আগুণের পরশমণি;কামদেব - অধ্যায় ৬৯
নবষষ্টি পরিচ্ছেদ
অফিস থেকে ফিরে চা খেয়ে বেরোবার জন্য তোড়জোড় করছেন সতীনাথ।মায়া এসে বললেন,এখন বের হচ্ছো নাকি?
ঘরে বসে কি করব বলো?
মেয়েটাকে নিয়ে তো একটু বসতে পারো।তোমায় একটা কথা বলে দিচ্ছি ঐ মাইতি লোকটা কিন্তু সুবিধের নয়।
দাদাকে একদম সহ্য করতে পারে না মায়া।সতীনাথ বললেন,দেখো মায়া ভালো করে না জেনে কারো সম্পর্কে কিছু বলা ঠিক নয়।
ঠিক-বেঠিক বুঝিনা আমার মনে হয়েছে তাই বললাম।যাও যেখানে যাচ্ছিলে যাও।মেয়েমানুষের কথা বাসি হলে বুঝবে।
সতীনাথ সিড়ি দিয়ে নামতে নামতে ভাবেন দাদার সঙ্গে মায়ার কোনোদিন কথা হয়নি।পথেঘাটে কেবল চোখের দেখা হয়েছেমাত্র।তবু মায়া এমন কথা বলল কেন?আসলে নিজ পতিকে বিরত করার একটা কৌশল।মনেমনে হাসলেন।
দাদার নজর তিনতলার ফ্লাট।বছর দুয়েকের উপর খালি পড়ে আছে।এই অঞ্চলে দাদাকে এড়িয়ে কোনোকিছু বেঁচাকেনা সম্ভব নয়।শ্রীরামপুরে লোক পাঠিয়ে খবর নিয়েছেন।ছোটো একটা ফ্লাট কলেজের কাছে মেমসাহেব একা থাকেন।একা মানে সঙ্গের লোকটি হাজব্যাণ্ড নয়।অবশ্য ফরেনাররা পোশাক বদলানোর মত হাজব্যাণ্ডও বদলাতে পারে। মেমসাহেব ফ্লাট বেঁচতে রাজী নয়।দাদাও হাল ছাড়ার পাত্র নয়।দেখা হলেই খোঁজ নেবেন ফ্লাটে কেউ এল কিনা। কালরাতের খবরটা বলা ঠিক হবে কি ভাবেন।মায়া বলেছে তোমার সব ব্যাপারে যাওয়ার কি দরকার।দাদা শুনলে চোটপাট শুরু করে দেবেন।
সকাল থেকে সংসারের সব কাজ একের পর এক করে চলেছে কিন্তু মনের মধ্যে দলা পাকিয়ে রয়েছে একচিন্তা।সোনু না ফেরা পর্যন্ত জানা যাচ্ছে না কি বেরোবে রিপোর্টে।অধীর আগ্রহে সোনুর জন্য অপেক্ষা করে সহেলী।মাল খেয়েই কাল হয়েছে।সোনুরই বা কি দোষ তার নিজেরও সায় ছিল তাতো নয়।
সতীনাথ কাল রাতের কথা বলতে সন্তোষ মাইতি অবাক হয়ে বললেন,কাল রাতে দেখলেন আর এখন এসেছেন বলতে?
অতরাতে কি করব?
কজন ছিল?
দুজন ষণ্ডাগণ্ডা মতো?
কতক্ষণ ছিল মেমসাহেব একা ছিল?
কখন এসেছিল জানি না।দুজনকে নামতে দেখলাম।মেমসাহেব মনে হয় ভিতরে ছিল,ওদের সঙ্গে যায়নি।
মনে হয় বোধ হয় এভাবে বললে কিভাবে বুঝবো?একটা কাজ আপনাদের দিয়ে হবে না।ঘড়ি দেখে বললেন,এতরাতে যাওয়া ঠিক হবে না।কাল দেখব কিভাবে ভদ্রপাড়ায় ব্যবসা চালায়।এরা কলেজে পড়ায় ভাবতেও লজ্জা করে।
দাদা পুলিশকে বললে হতো না?
না হতো না।শুনুন কাল যা দেখেছেন পুলিশ কেন কাউকে বলতে যাবেন না।মনে থাকবে?
সতীনাথ ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানান।
ব্লাড রিপোর্ট নিতে গিয়ে কলেজ থেকে ফিরতে দেরী হয়ে গেল।রিপোর্টে চোখ বুলিয়ে সত্যপ্রিয়র কপালে ভাঁজ পড়ে।মিঠুর অনুমানই ঠিক।কি বলবেন মিঠুকে নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়।নেশার ঘোরে কোনো খেয়াল ছিল না।দরজা খুলতে মিঠুকে পাস কাটিয়ে সত্যপ্রিয় ভিতরে ঢুকে গেলেন।
কি হল রিপোট পেয়েছো?
আশ্চর্য!দেখছো ঘেমে নেয়ে গেছি আর তুমি আছো তোমার নিজের চিন্তায়।উষ্মা প্রকাশ করেন সত্যপ্রিয়।
লজ্জিত হয়ে সোনুকে সোফায় বসিয়ে শাড়ীর আঁচল দিয়ে সযত্নে মুখ মুছিয়ে দিয়ে সহেলী বলল,তুমি বোসো আমি চা নিয়ে আসছি।
আঁচলের স্পর্শে এত মায়া মমতা সত্যপ্রিয়র চোখে জল এসে যায়।মেয়েটা খুব সরল। এখুনি চা নিয়ে আসবে কিভাবে বলবেন কথাটা ভাবতে থাকেন।
সহেলী এসে চায়ের কাপ এগিয়ে দিতে হাত বাড়িয়ে নিলেন সত্যপ্রিয়।মিঠুকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে বললেন,বোসো।
সহেলী সামনের সোফায় বসল।সত্যপ্রিয় চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন,তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?
আবার কি কথা?চোখ তুলে তাকায় সহেলী।
যদি এই বাড়ী ছেড়ে অন্য কোথাও যাই,তুমি যাবে তো?
কাছাকাছি হলি কেন যাব না?
যদি দূরে অন্য কোনো জেলায় আমাদের কলেজের কাছাকাছি?
তোমার সুবিধে হলি তুমি যাবে।অজানা অচিনা জায়গায় কাউরে চিনি না জানি না আমি কি করে যাব বলো?
কেন তুমি তো আমার সঙ্গে যাবে।
সে যখন যাবে তখন দেখব।রিপোটের কথা বলো।
অন্য প্রসঙ্গ তুলে বুঝলেন আর এড়ানো যাবে না বললেন,রিপোর্ট পজিটিভ।
কিছু হয়েছে না হয়নি?
সেটাই তো বললাম তুমি মা হতে চলেছো।
আমি জানতাম।নেশার ঝোকে কিছুই খেয়াল ছেলনা। সহেলী বলল,এবার খসাবার ব্যবস্থা করতে হয়।
তুমি এ্যাবরশনের কথা ভাবছো?
আরবসন ছাড়া উপায় কি?
মিঠু ভ্রুণহত্যা মহাপাপ--
তাহলে কি করব?তুমি আমাকে বিষ এনে দাও খেয়ে মরি।কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে সহেলী।
মরার কথা কেন আসছে?সত্যপ্রিয় উঠে পাশে গিয়ে বসে মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বললেন,এসব কেন বলছো?মিঠু তুমি একসময় বলেছিলে তোমার মা হওয়ার বড় সাধ।
সহেলী চোখ মুছে সোনুকে দেখে তারপর হতাশার সুরে বলল,ইচ্ছে হলেই হবে? এই সন্তান যখন তার মাকে বাবার কথা জানতে চাইবে আমি তখন তাকে কি বলব?
যা সত্য তাই বলবে।
সহেলী বিস্ময়াভিভূত চোখে তাকিয়ে থাকে।
আমার কারণেই হয়েছে এতো মিথ্যে নয়।
সহেলী পরিণাম চিন্তা করে শিউরে উঠে বলল,তোমার একটা সম্মান আছে,কলেজে জানতে পারলে কি হবে ভেবেছো?তাছাড়া আমিই বা মুখ দেখাব কি করে?
আমার সম্মান নিয়ে মিঠুর বড় চিন্তা।সত্যপ্রিয় ভাবেন এর চেয়ে যোগ্য জীবনসঙ্গী আর কে হতে পারে।অতি ধীর কণ্ঠে বললেন,স্ত্রী বিয়োগের পর আমি কি বিয়ে করতে পারি না?অবশ্য তুমি রাজি না হলে জোর করব না।
সরল বাংলা কথা তবু সহেলী বুঝতে পারে না সোনুর কথা, ভুল শুনছে নাতো?মা বলতো পোড়াকপালী সারা দেশে একটা খুঁজে পেলিনে?
মা আজ নেই থাকলে দেখিয়ে বলতো সহেলীর কি কপাল দেখো।চোখের জলে ঝাপসা দৃষ্টি।
কি হল কান্নার কি হল?অবাক হয়ে সত্যপ্রিয় বললেন।
তুমি লাব ম্যারেজের কথা বলছো?
সত্যপ্রিয় বুঝতে পারেন বিয়ে না করে একসঙ্গে থাকার কথা বলছে।বললেন,তা কেন আমাদের রেজিস্ট্রি বিয়ে হবে--অবশ্য তোমার সম্মতি থাকলে--।
কথা শেষ না হতেই সহেলী সোনুর বুকে ঝাপিয়ে পড়ে জড়িয়ে ধরে বুকে মুখ গুজে বলল,আমি সেকথা বলিছি।
সত্যপ্রিয় আশ্বস্ত হয়ে পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন,মিঠু এবাড়ী বিক্রী করে আমরা অন্যত্র চলে যাবো।
তুমি আমাকে জাহান্নামে নিয়ে গেলেও আপত্তি নেই।পতিই আমার গতি।
সহেলী বুঝতে পারে সোনুর হাতের বাধন এটে বসছে।হেসে বলল,এখন ছাড়বে তো,আমাকে রান্না করতে হবে।
সত্যপ্রিয় লজ্জা পেয়ে হাতের বাঁধন আলগা করে দিলেন।
বিমান বন্দরে লাউঞ্জের প্রথম সারিতে বসেছে ইলিনা ব্রাউন।দীর্ঘ প্রতিক্ষার অবসান হবে আজ। কলেজে নাগিয়ে আয়া পার্বতীকে নিয়ে বিমান বন্দরে চলে এসেছে। আনু এখন আইএএস অফিসার। মনে মনে ভাবে সেই কবে ট্রেনিংএর জন্য দেরাদুনে পৌছে দিয়ে এসেছিল এতদিন পরে আনু নিশ্চয়ই অনেক বদলে গেছে।পাশে পার্বতী ছেলেকে সামলাচ্ছে।ছেলেকে সামনাসামনি আজ প্রথম দেখবে।কলেজে সবাই বলছিল ছেলেটা মাতৃমুখী হয়েছে।ওরা তো ওর বাবাকে দেখেনি।এখন বছরই পূর্ণ হয়নি এরপর কত ভাঙ্গাচোরা হবে।ঘাড় ঘুরিয়ে ছেলের দিকে তাকাতে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে ইলিনা বলল,পাপা আসছে।
কি বুঝল কে জানে বাচ্চাটি ফিক করে হাসলো।
বিমান ল্যাণ্ডিং-এর ঘোষণা হতে নড়েচড়ে বসে ইলিনা।যাত্রীরা সামনে দিয়েই বেরোবে।