাছে যেতেই হবে। অয়ন খুব সাবধানে ওর মুখে যেখানে যেখানে চোট লেগেছে সেই অংশগুলো বাদ দিয়ে, ঠাণ্ডা জলে মুখের অবশিষ্ট অংশগুলো ভাল করে ধুয়ে তোয়ালে দিয়ে আলতো করে মুখ মুছে নিল। তারপর, আয়নায় মুখের দিকে আরেকবার তাকিয়ে সে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।  এই নীরবতাটুকু ওর ভীষণ প্রয়োজন ছিল। প্রচণ্ড মানসিক আঘাত পেলে মানুষ শকে চলে যায়। অয়নের সাথেও সেটাই ঘটেছিল। ওর গোটা জগতের একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল ওর মা আর ফেস্টের রাতে সেই জগতটা ওলটপালট হয়ে যাওয়াতে সে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। সারাদিন ধরে ডর্মের ঘরে বসে থাকা, স্বেচ্ছায় পড়াশোনা বন্ধ করে দেওয়া, জীবনের প্রতি সমস্ত রকম উৎসাহ হারিয়ে ফেলা, এগুলো আসলে উপসর্গ মাত্র। বাস্তবে সেই অবস্থায় অয়নের পক্ষে বিক্রমের উপর প্রতিশোধ নেওয়া কোনমতেই সম্ভব ছিল না। অয়নের চারপাশে ওর এমন কোন শুভাকাঙ্খী ছিল না, যে আসল রোগটা ধরতে সক্ষম। সেদিন কোচ সেনগুপ্ত ঠেলে অয়নকে দোজোতে না পাঠালে এতদিনে সে হয়তো মানসিক অবসাদের এক অতল গহ্বরে তলিয়ে যেত।  দোজোতে যাওয়ার জন্য নিয়মিত হোস্টেলের বাইরে বেরোনো, সেই সূত্রে রৌণকের সঙ্গে দেখা হওয়া, বক্সিং-ক্লাবে বিকাশের সঙ্গে ফাইট এসবই শাপে বরের কাজ করেছে। এসব বোঝার মতো আত্ম-সচেতনতা অয়নের মধ্যে এখনও অবধি তৈরি না হলেও অবচেতনে সে এই অন্ধকার কাটিয়ে বেরিয়ে আসার জন্য হাঁসফাঁস করছিল। সেজন্যই সে একটা আউটলেট খুঁজছিল আর সেটাই তাকে আপাত অচেনা রৌণকের ডাকে সাড়া দিতে বাধ্য করে। অয়ন আজও সম্পূর্ণ বিপন্মুক্ত নয় কিন্তু সে একটু হলেও স্বাভাবিক হচ্ছে। ফুটবল খেলার আকাঙ্খার পুনর্জাগরণ সেটাই প্রমাণ করে। সেমিনার ডে: সকাল দশটা। মেইন অডিটোরিয়াম। আজ ন্যাশনাল লেভেল ম্যাথ সিম্পোজিয়ামের গ্র্যান্ড ওপেনিং। পুরো অডিটোরিয়াম চত্বরটায় উৎসবের মেজাজ। তবে, এখানে কালচারাল ফেস্টের সেই উদ্দাম পরিবেশ একদমই নেই। মেইন গেট থেকে শুরু করে অডিটোরিয়ামের প্রবেশদ্বার পর্যন্ত লাল কার্পেট বিছানো। দু-পাশে সারি সারি রজনীগন্ধা আর গ্ল্যাডিওলাসের স্ট্যান্ড।  অডিটোরিয়ামের ভেতরে গমগম করছে ডেলিগেট আর অতিথিদের ভিড়। সেখানে উপস্থিত কানপুর, খড়গপুর আইআইটি এবং আইআইএসসি ব্যাঙ্গালোর থেকে আসা দেশের প্রথম সারির গণিতজ্ঞ এবং স্কলাররা। অডিটোরিয়ামের বাকি সিটগুলো কলেজের বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের ফ্যাকাল্টি, রিসার্চ স্কলার এবং স্টুডেন্টদের ভিড়ে কানায় কানায় পূর্ণ। স্টেজের ওপরের বিশাল নীল মখমলের ব্যাকড্রপে সোনালি অক্ষরে জ্বলজ্বল করছে- 'Calculus: The Language of the Universe'। স্টেজের লাইটিং, সাউন্ড সিস্টেম, ডেকোরেশন, সবকিছু একেবারে নিখুঁত। কোথাও কোন ত্রুটির লেশমাত্র নেই। আর এই পুরো মেগাইভেন্টের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন একজন নারী। মিস বিদিশা গাঙ্গুলি। আজ তিনি পরেছেন একটা ক্লাসি, ডিপ নেভি-ব্লু রঙের সিল্কের শাড়ি, যার পাড়ে সরু রুপোলি কাজ। ব্লাউজটা অত্যন্ত মার্জিত, কনুই অবধি হাতা। চুলগুলো একটা নিটোল ফ্রেঞ্চ রোলে বাঁধা, গলায় একটা সরু প্লাটিনামের চেন, চোখে হালকা কাজল আর ঠোঁটে ম্যাট নুড লিপস্টিক। তাকে আজ দেখে মনে হচ্ছে কোনো কর্পোরেট সংস্থার দক্ষ এবং আত্মবিশ্বাসী পদাধিকারী।  হবেই না বা কেন ? তিনি অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছেন যে। বিদিশার চোখেমুখে ক্লান্তির লেশমাত্র নেই, বরং নির্ভেজাল আনন্দ এবং সাফল্যের দীপ্তি তার পুরো মুখশ্রীকে উদ্ভাসিত করে রেখেছে। হাতে একটা ট্যাবলেট নিয়ে তিনি একদিক থেকে অন্যদিকে নির্দেশ দিচ্ছেন, মাইকের সাউন্ড চেক করাচ্ছেন, ডেলিগেটদের সাথে হাসিমুখে কুশল বিনিময় করছেন। প্রিন্সিপাল সান্যাল একটু আগেই স্টেজে উঠে হাসি মুখে বিদিশার ভূয়সী প্রশংসা করে গেছেন। এটা তারও জয়, তিনিই ভরসা করে বিদিশাকে দায়িত্বটা দিয়েছিলেন। ম্যাথ ডিপার্টমেন্টের অন্য ফ্যাকাল্টিরা আজ বিদিশার ছায়ায় ঢাকা পড়ে গেছেন। এমনকি ম্যাথ ডিপার্টমেন্টের সবচেয়ে সিনিয়র এবং খিটখিটে প্রফেসর ঘোষও আজ বিদিশার দিকে তাকিয়ে সন্তুষ্ট হয়ে একবার মাথা নেড়েছেন। গেস্টরা নিখুঁত আয়োজনের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করছেন। যেসব ফ্যাকাল্টিরা আড়ালে এতদিন বিদিশাকে একজন 'নতুন আসা রূপসী টিচার' বলে তাচ্ছিল্য করত, তারা আজ বিদিশার এই লিডারশিপ আর ম্যানেজমেন্ট স্কিল দেখে হতবাক। তাদের মুখে কথা সরছে না। এর মধ্যেই একটু আগে রাহুল বোস ভিড় ঠেলে বিদিশার কাছে এসেছিলেন। তার পরনে একটা ছাই-রঙা ব্লেজার। "মেনি কনগ্র্যাচুলেশনস, মিস কো-অর্ডিনেটর," রাহুল একটা স্নিগ্ধ হাসি দিয়ে বিদিশার সামনে এসে দাঁড়ালেন।  "আপনার এই রাজকীয় আয়োজনের সামনে তো সাহিত্যের কোনো শব্দই আজ যুৎসই মনে হচ্ছে না। আপনি তো দেখছি আজকে একার হাতে একটা আস্ত সাম্রাজ্য শাসন করছেন।" রাহুলের গলায় সেই চেনা রসবোধ। উত্তরে বিদিশা একটা ঝলমলে হাসি উপহার দিয়ে বলেছিলেন,  "থ্যাংক ইউ মিস্টার বোস। তবে একার হাতে নয়, আমার গোটা ভলান্টিয়ার টিম, বিশেষ করে সাহিল খুব খেটেছে। আর, সাম্রাজ্য সামলানো সোজা নয়, গত আটচল্লিশ ঘণ্টায় আমার যা স্ট্রেস গেছে, সেটা আমিই জানি!" "কিন্তু আপনার চেহারায় তো সেই স্ট্রেসের কোনো ছাপ নেই। ইউ লুক অ্যাবসলুটলি স্টানিং অ্যান্ড ইন কন্ট্রোল।"  কথাটা বলে রাহুল মুচকি হেসে নিজের সিটে ফিরে গিয়েছিলেন। বিদিশা আবার নিজের ফাইলে চোখ রাখলেন। তার বুকের ভেতরটা আজ গর্বে ফুলে উঠেছে। ডক্টর বাগচী আর সুব্রত সেনের নোংরা ষড়যন্ত্রকে তিনি যেভাবে নস্যাৎ করে দিয়েছেন, সেটা তার আত্মবিশ্বাসকে তুঙ্গে পৌঁছে দিয়েছে। কিন্তু এই পুরো অডিটোরিয়ামের একটা অন্ধকার কোণায়, পিলারের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে একজন, যার এখানে আজ কোনোভাবেই থাকার কথা ছিল না। বিক্রম মালহোত্রা। সম্ভব হলে সে আজকে কলেজের ত্রিসীমানায় আসত না। কিন্তু সুব্রত সেনের হাত ধরে এই সেমিনারের পার্ট হওয়ার পর, তাকে আজ আসতেই হতো। নইলে স্টুডেন্ট কাউন্সিলের ট্রেজারার হিসেবে তার নিজের ইমেজটাই নষ্ট হতো। তবে, সে আজ যথাসম্ভব বিদিশাকে এড়িয়ে চলছে। সবসময় আড়ালে আড়ালে থাকছে যাতে তাকে তিনি দেখতে না পান। বিক্রমের বুকের ভেতর একটা অজানা আতঙ্ক দলা পাকিয়ে আছে। To be continued...